সাকরাইনের বিরোধিতা করছে কারা?
আজ (১৪ জানুয়ারি) পুরান ঢাকায় পালিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রচারণা ও স্থানীয়দের একাংশের বিরোধিতার কারণে এ বছর উৎসবের আয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতি বছর এ উৎসবকে ঘিরে পুরান ঢাকায় থাকে বিশেষ আয়োজন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ঢল নামে ঘুড়ি ওড়ানো ও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর সাকরাইনকে ঘিরে স্থানীয়দের একটি অংশের প্রকাশ্য বিরোধিতা সামনে এসেছে। ফলে শতবর্ষী এই উৎসবের আয়োজন ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, নারিন্দা, গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর এলাকার একাধিক মসজিদ থেকে কিছু মানুষ সাকরাইনের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন। এ ছাড়া শব্দদূষণ ও ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী দাবি করে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ কমিটির পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।
এর আগের বছর সাকরাইনে 'অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অসামাজিক কার্যকলাপ' বন্ধের দাবিতে ঢাকা মহানগর অনৈসলামিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে বিক্ষোভ করা হয়।
শব্দদূষণ, ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী কার্যকলাপ ও অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে এই বিরোধিতা জোরালো হচ্ছে। এর ফলে এ বছর পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় সাকরাইনের আয়োজন কমে গেছে। সংঘাত এড়াতে নারিন্দা, গেন্ডারিয়া ও ধূপখোলার অনেক বাসিন্দা এবার শাঁখারীবাজার এলাকার আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।
আয়োজক সংশ্লিষ্টরা জানান, সাকরাইনকে ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দেখিয়ে স্থানীয়দের একটি অংশ উৎসব বন্ধের চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে সাকরাইনকে ঘিরে এ ধরনের বিরোধিতা আরও বেড়েছে। এ বছর নারিন্দা এলাকার স্থানীয় মসজিদগুলোতে সাকরাইন না করার আহ্বানে ব্যানারও টাঙানো হয়েছে।
নারিন্দার স্থানীয় বাসিন্দা ফারহান সাদিক ধ্রুব বলেন, "ছোটবেলা থেকেই আমরা সাকরাইনের ঘুড়ি উৎসব দেখে বড় হয়েছি। আমাদের বাড়িসহ আশপাশের সব বাড়িতেই বহু বছর ধরে ছাদে ঘুড়ি উৎসব ও আনন্দ আয়োজন করা হয়। কিন্তু গত বছর থেকে মসজিদ কমিটি এগুলো বিদআত উল্লেখ করে না করতে বলছে।"
ধূপখোলা, নারিন্দা ও গেন্ডারিয়া এলাকায় এবার সাকরাইনের আয়োজন কমলেও শাঁখারীবাজার এলাকায় উৎসব জমে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এবার আয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গেন্ডারিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, "আট বছর ধরে আমার আব্বু ও চাচারা ঘুড়ি উৎসব করে আসছেন। আমি নিজেও গত বছর আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু এবার মসজিদ কমিটি থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ভাঙচুরের ভয়ে এবার আয়োজন করব না।"
সাকরাইন একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও পুরান ঢাকার আলেম–ওলামাদের একটি অংশ এটিকে 'বিধর্মীদের কাজ' বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এ ধরনের উৎসব অপসংস্কৃতির চর্চা এবং ধর্মীয় অনুশাসন ভঙ্গ করে এমন আয়োজন সভ্য সমাজের জন্য হুমকি।
নারিন্দার ধনু ব্যাপারি হলুদ মসজিদের মুয়াজ্জিন ও আলেম মোহাম্মদ সাঈদ ইসলাম বলেন, "বাচ্চারা ঘুড়ি ওড়াবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে যে বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নাচগানসহ নানা কাজ করা হয়, তা কোনো সভ্য মানুষ করতে পারে না। এসবের বিরুদ্ধে আলেম–ওলামাগণ সোচ্চার থাকবেন।"
পঞ্জিকা অনুযায়ী, পৌষ মাসের শেষ দিনে পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারা সাকরাইন উৎসব পালন করেন। এ উৎসবে ঐতিহ্যগতভাবে ঘুড়ি ওড়ানো ও পিঠাপুলির আয়োজন থাকে। সাকরাইন কবে থেকে পালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের ধারণা, ব্রিটিশ আমলে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর সময় থেকেই এই উৎসবের প্রচলন শুরু হয়।
গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা আজিজুর চৌধুরী বলেন, "৩০ বছর ধরে আমাদের ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন হয়। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোটবেলার বন্ধুরা আমাদের বাসায় আসত। সেটা ভীষণ আনন্দের স্মৃতি।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাকরাইন প্রতিহত করতে বের হওয়া বিরোধী মিছিলগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ধারাবাহিক চেষ্টার অংশ। রাজনৈতিক স্বার্থে সংস্কৃতির ওপর এ ধরনের আঘাত সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে বলে তাদের মত।
লেখক ও গবেষক তরুণ সরকার বলেন, "এই প্রবণতা নতুন নয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাঙালি সংস্কৃতির ওপর এ ধরনের আঘাত চলে আসছে। বাঙালির নানা লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবের বিরুদ্ধেই একটি নির্দিষ্ট পক্ষের বিরোধিতা ও আক্রমণ দেখা গেছে। এটিকে ধর্মের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের কৌশল, যার লক্ষ্য বাঙালি সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যকে দুর্বল করা।"
বিশ্লেষকদের মতে, সাকরাইন ঘিরে ধর্ম ও সংস্কৃতির মুখোমুখি অবস্থান মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নৃবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, "একটি ধর্মের ভেতরে অনেক ধরনের সংস্কৃতি থাকতে পারে। সংস্কৃতি ধর্মের অনুষঙ্গ। সাকরাইনের ঘুড়ি উৎসব বহুকালের ঐতিহ্য। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সম্মিলন ও যোগাযোগ তৈরি হতো, যা পারস্পরিক সৌহার্দ গড়ে তুলত। ধর্মের মাধ্যমেও মানুষের যোগাযোগ হয়। এগুলো স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগ।"
তিনি বলেন, "তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কারণে এতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। এসব কারণে মানুষের উৎসব ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।"
পরম্পরাগত এই উৎসবে আধুনিক আলোকসজ্জা ও ডিজে পার্টি যুক্ত হওয়ায় সাকরাইন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনাও রয়েছে। ফায়ারওয়ার্কস ও আতশবাজি ফোটানোর ফলে প্রতি বছর বহু পাখি ও প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
পুরান ঢাকা প্রাণী কল্যাণ কমিটির সদস্য তানিয়া আক্তার বলেন, "সাকরাইনে উচ্চ শব্দ ও ফায়ারওয়ার্কসে অনেক পাখি মারা যায়, অনেক প্রাণী ঘরছাড়া হয়। কুকুর–বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণী আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করে। নাগরিক হিসেবে আমাদের সব প্রাণের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া উচিত।"
সাকরাইনকে ঘিরে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে কি না জানতে চাইলে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আমিনুল কবীর তরফদার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সাকরাইন নিয়ে প্রতি বছরই আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে, এবারও আছে। আমরা ডিএমপির পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি। ঘুড়ি ওড়ানো ছাড়া উচ্চ শব্দে গান বাজানো, ডিজে পার্টি ও পটকা ফোটানোর ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে তেমন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।"
একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সাকরাইনবিরোধী লিফলেট বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছ থেকেই জানলাম। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।"
