হাতে আঁকা পতাকা, রাশিয়ার চাল: ১৮ দিন মরচে ধরা ট্যাংকারের পিছু কেন এত ছুটল যুক্তরাষ্ট্র?
আটলান্টিক মহাসাগরে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে ধাওয়া করছিল মার্কিন কোস্টগার্ড। মার্কিন সামরিক বাহিনীর চোখ এড়াতে ট্যাংকারটির নাবিকেরা এক অভিনব কৌশলে তারা জাহাজের গায়ে রাশিয়ার পতাকা এঁকে দেন এবং পুরোনো, মরচে ধরা ওই ট্যাংকারের নাম 'দ্য বেলা ১' বদলে রাখেন 'দ্য মারিনেরা'।
এর পরপরই ওয়াশিংটনে মস্কোর পক্ষ থেকে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়, যেন জাহাজটিকে ধাওয়া করা বন্ধ হয়।
তখন থার্টি ফার্স্ট নাইটের রাত। অবৈধভাবে তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত তথাকথিত 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া নৌবহরের অংশ হিসেবে আগেই এই ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এটি উত্তর দিকে ফিনল্যান্ডের ঠিক পূর্ব পাশের রুশ জলসীমার দিকে এগোচ্ছিল।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাশিয়ার ওই কূটনৈতিক সতর্কবার্তায় কান দেননি। তারা জানিয়ে দেন, জাহাজে নতুন করে আঁকা ওই পতাকা অবৈধ এবং জাহাজটি 'রাষ্ট্রহীন' বা কোনো দেশের আওতাভুক্ত নয়। ফলে মার্কিন কোস্টগার্ডের জাহাজ 'মুনরো' ট্যাংকারটির পিছু ধাওয়া অব্যাহত রাখে।
যুক্তরাজ্য ও আইসল্যান্ডের মাঝামাঝি উত্তর আটলান্টিকে ট্যাংকারটি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটিগুলোতে মার্কিন সামরিক বিমান প্রস্তুত রাখা হয়। নেভি সীল এবং 'নাইট স্টকার্স' নামে পরিচিত সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টার ইউনিটের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্যদেরও অভিযানের জন্য তৈরি রাখা হয়।
অবশেষে গত বুধবার আইসল্যান্ডের ১৯০ মাইল দক্ষিণে হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে ট্যাংকারটিতে নেমে এর নিয়ন্ত্রণ নেন মার্কিন সেনারা।
বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'ওই এলাকায় রাশিয়ার একটি সাবমেরিন ও একটি ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) ছিল। তবে আমরা পৌঁছানোর পরপরই তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।'
এর মধ্য দিয়ে ১৮ দিন ধরে চলা প্রায় ৪ হাজার মাইলের দীর্ঘ ধাওয়ার সমাপ্তি ঘটে। বড়দিনের আগের সপ্তাহে ভেনিজুয়েলার কাছে মার্কিন কোস্টগার্ডকে এড়াতে ট্যাংকারটি পালানোর চেষ্টা শুরু করার পরই এই ধাওয়া শুরু হয়েছিল।
খালি ট্যাংকার জব্দে কেন এত দিন?
ভেনিজুয়েলায় তেলবাহী ট্যাংকারের ঢোকা ও বের হওয়ার ওপর ট্রাম্পের দেওয়া 'সম্পূর্ণ অবরোধ' কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র যে কতটা মরিয়া, এই দীর্ঘ ধাওয়া তারই প্রমাণ। তবে কৌশলগত দিক থেকে কিছু প্রশ্নও উঠছে। বিশেষ করে, যে ট্যাংকারটি খালি ছিল বলে জানা যাচ্ছে, সেটি জব্দ করতে প্রশাসন কেন এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করল?
ন্যাটোর সাবেক সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস বলেন, 'মার্কিন নৌবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় সারা বিশ্বে নজরদারি চালানোর সক্ষমতা কোস্টগার্ডের রয়েছে। কিন্তু একটি জাহাজের ওপর আঘাত হানার আগে এত দীর্ঘ সময় ধরে পিছু ধাওয়া করাটা বেশ অস্বাভাবিক।'
সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা সিএনএনকে বলেছেন, ভেনিজুয়েলা থেকে পালানো নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা অন্য ট্যাংকারগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্র একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। বার্তাটি হলো—ধরা পড়ার ভয়ে হঠাৎ রাশিয়ার পতাকা ব্যবহারের কৌশল ধোপে টিকবে না।
সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, মাঝপথে জাহাজের পতাকা বদলে ফেলার এই 'চালাকি'তে ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই প্রভাবিত হয়নি। বরং তারা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে, এমন কৌশলে কোনো লাভ হবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো জোসেফ ওয়েবস্টার বলেন, 'মাঝপথে পতাকা বদলে জাহাজটিকে যদি 'রুশ জাহাজ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো, তবে তা ভবিষ্যতে বাজে নজির হয়ে থাকত। যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এই কৌশলের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চেয়েছে।'
ওয়েবস্টার আরও বলেন, রাশিয়ার দিক থেকেও বড় হিসাব-নিকাশ ছিল। 'ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। তাই এই ছোটখাটো ইস্যুতে ঝামেলায় জড়িয়ে তারা মূল আলোচনাকে ভেস্তে দিতে চায়নি।'
এক মাসেই ৫ ট্যাংকার জব্দ
গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র মোট পাঁচটি ট্যাংকার জব্দ করেছে। এর মধ্যে গত বুধবার ও শুক্রবার ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে সোফিয়া ও ওলিনা নামের দুটি জাহাজ আটক করা হয়, যেগুলো ভেনিজুয়েলা উপকূল ছেড়ে এসেছিল। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মার্কিন অবরোধ এড়াতে ভেনিজুয়েলা থেকে পালানো আরও ১৬টি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ট্যাংকারের পিছু নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
এই পদক্ষেপগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর মনোভাবেরই ইঙ্গিত দেয়। রাশিয়া, ইরান ও ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে তেল বিক্রির জন্য বিশ্বজুড়ে 'শ্যাডো ফ্লিট' ব্যবহার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই পুরোনো নিষেধাজ্ঞাগুলো পুরোপুরি কার্যকর করতে চাইছে।
ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর দেশটির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনিজুয়েলার তেলের রিজার্ভ যেন অন্য দেশে পাচার না হয় এবং তেল উৎপাদনে দেশটির সরকার যেন সহযোগিতা করে—সে লক্ষ্যেই এই কঠোর অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে ক্যারিবিয়ান সাগরে আটক অন্য চারটি ট্যাংকারের সঙ্গে 'দ্য বেলা ১'-এর পার্থক্য রয়েছে। আগের চারটি ট্যাংকার ভেনিজুয়েলা থেকে তেল নিয়ে বের হওয়ার সময় আটক হয়। কিন্তু বেলা ১ ভেনিজুয়েলার দিকে যাচ্ছিল এবং এতে কোনো তেল ছিল না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস বলেন, 'এটি পুরো শ্যাডো ফ্লিট এর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। শত শত জাহাজ নিয়ে গঠিত এই বহরকে জানিয়ে দেওয়া হলো—তেল থাকুক বা না থাকুক, বিশ্বের কোথাও তারা আর নিরাপদ নয়।'
'শ্যাডো ফ্লিটের' বিরুদ্ধে কঠোর যুক্তরাষ্ট্র
বছরের পর বছর ধরে ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাচার করে আসছে। এর জন্য তারা ব্যবহার করে 'শ্যাডো ফ্লিট' বা তেলবাহী ট্যাংকারের এক বিশাল ছায়া নৌবহর। কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এই দেশগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে তেল রপ্তানি, যার বড় একটি অংশ যায় চীনে।
২০২৪ সালে 'দ্য বেলা ১' ট্যাংকারটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। পানামাভিত্তিক একটি কোম্পানির মালিকানাধীন এই জাহাজের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের অভিযোগ আনা হয়।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বেলা ১-এর মতো ট্যাংকারগুলো প্রায়ই নিজেদের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভেনিজুয়েলার কাছে যাওয়ার সময় বেলা ১ গায়ানার ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছিল।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানায়, ২০২০ সালে জাহাজটি প্রথমবার নিষিদ্ধ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করতে দেখা যায়। ২০২৩ সালের মে মাসে এটি শেষবার ভেনিজুয়েলায় গিয়েছিল। সে সময় নাম বদলে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল।
কেপলারের তথ্যমতে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরানের খাগ আইল্যান্ড থেকে অপরিশোধিত তেল লোড করে বেলা ১। এরপর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজটি তার লোকেশন ট্র্যাকিং সিস্টেম বা অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ করে দেয়। ইরানের নিষিদ্ধ তেলবাহী জাহাজগুলো সাধারণত এ কৌশলই নিয়ে থাকে।
প্রায় দুই মাস ধরে বেলা ১-এর কোনো খোঁজ ছিল না। অক্টোবরের শেষের দিকে আবার এর অবস্থান জানা যায়। তখন দেখা যায় জাহাজটি 'ব্যালাস্ট' অবস্থায় রয়েছে, অর্থাৎ এতে কোনো তেল নেই। পানির ওপর জাহাজের ভেসে থাকার ছবি দেখেও বোঝা যাচ্ছিল, এটি খালি।
কেপলার আরও জানায়, জাহাজটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে জিব্রাল্টার প্রণালি পাড়ি দেয়। এরপর নিজের অবস্থান গোপন করে এটি ক্যারিবিয়ান সাগর ও ভেনিজুয়েলার দিকে এগোচ্ছিল।
ট্যাংকার জব্দের শুরু ডিসেম্বরে
গত ১০ ডিসেম্বর বেলা ১ যখন ক্যারিবিয়ান সাগরের পথে, তখনই ভেনিজুয়েলা উপকূলের কাছে প্রথম একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। 'স্কিপার' নামের ওই ট্যাংকারটির ওপর ২০২২ সালেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
এফবিআই, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে স্কিপারকে জব্দ করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভেনিজুয়েলা থেকে তেল নিয়ে ট্যাংকারটি প্রথমে কিউবা ও পরে এশিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেটি আটকায় যুক্তরাষ্ট্র।
অভিযানের পর গত ১০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'আপনারা হয়তো জানেন, আমরা ভেনিজুয়েলা উপকূলে একটি ট্যাংকার জব্দ করেছি। বিশাল বড় এক ট্যাংকার, আসলে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় জব্দ করা ট্যাংকার এটি।'
জাহাজে থাকা তেলের কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আমার মনে হয়, ওগুলো আমরা রেখে দেব।' জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট 'মেরিন ট্রাফিক'-এর তথ্যমতে, স্কিপার এখন টেক্সাসের দক্ষিণে গালফ কোস্ট বা উপসাগরীয় উপকূলে রয়েছে।
এর পরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর করেন ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ভেনিজুয়েলায় আসা-যাওয়াকারী সব নিষিদ্ধ তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর 'সম্পূর্ণ অবরোধ' আরোপের ঘোষণা দেন।
এর চার দিন পর ভেনিজুয়েলা উপকূল থেকে 'সেঞ্চুরিস' নামে পানামার পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জাহাজটি ভেনিজুয়েলা থেকে এশিয়ার দিকে যাচ্ছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, যদিও জাহাজটির নাম নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ছিল না, তবু এটিতে ভেনিজুয়েলার নিষিদ্ধ তেল বহন করা হচ্ছিল।
সমুদ্রের মাঝপথে ধাওয়া ও রাশিয়ার পতাকা
পরদিন ক্যারিবিয়ান সাগরে ভেনিজুয়েলার দিকে এগোতে থাকা 'দ্য বেলা ১' ট্যাংকারটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থামানোর চেষ্টা করে মার্কিন কোস্টগার্ড। জাহাজটি জব্দের জন্য আগেই পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু কোস্টগার্ডের সদস্যরা জাহাজে উঠতে চাইলে নাবিকেরা বাধা দেন। উল্টো জাহাজের গতিপথ বদলে উত্তর দিকে পালাতে শুরু করে বেলা ১। সেই সঙ্গে শুরু হয় কোস্টগার্ডের পিছু ধাওয়া।
সে সময় এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছিলেন, 'মার্কিন কোস্টগার্ড নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি ডার্ক ফ্লিট বা অবৈধ জাহাজের পিছু নিয়েছে, যা ভেনিজুয়েলার নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। জাহাজটি ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছে এবং এর বিরুদ্ধে বিচারিক জব্দের আদেশ রয়েছে।'
জাহাজটি আসলে কোথায় যাচ্ছিল, তা তখন পরিষ্কার ছিল না। তবে কেপলারের বিশ্লেষকেরা ধারণা করছিলেন, এটি রাশিয়া বা বাল্টিক সাগরের দিকে যেতে পারে।
গত ৩০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার একটি আদালত বেলা ১ জব্দের পরোয়ানা অনুমোদন করেন, যার মেয়াদ ছিল ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। গত বৃহস্পতিবার পরোয়ানাটি প্রকাশ করা হয়, যদিও এর সঙ্গে থাকা ২৮ পৃষ্ঠার হলফনামার পুরোটা কালিতে ঢেকে বা গোপন রাখা হয়েছে।
উত্তর আটলান্টিকে ধাওয়া চলাকালে ৩১ ডিসেম্বর কোস্টগার্ডের সদস্যরা জাহাজের গায়ে রাশিয়ার পতাকা দেখতে পান। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, পতাকাটি জাহাজের এক পাশে খুব দায়সারাভাবে আঁকা ছিল। সেদিনই ট্যাংকারটির পিছু না নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক অনুরোধ জানায় মস্কো। রাশিয়ার জাহাজের সরকারি নিবন্ধন তালিকায় ট্যাংকারটির নতুন নাম দেখা যায়—'দ্য মারিনেরা'।
জাহাজ শিল্পবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের মুখে গত মাসে অন্তত ১৭টি শ্যাডো ফ্লিট বা অবৈধ ট্যাংকার নিজেদের রুশ পতাকাবাহী হিসেবে দাবি করেছে।
কেপলারের তেলবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, 'ট্যাংকারগুলোর নাম মুছে ফেলা, নতুন নাম দেওয়া বা পরিচয় লুকানোর চেষ্টা করা—এগুলো খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তবে অস্বাভাবিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার বাইরে গিয়ে এভাবে জাহাজ জব্দ করা। এটাই এখন নতুন ঘটনা।'
মার্কিন কর্মকর্তারা আগে সিএনএনকে বলেছিলেন, রাশিয়ার অনুরোধের কারণে জাহাজটি জব্দ করতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার পতাকার দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং জাহাজটিকে 'রাষ্ট্রহীন' হিসেবে গণ্য করে। আর এতেই জাহাজটি আটকের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।
অভিযানে নেভি সীল ও 'নাইট স্টকার্স'
নতুন নাম নেওয়া ট্যাংকার 'দ্য মারিনেরা' জব্দের অভিযানের আগেই প্রস্তুতি সেরে রেখেছিল মার্কিন বাহিনী। ট্যাংকারটি যখন যুক্তরাজ্য ও আইসল্যান্ডের মাঝামাঝি জলসীমায় ছিল, তখন যুক্তরাজ্যে অন্তত ১২টি সি-১৭ বিমান ও দুটি এসি-১৩০ গানশিপ মোতায়েন করা হয়।
উন্মুক্ত ফ্লাইট তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ট্যাংকারটি জব্দের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পি-৮ নজরদারি বিমান ইংল্যান্ডের সাফোকের আরএএফ মিলডেনহল ঘাঁটি থেকে উড়ে গিয়ে সেটির ওপর নজরদারি চালায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ভিডিও বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে অন্তত দুটি ভি-২২ অস্প্রে বিমান সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে একটি বিমানকে 'ফাস্ট-রোপ' প্রশিক্ষণ নিতে দেখা যায়। এই কৌশলে হেলিকপ্টার ল্যান্ড না করেই দড়ি বেয়ে সেনারা দ্রুত নিচে নামতে পারেন।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম জানান, ভোর হওয়ার আগেই ট্যাংকারটি জব্দে অভিযান চালানো হয়।
অভিযান সম্পর্কে জানেন এমন দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ট্যাংকারে ওঠা মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নেভি সীল সদস্যরাও ছিলেন। তাঁদের পরিবহনে সহায়তা করে মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্ট, যা 'নাইট স্টকার্স' নামে পরিচিত।
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে যুক্তরাজ্যও সহায়তা করেছে।
রুশ বিমানের চক্কর ও ট্যাংকারের ভবিষ্যৎ
মার্কিন কোস্টগার্ডের কমান্ড্যান্ট অ্যাডমিরাল কেভিন লান্ডে গত বৃহস্পতিবার এবিসি নিউজকে জানান, অভিযানের দুদিন আগে দুটি রুশ সামরিক বিমান মার্কিন কোস্টগার্ডের জাহাজের ওপর দিয়ে চক্কর দিয়েছিল।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমাদের আইনি এখতিয়ার ও চলমান অভিযানে রুশ সামরিক উপস্থিতি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়ে কোস্টগার্ড কখনোই চিন্তিত ছিল না।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ক্রিস্টি নোয়েম বলেন, মার্কিন কোস্টগার্ডের জাহাজ 'মুনরো' উত্তাল সমুদ্র ও ভয়ংকর ঝড় উপেক্ষা করে ট্যাংকারটিকে ধাওয়া করেছে। তিনি বলেন, 'সতর্ক নজরদারি আর দেশপ্রেমের সংকল্প নিয়ে আমাদের দেশকে রক্ষা করার এই প্রচেষ্টা প্রত্যেক আমেরিকানকে গর্বিত করে।'
তবে জব্দ করা বেলা ১ ট্যাংকারটিকে এখন কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিক বলছে, আটকের পর জাহাজটি আটলান্টিকের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ দিকে এগোচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, 'এই মুহূর্তে তেল খালাস করা হচ্ছে।' যদিও ট্যাংকারটিতে কোনো তেল ছিল বলে মনে হয় না।
তেল থাকুক বা না থাকুক, যুক্তরাষ্ট্র এখন ট্যাংকারটিকে নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে বলে মনে করেন অ্যারন রোথ। তিনি ওবামা ও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কোস্টগার্ড কমান্ড্যান্টের কৌশলগত উপদেষ্টা ছিলেন।
রোথ বলেন, 'জাহাজগুলোর কাঠামো, নিরাপত্তা ও সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায়, এগুলোর ক্রেতা পাওয়া যাবে। তাই ভবিষ্যতে কোনো এক সময় নিলামের মাধ্যমে এটি বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।'
