ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের উদ্যোগ নিলে পাল্টা-পদক্ষেপের অঙ্গীকার দেশটির মিত্রদের
যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি বাস্তবায়ন করে, সে ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা। ফ্রান্স ও জার্মানিসহ একাধিক দেশের পক্ষ থেকে এমন বার্তা আসার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো বুধবার ফ্রান্স ইন্টার রেডিওকে বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে তার মিত্র দেশ ডেনমার্কের কাছ থেকে দখলের উদ্যোগ নিলে—যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রস্তুত থাকতে চায়, তবে তা করা হবে "ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে"।
তিনি বলেন, "আমি নিজে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি… তিনি এই ধারণা নাকচ করেছেন যে ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, গ্রিনল্যান্ডেও তেমন কিছু ঘটতে পারে।"
উল্লেখ্য গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। সেখানে তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচার শুরুর কথা রয়েছে।
মাদুরো হরণের অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েন। একই সঙ্গে আশঙ্কা তৈরি হয়, গ্রিনল্যান্ড—যে দ্বীপটিকে ট্রাম্প আগেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন—জোরপূর্বক দখলের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তবে এরপর ইউরোপীয় মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। তারা স্পষ্ট করে জানায়, গ্রিনল্যান্ড দেশটির জনগণেরই সম্পত্তি।
'এখনই যুক্তিসংগত সংলাপ'
ফিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োহানেস কস্কিনেন বিষয়টি ন্যাটোর ভেতরে আলোচনায় আনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, "[মিত্রদের] বিবেচনা করা উচিত, কোনো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কি না, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই অর্থে সীমার মধ্যে আনা দরকার কি না—যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য যৌথভাবে গৃহীত পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করতে না পারে।"
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎসফেল্ট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের অনুরোধ জানান।
রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "আমরা আলোচনায় কিছুটা ভারসাম্য আনতে চাই। চিৎকার-চেঁচামেচির বদলে যুক্তিসংগত সংলাপ প্রয়োজন। এখনই।"
ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ড জোরপূর্বক দখলের কোনো চেষ্টা হলে "সবকিছু থেমে যাবে"—এর মধ্যে ন্যাটো এবং প্রায় ৮০ বছরের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্কটিক দ্বীপটি নিয়ে নতুন করে দাবি উত্থাপনের পর আগামী সপ্তাহে রুবিও ও ডেনিশ কর্মকর্তাদের বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড সরকারও যোগ দেবে বলে বুধবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা বলেন, প্রয়োজন হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন—যেখানেই হোক—গ্রহণযোগ্য হবে না।
এক বক্তৃতায় কোস্তা বলেন, "গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই: গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ডকে বাদ দিয়ে তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।"
তিনি আরও বলেন, "ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন মেনে নিতে পারে না—সে তা সাইপ্রাসে হোক, লাতিন আমেরিকায় হোক, গ্রিনল্যান্ডে, ইউক্রেনে বা গাজায়। ইউরোপ আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার দৃঢ় ও অবিচল সমর্থক হয়ে থাকবে।"
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ
৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড—বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ—ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি অবস্থিত। ২০১৯ সালে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকাল থেকেই তিনি গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ধারণা তুলে ধরেন এবং বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য উপকারী হবে।
এপর্যন্ত ট্রাম্প দ্বীপটি দখলে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি।
রুবিও বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড কেনার ইচ্ছাই ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য। "শুরু থেকেই প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায় ছিল সেটিই," তিনি বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি কোনো আলোচনা শোনেননি এবং যুক্তরাষ্ট্র "কূটনৈতিক পথ" বিবেচনা করছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা দল গ্রিনল্যান্ড কেনার বিকল্প নিয়ে "সক্রিয়ভাবে আলোচনা" করেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের আগ্রাসন ঠেকাতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বলে তিনি মনে করেন। সে কারণেই তার দল সম্ভাব্য একটি ক্রয়ের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করছে।"
লেভিট বা রুবিও কেউই বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তবে লিভিট বলেন, "প্রেসিডেন্টের প্রথম পছন্দ সবসময়ই কূটনীতি।"
