ভালোর চাইতে ক্ষতিই বেশি করছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন বাতিল করা দেশগুলো

টিকা গ্রহণকারীর দেহে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনায় এপর্যন্ত অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিড-১৯ টিকার ডোজ দেওয়া স্থগিত রেখেছে ১৬টি দেশ। এই সিদ্ধান্তকে 'বিস্ময়কর', 'হঠকারী' ও 'রাজনৈতিক' উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিষেধকটি জাতীয় কর্মসূচিতে বন্ধ রাখার তালিকায় যোগ দেওয়া দেশের সংখ্যা প্রতিদিন ভারি হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) নাগাদ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো।
এপর্যন্ত সিদ্ধান্তটি নেওয়া দেশগুলো হচ্ছে; সুইডেন, স্লোভেনিয়া, লাটভিয়া, স্পেন, লুক্সেমবার্গ, ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, বুলগেরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো।
বাংলাদেশ সময় গত রাতে জানা যায়, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো বৃহৎ জনসংখ্যার দেশের ঘোষণা। ইতোপূর্বে, রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে এমন কথা জানায় নরওয়ে ও ডেনমার্ক। তারপরেই ফ্রান্স ও জার্মানি তাদের সিদ্ধান্ত জানায়।
নরওয়েতে চারজন স্বাস্থ্য কর্মী অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ডোজ নিয়ে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হন। অসুস্থতা হয়ে পড়া স্বাস্থ্য কর্মীদের বয়স ছিল পঞ্চাশের নিচে। অধিকাংশের রক্তে ছিল শ্বেতকণিকার স্বল্পতা, যা রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিহত করতে সাহায্য করে। টিকা নেওয়ার পর এদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে, অন্য দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
এরপর ডেনমার্কে ৬০ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু এবং ইতালিতে ৫৭ বছরের আরেক টিকাগ্রহীতার মৃত্যুর ঘটনাই অনেক দেশকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। তবে এখনও এসব মৃত্যু অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নেওয়ার ফলেই হয়েছে- এমন কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
ইউরোপিয় মেডিসিন্স এজেন্সি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা জোর দিয়ে বলেছে ভ্যাকসিনটির সঙ্গে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনার সংযোগ থাকার প্রমাণ এপর্যন্ত মেলেনি। এমনকি টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা- যারা টিকা নেননি এমন ব্যক্তিদের তুলনায়ও কম ঘটে থাকে বলে নিজস্ব তথ্যসূত্র উল্লেখ করে জানায় অ্যাস্ট্রাজেনেকা।
চলতি মাসেই বিশ্বজুড়ে আবারও বেড়েছে সংক্রমণ হার। টিকাদান বন্ধ রাখার মধ্যেই সংক্রমিত হচ্ছেন অনেক মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এমন সঙ্কটকালে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। এর ফলে- জনসাধারণও প্রতিষেধকটির ওপর আস্থা হারাবেন।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. মাইকেল হেড টিকাদান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে "আশ্চর্য ব্যাপার" বলে উল্লেখ করেন।
সোমবার যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ভ্যাকসিন গ্রহীতা কিছু মানুষের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনাকে "সাধারণ জনসংখ্যার সমান বা খুব সম্ভবত তার থেকেও কম" বলে মন্তব্য করেন।
"মহামারির মধ্যে টিকাদান স্থগিত রাখার পরিণতি ভালো হতে পারে না। সবাইকে অতিদ্রুত জীবাণু বিরোধী সুরক্ষা দেওয়া দরকার। কিন্তু, যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার কারণেই আরও অনেক মানুষ ভ্যাকসিন নিতে ভয় পাবেন," বলেন মাইকেল।
ইউনিভার্সিটি অব লিডসের ওষুধ গবেষণা বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. স্টিফেন গ্রিফিন টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ইউরোপিয় কর্তৃপক্ষগুলোর আগাম সন্দেহ "যথাযথ নয়" বলে মন্তব্য করেন।
তার মতে, "প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে সঙ্কোচ এবং ভ্যাকসিন বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি করবে।"
তবে নিজেদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে প্রতিষেধকটি স্থগিত রাখা দেশগুলো। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সি আশ্বস্ত করার আগে সতর্কতার অংশ হিসেবে তার দেশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
- সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, সিএনবিসি