ইউনূসের চীন সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য যে অর্থ বহন করে

গত সপ্তাহে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছিল, তখন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস চীনে উচ্চ পর্যায়ের এক সফরে ছিলেন। এটি ঢাকার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—ভারতের পরিবর্তে বেইজিংয়ের প্রতি আরও ঝোঁকের ইঙ্গিত মিলছে।
চার দিনের এ সফর শুরু হয় বুধবার। ইউনূস সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ায় যোগ দেন। এ ফোরামকে আঞ্চলিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান চীনা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের ৫৪তম স্বাধীনতা দিবস ছিল বুধবার, যে দিবসটি পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী লড়াই এবং ভারত থেকে পাওয়া সমর্থনের স্মৃতি বহন করে। এ উপলক্ষে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করে যে সময় উষ্ণ অভিনন্দনবার্তা পাঠান, তখন ইউনূস চীনের হাইনান প্রদেশে। শনিবার তিনি বলেন, তার এ সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি 'নতুন অধ্যায়' সূচনা করেছে।
'চীনকে আমাদের ভালো বন্ধু হিসেবে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,' সফরের সময় সাংবাদিকদের বলেন ইউনূস। 'আমাদের সম্পর্ক বহু বছর ধরে অত্যন্ত দৃঢ়। আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শক্তিশালী এবং আমরা চীনের সহযোগিতা থেকে উপকৃত হচ্ছি।'
তবে ইউনূসের এই সফর নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিন্যাস করছে এবং ঐতিহাসিক মিত্র ভারতের চেয়ে চীনের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। স্বাধীনতা দিবসের দিনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ না দেওয়ার বদলে ইউনূসের চীনে উপস্থিতি কেউ কেউ বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কৌশল হিসেবে দেখছেন। যদিও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনও টানাপোড়েনপূর্ণ।
গত আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দিল্লি হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং তার প্রশাসনকে সমর্থন করে আসছিল। ভারত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তিস্তা নদীর পানি বণ্টন প্রকল্পে অংশীদার হতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারিত্বের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র 'দ্য হিন্দু' জানিয়েছে, ইউনূস চীন সফরের আগে দিল্লি সফরের চেষ্টা করেছিলেন, তবে সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাননি। তবে স্বাধীনতা দিবসের মতো তাৎপর্যপূর্ণ দিনে ইউনূসের বেইজিং সফর ভারতের জন্য একেবারেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, 'এই সফরের পেছনে সুস্পষ্ট কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।'
দিল্লি এর আগে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ঢাকাকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
'তিনি [ইউনূস] এই সুযোগটি ব্যবহার করে জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারতেন যে, তাদের জীবন, জীবিকা ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে,' বলেন দেবসরকার।
বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক দিল্লি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ ও চীনা শিল্প-অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার বাংলাদেশের পরিকল্পনা ভারতীয় কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের তিস্তা নদীর কাছে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের সন্নিকটে চীনের নেতৃত্বাধীন যে কোনো অবকাঠামো প্রকল্প 'এই অঞ্চলের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে', বলে মন্তব্য করেন দেবসরকার।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ঋণ, এবং মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য চলমান ব্যয়—এসব কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দিন ধরেই চাপে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন এই শূন্যস্থানের কিছু পূরণের সুযোগ তৈরি করছে।
সফরকালে দুই দেশ আটটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ এবং নতুন চীনা শিল্প-অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক। তবে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও বেইজিংয়ে ঢাকার রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। দেশটির 'ডেইলি স্টার' পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৬.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, বাংলাদেশ 'চীনে আরও বেশি পণ্য রপ্তানির নতুন উপায় খুঁজছে'। তার মতে, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর বাণিজ্যিক প্রসার এই ভারসাম্যহীনতা কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
দত্ত আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়েও ইউনূস বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাইতে পারেন—এটি এমন একটি ইস্যু যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অর্থনৈতিক সুবিধা স্পষ্ট হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ঢাকা অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যাতে ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া না হয়, কারণ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে ভারত বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
দত্ত মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কোনো বড় সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে পারে—যেমন তিস্তা নদী প্রকল্পটি পুরোপুরি চীনের হাতে তুলে দেওয়া—যতক্ষণ না একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনও তুঙ্গে। এমনকি আওয়ামী লীগ এতে অংশ নেবে কি না, সে নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত তিস্তা নদী দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে।
'এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে বাংলাদেশ মোংলা বন্দর ও তিস্তা নদী উন্নয়নের মতো প্রকল্পে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা শুরু করতে পারে, যেখানে আগে তারা ভারতের সঙ্গে কাজ করছিল। তবে আমি মনে করি না, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেবে,' বলেন দত্ত। 'সম্ভবত এটি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে, যাতে এই প্রকল্পগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।'
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনূসের চীন সফর স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: ঢাকা তার কৌশলগত বিকল্প উন্মুক্ত রাখছে। তবে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক টানাপোড়েন এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে একদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।