হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়া বৃদ্ধকে বুকে টেনে নিলেন রাজশাহীর ডিসি
হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়া বৃদ্ধকে বুকে টেনে নেওয়ার পর এবার তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ও মুরগির খামার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক।
ওই বৃদ্ধের নাম আতাবুর রহমান। বাড়ি তানোর থানার পেছনে কুঠিপাড়া এলাকায়। ষাটোর্ধ্ব বছরের এই বৃদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। আধ শতক জমির উপর একটা কুঁড়েঘর রয়েছে তার। সেখানে আপাতত বাড়ি করার জন্য দুই বান্ডিল টিন ও ৬ হাজার টাকার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের ভিক্ষুক পুনর্বাসন তহবিল থেকে মুরগির খামারও করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাকে।
তানোর থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, আপাতত জেলা প্রশাসক মহোদয় তার জন্য দুই বান্ডিল টিন ও ছয় হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। যেহেতু ওই বৃদ্ধটি ভিক্ষুক তাই তাকে ভিক্ষুক পুনর্বাসন তহবিল থেকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এছাড়া যেহেতু তার মাত্র আধা শতক জমি রয়েছে, সেই জমির উপর তো ঘর করা যায় না, তাই তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকেও বাড়ি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা দ্রুত কাগজপত্র তৈরি করে এসব বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, টুপি, চাদর, চাল, ডাল, তেল প্রদান করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে রাজশাহীর তানোরে উপজেলা চত্বরের রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কাগজ কুড়াচ্ছিলেন ৬০ বছরের এক বৃদ্ধ। তার পাশ দিয়ে উপজেলার দিকে যাচ্ছিলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) হামিদুল হক। ডিসির সঙ্গে ছিলেন পৌর মেয়র, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসি। হঠাৎ ওই বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে যান ডিসি। এগিয়ে যান অন্যরাও। বিষয়টি দেখে ভয় পেয়ে যান বৃদ্ধ।
ভয় পেয়ে হাতজোড় করে ডিসিকে বৃদ্ধ বলেন, 'বাবা আমার যদি কোনও ভুল হয়, মাফ করে দেন, আমি আর বাজারে আসব না।'
বৃদ্ধের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে আবেগাপ্লুত হন ডিসি। তাৎক্ষণিকভাবে ওই বৃদ্ধকে সহায়তা করেন ডিসি।
সেখান থেকে ফিরে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে তার অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দেন ডিসি হামিদুল হক।
ফেসবুকে স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, 'অকারণে যেসব লোকজন বাজারে ছিলেন, তাদের বাজার থেকে সরিয়ে দিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উপজেলার দিকে যাই। এ সময় হঠাৎ ৬০ বছরের এক বৃদ্ধ মানুষকে রাস্তার পাশে কিছু পুরোনো, ছেঁড়া কাগজ কুড়াতে দেখে কাছে যাই। আমরা কাছে যেতেই এবং সঙ্গে পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে যান বৃদ্ধ। ভয় পেয়ে হাতজোড় করে বৃদ্ধ লোকটি দাঁড়িয়ে বলেন, 'বাবা আমার যদি কোনও ভুল হয়, মাফ করে দেন, আমি আর বাজারে আসব না।' আমি সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধকে বললাম বাবা, এটি কোনও ভুল না। ভীষণ মায়া লাগলো বৃদ্ধ লোকটিকে দেখে। এ বয়সে তার ঘরে থাকার কথা। নাতিপুতিদের সঙ্গে খেলা করার কথা তার। কিন্তু হায় দারিদ্র্য; তুমি তাকে এই চৈত্রের প্রখর রোদে কটি টাকার জন্য, সামান্য চাল কেনার অর্থের জন্য কিছু ছেঁড়া কাগজ কুড়াতে বাধ্য করেছো। তার ওপর বিশ্ব কাঁপানো করোনা। কিন্তু এই বৃদ্ধের দারিদ্র্যকে করোনা পরাজিত করতে পারেনি। তাকে আটকে রাখতে পারেনি ঘরের কোনে।"
তিনি আরও লেখেন, 'বৃদ্ধকে বুকে টেনে নিয়ে সামান্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে বললাম, আপনি কিছু চাল-ডাল কিনে বাড়ি চলে যান। কিছুদিন আর বাজারে আাসবেন না। তিনি বললেন, বাবা আর আসব না। মনটা খারাপ হয়ে গেল।। জানি না তার বাড়িটি কেমন, তার বাড়িতে কে কে আছেন?'
ডিসি আরও লিখেছেন, 'উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বৃদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিতে বললাম। হায় করোনা, তুমি সবাইকে একটু দয়া করো। অন্তত নাম না জানা এই বৃদ্ধের কোনো ক্ষতি করো না। এই মিনতি করি। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে ভালো রাখুন। সারা বিশ্ব হোক করোনামুক্ত। ভালো থেকো বৃদ্ধ বাবা। আমি তোমার খবর রাখব নিশ্চয়।'
ডিসির এই স্ট্যাটাস মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। প্রশংসায় ভাসতে থাকেন তিনি।
