টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত ব্যাংকক: সড়ক পরিণত হয়েছে বদ্ধ জলাশয়ে, অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু
বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ বৃষ্টি আর জলয়াবদ্ধতা থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার একটানা রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে বদলে গেছে পুরো চিত্র। শহরটির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন আর কেবল প্লাবিত সড়ক নয়, পরিণত হয়েছে বদ্ধ জলাশয়ে। দুর্যোগপূর্ণ এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, বন্যাজনিত দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াদের বেশিরভাগই পানিতে ডুবে এবং অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, শহরের ২৩০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
শহরের কিছু অংশে মাত্র দুই দিনেই প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা লন্ডনের প্রায় ছয় মাসের গড় বৃষ্টিপাতের সমান।
উত্তর-পূর্ব ব্যাংককের সত্তর দশকের খলং চান ফ্ল্যাট কম্পাউন্ডটি এখন এই দুর্যোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানকার ৭৩ বছর বয়সী বাসিন্দা সুলেমাস ক্যুরাংকুল জানান, এবারের বৃষ্টি সাধারণ সন্ধ্যার বৃষ্টির মতো ছিল না; এটি ঝরেছে 'একটানা সারা দিন, সারা রাত'।
তিনি বলেন, পানি কেবল বাড়ছিলই। ফোনে যখন সতর্কবার্তা আসে, ততক্ষণে সড়ক বুক-সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি কিছুটা নামলেও চারপাশে এখন তীব্র দুর্গন্ধ এবং ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ভাসছে।
চাও ফ্রায়া নদীর প্লাবনভূমিতে গড়ে ওঠা জনবহুল ব্যাংকক মূলত খাল, পাম্প ও বাঁধের ওপর নির্ভর করে পানি নিষ্কাশন করে থাকে। তবে অপরিকল্পিত কংক্রিটের নগরায়ণে খালের স্বাভাবিক নেটওয়ার্ক অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শহরটির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংককের সবকটি (৫০টি) জেলাতেই বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করেছে সরকার।
জলাবদ্ধ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত দৃশ্য—মানুষ নিজেদের ঘরে পৌঁছাতে বাচ্চাদের হাওয়াই সুইমিংপুল, এমনকি ভাসমান ফ্রিজকে নৌকা হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রধান সড়ক দিয়ে ওয়াটার স্কুটার (জেটস্কি) চালানোর দায়ে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
বন্যার প্রভাবে ব্যাংককের প্রধান সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কর্মীদের প্রায় অর্ধেক কাজে যোগ দিতে না পারায় উড়োজাহাজ সংস্থা 'থাই এয়ারওয়েজ' ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং হাজারো যাত্রীর লাগেজ আটকে যায়। রাজধানীর বেশিরভাগ অংশ স্থবির হয়ে পড়ায় বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
পরিস্থিতি নিয়ে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল সাংবাদিকদের জানান, উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা পানির কারণে ব্যাংকক মেট্রোপলিটন এলাকা এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে একটি 'ওয়ার রুম' খোলা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর আগামী সপ্তাহেও আরও ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অস্বাভাবিক উষ্ণ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে সৃষ্ট একটি নিম্নচাপ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম হয়ে ব্যাংককের ওপর এসে আটকে পড়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে সক্রিয় 'এল নিনো' চরম বৃষ্টিপাতকে আরও উসকে দিয়েছে।
ব্যাংককের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি সামলাতে পারে, কিন্তু এবারের বৃষ্টি সেই ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে টানা কয়েক দিন ধরে চলেছে।
একই আবহাওয়া পরিস্থিতির শিকার হয়েছে প্রতিবেশী মিয়ানমারও। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কা দেত এনগে হতাইন গ্রামে ভূমিধসে অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী আরেক গ্রামে কাদামাটির নিচে নিখোঁজ রয়েছেন আরও আটজন।
দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ এবং গণমাধ্যমের ওপর সামরিক জান্তার কঠোর বিধিনিষেধের কারণে সেখানে তথ্য পাওয়া এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, ব্যাংককে পানি নিষ্কাশন কেন্দ্রগুলো তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করলেও পুরো পানি নামতে আরও কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
