২০০ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর থাইল্যান্ডে ৫,০০০ মার্কিন নাবিক, পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার
থাইল্যান্ডের একটি পর্যটননগরীতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। এর আগে সেখানে ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাদের নিয়ে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইতোমধ্যে বন্দরে এসে পৌছেঁছে। জাহাজটিতে থাকা এসব নাবিক ও মেরিন সেনারা ২০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছেন।
মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বুধবার সকালে থাইল্যান্ডের পর্যটননগরী পাতায়ায় নোঙর করেছে। জাহাজটির এই সফরকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসার আশা তৈরি হয়েছে।
জাহাজটির আগমনকে সামনে রেখে পুলিশ পাতায়ার প্রধান সমুদ্রসৈকত ও রাতের বিনোদনকেন্দ্রিক এলাকায় অতিরিক্ত টহলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পাশাপাশি সপ্তাহান্তে চালানো অভিযানে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ৪০ থেকে ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে।
কাছের লায়েম চাবাং বন্দরে নোঙর করার পর দুটি সহযোগী নৌযানসহ জাহাজটিতে থাকা সদস্যদের ২০০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে কাটানোর পর বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হবে।
পাতায়ার পুলিশপ্রধান আনেক স্রাথংইউ সোমবার বলেন, 'আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু এটি কঠিন।' তিনি ব্যাখ্যা করেন, কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতসারে যৌনকর্মীরা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে পারেন।
ইন্দোনেশিয়ার বাতাম থেকে দেখা যায়, মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সিঙ্গাপুর অতিক্রম করছে।
থাইল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি অবৈধ। তবে মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও ব্যাংকক ও পাতায়ার কিছু অংশসহ দেশটির বড় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যৌন ব্যবসা প্রকাশ্যেই চলে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে অবস্থিত নিজ ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সহায়তা করতে জাহাজটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতাদের মতে, এর ফলে জাহাজটি আধুনিক সময়ে টানা সমুদ্রে অবস্থানের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থানের কারণে জাহাজটিতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও খবর এসেছে। চলতি মাসে সামরিক বিষয়ক দুটি সংবাদমাধ্যম জাহাজটিতে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা এবং নাবিকদের মনোবল কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
পাতায়ায় এই সফরকে ঘিরে কেউ কেউ আর্থিক লাভের আশা করছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাসদস্যদের বিশ্রাম ও বিনোদনের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে গড়ে ওঠা এই শহরটি একসময় ছিল একটি মাছ ধরার গ্রাম, যা পরে আংশিকভাবে পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নেয়।
পাতায়ার মেয়র পোরামাসে এনগামপিচেস বলেন, একজন মার্কিন সামরিক সদস্য তীরে অবস্থান করার সময় এবং সেখানে রাত কাটান কি না—তার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ৩ হাজার বাত বা প্রায় ৩০ থেকে ৯১ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন।
তীরে নামার সুযোগ সাধারণত পর্যায়ক্রমে দেওয়া হয়। ফলে সব সামরিক সদস্য একই সময়ে জাহাজ থেকে তীরে নামবেন না।
পোরামাসে বলেন, 'এটি স্বল্পমেয়াদে পাতায়ার অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়তা করা উচিত।'
তবে অর্থের একটি অংশ পাতায়ার বিতর্কিত বিনোদনশিল্পেও প্রবাহিত হতে পারে। এই শিল্পের ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে, এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এ শহরকে 'বিশ্বের অন্যতম প্রধান যৌন পর্যটনকেন্দ্র' হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
ব্যাংকক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পিপাটপং ফাকফারে বলেন, 'স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ বিপুলসংখ্যক ক্রেতার আগমন যৌন শোষণ এবং যৌনবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।'
তিনি বিমানবাহী রণতরিটির সদস্যদের মধ্যে মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার চেষ্টার খবরের কথাও উল্লেখ করেন, যা উদ্বেগের ক্ষেত্রে আরও একটি মাত্রা যোগ করেছে।
পাতায়ায় মোট ৩ লাখেরও বেশি কক্ষ রয়েছে। শহরটির ওপর সামগ্রিক বাণিজ্যিক প্রভাব কতটা পড়বে, তা আংশিকভাবে নির্ভর করবে সামরিক সদস্যরা কোথায় সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তার ওপর। কারণ তাদের কেউ কেউ রাজধানী ব্যাংককেও যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন চনবুরি পর্যটন ফেডারেশনের সভাপতি থানেত সুপোর্নসাহাসরুংস্রি।
পাতায়া নাইটলাইফ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিসা হ্যামিল্টন বলেন, 'যখন আমরা শুনলাম, একটি মার্কিন নৌযান পাতায়ায় নোঙর করবে, তখন এটি আমাদের জন্য আশার কারণ হয়ে উঠেছিল।'
তিনি বলেন, 'আমি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পাতায়ায় বসবাস করছি, কিন্তু এ বছরের মতো এত ধীরগতির কোনো বছর আমি কখনো দেখিনি।'
