টানা ৩৫ দিন বৃষ্টি ঝরছে, রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ‘ক্লান্ত’ টোকিও; সূর্যের আলো দেখা গেছে মাত্র ৪৫.৮ ঘণ্টা
বুধবার সকালে টোকিওর বাসিন্দারা ঘুম থেকে ওঠেন এক পরিচিত শব্দ শুনে: জানালা ও বারান্দার মেঝেতে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ার শব্দ।
জাপানের রাজধানীতে টানা ৩৫ দিন ধরে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো-র যৌথ প্রভাবকে দায়ী করছেন। এল নিনোর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
এই রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে শাকসবজির দাম হু হু করে বেড়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। আর টোকিওর লাখ লাখ মানুষ ভাবছেন, তারা আদৌ আবার সূর্যের আলো দেখতে পাবেন কি না।
আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে চলতি সপ্তাহের সোমবার পর্যন্ত সেন্ট্রাল টোকিওতে ৬২৯ মিলিমিটার (২৪.৮ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত হয়েছে—যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।
জাপানি সংবাদমাধ্যম মাইনিচি শিমবুন জানিয়েছে, এই সময়ে টোকিওতে মাত্র ৪৫.৮ ঘণ্টা সূর্যের আলো দেখা গেছে, যা রেকর্ড অনুযায়ী দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এর মধ্যে ১৪ দিন একেবারেই সূর্যের দেখা মেলেনি।
এই আবহাওয়া মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। টোকিওর একটি ক্লিনিকের পরিচালক ও চিকিৎসক হিরোমিচি ইতো সানকেই শিমবুন পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি, বায়ুমণ্ডলের নিম্নচাপ ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরাসহ অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বুধবার সকালের শেষের দিকে বৃষ্টির তোড় কমে হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে পরিণত হলেও সামনে আরও বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এ বছরের এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরকে উত্তপ্ত করে তুলছে, যা জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জেএমএ-র কর্মকর্তা মাসায়ুকি কিয়োদা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, 'শরতের বৃষ্টিবলয়গুলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে অবস্থান করছে।'
টোকিওতে সাধারণত জুনে বর্ষাকাল আসে। তবে এবার পুরো গ্রীষ্মকালজুড়েই নিয়মিত ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের বেশ কিছু স্থানে বন্যা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে টাইফুন দুজুয়ানের কারণে পার্শ্ববর্তী চিবা প্রিফেকচারে বন্যা ও ভূমিধস হয়। এতে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটে, ধ্বংস হয়ে যায় কয়েক ডজন ঘরবাড়ি।
চলতি সপ্তাহে আবহাওয়া কর্মকর্তারা জানান, এবারের মৌসুমের ২৬তম টাইফুনটি উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি কান্তো অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে যেতে পারে, যেখানে টোকিওর অবস্থান।
১৮৮৬ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে টোকিওতে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের ঘটনা। কিয়োদা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই টানা বৃষ্টিপাতের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা কঠিন। তবে আবহাওয়া সংস্থা তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, অধিক বৃষ্টিপাতসহ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন জাপানের আবহাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
এর আগে টোকিওতে টানা সবচেয়ে বেশি দিন বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ছিল ৩৩ দিনের—২০১৯ সালের ২৭ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত।
সংবাদধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টোকিওর কাছাকাছি কৃষি অঞ্চলগুলোতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির কারণে শাকসবজির, বিশেষ করে পাতাযুক্ত সবজির দাম হু হু করে বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা ধোয়া কাপড় শুকাতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের স্থানীয় লন্ড্রিতে যেতে হচ্ছে।
গত ২৭ আগস্টের পর থেকে শহরটিতে একদিনও বৃষ্টিহীন বা শুকনো আবহাওয়া দেখা যায়নি। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'বৃষ্টি-ক্লান্তি' নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একজন এক্স ব্যবহারকারী বলেন, 'আমার মন খারাপের জন্য নিশ্চয় এই অবিরাম বৃষ্টিই দায়ী। আপনি যদি ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্ত বোধ করেন, তাহলে দোষটা আপনার নয়।'
র্যাডউইম্পস ব্যান্ডের লিড গায়ক ইয়োজিরো নোদা তার ১১ লাখ অনুসারীর উদ্দেশে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন: 'টোকিও, যেন এক আজীবন বৃষ্টির শহর।'
আরেকজন বলেছেন, শহরটির এই টানা বৃষ্টি বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখিত ৪০ দিন ও ৪০ রাতের বৃষ্টির ঘটনাকে টেক্কা দিতে পারবে কি না।
