জাপানে এশিয়ান গেমসে অব্যবস্থাপনা: ছোট বিছানায় পা মেলে শুতে পারছেন না খেলোয়াড়রা
জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিদল অস্থায়ী আবাসনব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত ছোট আকারের খাট নিয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে। এর মধ্যেই আয়োজকেরা একের পর এক ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
জাপানের নাগোয়া শহরে হাজারো খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকটি প্রতিনিধিদল আবাসন পেতে দেরি, যাতায়াতে নানা ধরনের সমস্যা, পরিচয়পত্র ও নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা এবং সরঞ্জাম নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি জং জে-ইয়ং অস্বাভাবিক আবাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে এটিকে তার দেখা 'সবচেয়ে খারাপ' ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, 'দুই মিটারের বেশি উচ্চতার খেলোয়াড়েরা খাটে পা পর্যন্ত সোজা করতে পারছেন না। এটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।'
দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড় বিয়ন জুন-হিয়ংও তার কক্ষের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে বেসিন থেকে পানি পড়তে এবং মেঝে ভিজে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে তিনি লিখেছেন, 'দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।'
গত সপ্তাহে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে নাগোয়ায় বন্যা দেখা দিলে আবাসন থেকে খেলোয়াড়দের অল্প সময়ের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
এবারের গেমসে ৪৫টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ১৭ হাজারের বেশি খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাওয়া এই আসরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আয়োজকদের প্রাথমিকভাবে ধারণা করা ১৫ হাজারের চেয়েও বেশি।
প্রচলিত খেলোয়াড়দের জন্য নির্দিষ্ট আবাসনকেন্দ্রের পরিবর্তে এবার অংশগ্রহণকারীদের ইতালির একটি প্রমোদতরি, অস্থায়ী কনটেইনারধাঁচের আবাসন এবং বাণিজ্যিক হোটেলগুলোতে রাখা হচ্ছে। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাসহ প্রায় চার হাজার মানুষ কোস্তা সেরেনা নামের প্রমোদতরিতে থাকবেন। আর প্রায় দুই হাজার মানুষকে অস্থায়ী কক্ষে রাখা হবে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নাকি জাপানে যাওয়ার আগে খেলোয়াড়দের অস্থায়ী আবাসনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে একই ধরনের অস্থায়ী কক্ষের প্রতিরূপ তৈরি করেছে।
ফিলিপাইন অলিম্পিক কমিটির সভাপতি আব্রাহাম তোলেন্তিনো বলেছেন, ফিলিপাইনের সব খেলোয়াড়ের জন্য কক্ষ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কিছু কর্মকর্তা ও কোচকে অন্য হোটেল এবং ভাড়ায় নেওয়া ব্যক্তিগত আবাসনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ভারতের প্রতিনিধিদলও আবাসন পেতে দেরির কথা জানিয়েছে।
ভারতের নৌকাবাইচ দল জাপানের স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টার দিকে প্রমোদতরিতে পৌঁছায়। তবে ভারতের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও কয়েকজন খেলোয়াড় কক্ষের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ভারতের নৌকাবাইচ ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, '২২ জন পুরুষ খেলোয়াড়ের মধ্যে মাত্র তিনজনের নামের বিপরীতে আবাসন দেওয়া হয়েছে। আর পাঁচজন নারী নৌকাবাইচ খেলোয়াড়ের মধ্যে তিনজনের নাম আয়োজকদের ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হয়নি, যদিও তাদের সবার বৈধ পরিচয়পত্র রয়েছে।'
কক্ষ বরাদ্দে এই দেরি খাবার ও বিশ্রাম নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একজন নৌকাবাইচ খেলোয়াড় জানান, কক্ষের জন্য অপেক্ষা করার সময় আয়োজকেরা খেলোয়াড়দের পানি দিয়েছিলেন, কিন্তু যথাযথ খাবার দেননি। ফলে কয়েকজনকে ভারত থেকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ওই খেলোয়াড় বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিযোগিতার আগে দলটি পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেনি।
ভারতের শুটিং দলও আলাদা সমস্যার কথা জানিয়েছে। মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তারা পরিবহনের জন্য প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত ভোর প্রায় ৪টার দিকে তারা হোটেলে পৌঁছায়।
দলটিকে পরে অন্য একটি হোটেলেও স্থানান্তর করা হয়। কারণ, তাদের জন্য নির্ধারিত আগের হোটেলটি অন্য অংশগ্রহণকারীদের দিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ভারতের পিস্তল শুটিং দলের প্রধান কোচ সমরেশ জং পরিচয়পত্রসংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়েন। এর ফলে তিনি খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা এলাকায় এবং খেলার মাঠে প্রবেশ করতে পারেননি। বিষয়টি ভারতের জাতীয় রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে তোলা হয়েছে এবং তার জন্য নতুন পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের উশু প্রতিনিধিদলও নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যায় পড়ে। শুরুতে একজন খেলোয়াড় ও দুই কোচ আবাসন ব্যবস্থায় নিজেদের নাম খুঁজে পাননি।
পরে ভারতের অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, সব খেলোয়াড়ই কক্ষ পেয়েছেন।
টেবিল টেনিস দল জানিয়েছে, তাদের কক্ষে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় নিয়েছে। তবে দলের একজন সদস্য বলেছেন, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
যাতায়াত ব্যবস্থাতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ ফুটবল দল নির্ধারিত বাস না আসায় প্রস্তুতিমূলক অনুশীলনে প্রায় ২০ মিনিট দেরিতে পৌঁছায় বলে জানা গেছে।
এর এক দিন আগে দলটির বাস তাদের নির্ধারিত মিজুহো রাগবি স্টেডিয়ামের পরিবর্তে একটি বেসবল মাঠে নিয়ে যায়। এতে তাদের ৩০ মিনিট দেরি হয়।
কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আরও কয়েকটি দল একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, 'পুরো প্রতিযোগিতাজুড়েই প্রতিটি অনুশীলন ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে যানবাহন নির্ধারণ ও পরিচালনা নিয়ে ছোটখাটো সমস্যা নিয়মিত দেখা দিচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'শুধু আমরা নই, বর্তমানে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সব দলই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।'
আয়োজকেরাও আবাসন নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
রয়টার্সকে আবাসন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ইউতা মাতসুও বলেন, 'খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিদলগুলো যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে আমরা পুরোপুরি অবগত।'
তিনি বলেন, 'তবে আমরা শুধু এসব সমস্যা স্বীকার করেই বসে নেই। খেলোয়াড়দের অবস্থান ও জীবনযাপনের পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে ইতোমধ্যে আমরা বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছি।'
আয়োজক কমিটির সভাপতি হিদেয়াকি ওমুরাও বলেছেন, 'ভিন্ন ধরনের মতামত থাকলে আমরা সেগুলোর যথাযথভাবে জবাব দেব।'
তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে আমরা যেমন ব্যক্তিগতভাবে পাওয়া মতামতগুলোর জবাব দিচ্ছি, তেমনি সমস্যা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর উন্নতি করছি এবং ভবিষ্যতেও এভাবেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যাব।'
এর আগে আয়োজকেরা জানিয়েছিলেন, জুলাইয়ের নির্ধারিত সময়সীমার আগে নিবন্ধন করা সব খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাকে 'গেমসের উপযোগী আবাসন' দেওয়া হয়েছে এবং প্রস্তুতি নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলছে।
আবহাওয়াও আয়োজকদের জন্য আরেকটি বড় ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা দেখা দিয়েছে, ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং কয়েক শ খেলোয়াড়কে তাদের আবাসন থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
জাপানের প্রতিনিধি দলের প্রধান কোসেই ইনোয়ে বলেছেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিযোগিতা দেরিতে শুরু হয়েছে বা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, ২১ সেপ্টেম্বরের দিকে একটি ঘূর্ণিঝড় জাপানের দিকে এগিয়ে আসতে পারে।
তিনি বলেন, 'এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে জাপান অলিম্পিক কমিটির ভেতরে আমরা ব্যাপকভাবে বৈঠক করছি, যাতে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত থাকি এবং এসব পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারি।'
