নাগরিকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপে নতুন কঠোর নিয়ম কার্যকর করল চীন
চীন মঙ্গলবার নতুন ভ্রমণ নিয়ম কার্যকর করা শুরু করেছে, যা কমিউনিস্ট সরকারকে নাগরিকদের চলাচলের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিচ্ছে। প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানি বিধিমালার কথিত লঙ্ঘন রুখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যার অধীনে জাতীয় প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি বলে বিবেচিত যেকোনো নাগরিকের দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে।
এই বিধানগুলো সরকারি কর্মকর্তা, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং সেই সাথে সাধারণ নাগরিকদের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যদিও চীনা নাগরিকদের ভ্রমণের সাধারণত স্বাধীনতা রয়েছে, তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করা ব্যক্তিদের যাতায়াতের ওপর নজর রাখে সরকার। নতুন এই নিয়ম চীনকে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যখন বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় খুব কম মানুষই দেশের বাইরে যাওয়ার সাহস পেতেন।
নতুন বিধিমালার অধীনে বিদেশে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করে এমন "অবৈধ বা অপরাধমূলক কাজ" করে ফিরে আসা যেকোনো নাগরিক শাস্তি হিসেবে ছয় মাস থেকে তিন বছরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হবেন। ভিসা আবেদনে ভুয়া বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করার অপরাধে বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে।
গত ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং মঙ্গলবার কার্যকর হওয়া 'স্টেট কাউন্সিল রেগুলেশনস অন এক্সিট অ্যান্ড এন্ট্রি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' আইনের মাধ্যমে নতুন এই নিয়মগুলো প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটিকে প্রযুক্তি সংক্রান্ত গোপন তথ্য পাচার রোধ এবং বিদেশি নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার লক্ষ্যে বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকার তাদের "গুজব নিরসনকারী" প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দাবি করেছে, নতুন এই নিয়মগুলো সাধারণ নাগরিকদের ভ্রমণে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না, বরং ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য এবং অস্বাভাবিক ভ্রমণ আচরণের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এ আইনের ৪ নম্বর ধারা অনুসারে, 'রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রযুক্তি আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করা কোনো চীনা নাগরিক যদি জাতীয় শিল্প বা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাকে দেশত্যাগে বাধা দেওয়া হবে।'
অন্য একটি ধারায় বেসরকারি অভিবাসন সংস্থাগুলোকে যারা নিয়ম লঙ্ঘন করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এমন সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কর্মী বা অন্যান্য ব্যক্তিদের তথ্য জানানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। গোপন তথ্যে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় নির্বাহীদের ওপর ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা 'সেফগার্ড ডিফেন্ডারস' তাদের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চীন ক্রমাগতভাবে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার বৃদ্ধি করে চলেছে। গত মার্চে বেইজিং চীনের এআই প্রতিষ্ঠান 'মানুস'-এর দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যে প্রতিষ্ঠানটিকে মেটা ২০০ কোটি ডলারে কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
২০২৩ সালে বেইজিং যখন বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তখন চীনা সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানান, তারা ব্যক্তিগত কাজে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ এবং বিদেশি যোগাযোগের বিষয়ে কড়া নজরদারির মুখোমুখি হচ্ছেন।
গত জুনে জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার অভিযোগে মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন নাগরিক মিন জিনকে গ্রেফতার করে চীনা কর্তৃপক্ষ। নতুন এই নিয়মের কারণে তাইওয়ান—যাকে বেইজিং নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে—তাদের নাগরিকদের চীন সফরের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।
তাইওয়ানের চীন-নীতি বিষয়ক সংস্থা 'মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল'-এর উপ-প্রধান শেন ইউ-চুং বলেছেন, এই নিয়মগুলো পূর্বের আইনগত ভিত্তিহীন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ডকে "বৈধতা" প্রদান করে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
