যৌথ ‘সীমান্ত কমিশন’ চালু করল চীন ও পাকিস্তান, তীব্র আপত্তি জানাল ভারত
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, বাণিজ্য প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে 'সীমান্ত যৌথ কমিশন' চালুর ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। এ ঘোষণার পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশনের কার্যক্রমের বিরোধিতা করে ভারত দাবি করেছে, এ কমিশনের কোনো 'আইনি ভিত্তি' নেই। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে আইনত স্বীকৃত কোনো সীমান্ত নেই এবং ভারতের ভূখণ্ড জড়িত, এমন কোনো চুক্তিতে যাওয়ার অধিকার ইসলামাবাদের নেই বলেও দাবি করেছে নয়াদিল্লি।
ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের চার দিন পর এ ঘটনা ঘটল। ওই বৈঠকে ভারত-চীন সম্পর্ক স্থিতিশীল করার অংশ হিসেবে দুই নেতা সীমান্ত ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
বুধবারই পাকিস্তান জানায়, তারা চীনের সঙ্গে এই সীমান্ত যৌথ কমিশনের কার্যক্রম শুরু করেছে। ইসলামাবাদ বলছে, এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ সীমান্ত জরিপ, বাণিজ্য প্রবাহ ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার কাঠামো।
ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ কমিশনের উদ্বোধনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে যৌথভাবে নেতৃত্ব দেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক লি ইয়া ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চীন-বিষয়ক মহাপরিচালক বিলাল মাহমুদ চৌধুরী।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, এ বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান 'স্পষ্ট'।
জয়সোয়াল বলেন, 'পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা আইনি ভিত্তিহীন তথাকথিত এই যৌথ কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করছি।'
চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার যে সীমান্ত এলাকাকে ভারত তাদের কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের অংশ বলে দাবি করে, ওইসব এলাকা নিয়ে কাজ করবে এই যৌথ কমিশন। ১৯৬৩ সালের এক চুক্তির আওতায় পাকিস্তান এ ভূখণ্ডের প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, যা ভারত মেনে নেয়নি।
জয়সোয়াল বলেন, 'আমরা কখনোই ১৯৬৩ সালের তথাকথিত "চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি"কে স্বীকৃতি দিইনি। ধারাবাহিকভাবে আমরা একে বেআইনি ও বাতিল বলে দাবি করে আসছি।'
ভারত সরকার বলছে, ওই ভূখণ্ড পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ। তাই আইনগতভাবে অঞ্চলটি চীনের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লির উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চীনের অবকাঠামো নির্মাণ ও বিনিয়োগ নিয়ে ভারত চিন্তিত।
ভারত ধারাবাহিকভাবে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের (সিপিইসি) বিরোধিতা করে আসছে। বিরোধিতার কারণ হিসেবে তারা বলছে, এ করিডোরের কিছু অংশ ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে গেছে।
অন্যদিকে চীনের বক্তব্য হলো, ১৯৬০-এর দশকে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে তাদের সীমানা নির্ধারণ করেছে। আর ওই এলাকায় অবকাঠামোগত নির্মাণ চীনের ভূখণ্ডেই হচ্ছে।
বুধবার জয়সোয়াল দাবি করেন, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের পুরো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল 'সবসময় ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং চিরকাল থাকবে।' তিনি বলেন, অবৈধ ও জোরপূর্বক দখল করে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের চুক্তিতে যাওয়ার 'কোনো আইনি এখতিয়ার পাকিস্তানের নেই'।
তিনি আরও বলেন, 'ভারতীয় ভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার তথাকথিত সীমান্ত সহযোগিতা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। এই ভূখণ্ডগুলোর ওপর ভারতের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বে এর কোনো প্রভাবই পড়বে না।'
এর আগে শনিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারত সফর করেন। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরে এক সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ব লাদাখের লাইন অভ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) বরাবর দীর্ঘদিনের সামরিক অচলাবস্থার অবসান ঘটে। এরপর থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সপ্তাহের আগে, এই সময়ের মধ্যে মোদি ও জিনপিংয়ের দুবার সাক্ষাৎ হয়।
