ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম ডলার বন্ড ছাড়তে চায় সরকার, লক্ষ্য ৫০–১০০ কোটি ডলার
অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সার্বভৌম ডলার বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
এই বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম ঋণপত্র ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির কাছ থেকে বন্ডের আকার ও ইস্যুর শর্তাবলির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ড ইস্যু করার আশা করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা বিদেশি পুঁজিবাজারে ডলার বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা করেছি এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ভালোই সাড়া পাচ্ছি। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বন্ড ইস্যু করা হতে পারে।"
এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনা এবং অর্থায়নের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার উপায় সুপারিশ করতে অর্থ মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, সেটিরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তানভীর।
কমিটি গঠনের পর থেকে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে এবং ডলার-ডিনোমিনেটেড বন্ড ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলারের বন্ড ছাড়া হতে পারে। তবে এর আকার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
কমিটি উদীয়মান দেশগুলোর সরকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা আন্তর্জাতিক বন্ডের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণে জেপি মরগানের তৈরি বেঞ্চমার্ক ইমার্জিং মার্কেটস বন্ড ইনডেক্সে (ইএমবিআই) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতার শর্তও পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, যোগ্য ঋণপত্রের বকেয়া অভিহিত মূল্য ৫০ কোটি ডলারের বেশি হতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহ করেনি। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ঋণ নিয়ে থাকে।
ডলার বন্ডের পাশাপাশি অন্যান্য মুদ্রা ও ধরনের বন্ড—যেমন সুকুক, পান্ডা, সামুরাই ও ডিমসাম বন্ড নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, "বাংলাদেশকে বিকল্প অর্থায়নের দিকে যেতেই হবে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিকল্প অর্থায়নের নতুন উৎস যুক্ত হবে।"
বন্ড ইস্যুসংক্রান্ত কমিটি গঠনের আগেই পান্ডা বন্ড ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। এ ছাড়া সুকুক বন্ড নিয়েও আলোচনা চলছে।
ডলার বন্ডের বিষয়ে তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, "ডলারে বন্ড ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করতে পারলে অন্যান্য মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করা সহজ হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে, ফলে অন্যান্য বন্ডের মাধ্যমেও মূলধন সংগ্রহ সহজ হবে।"
তিনি আরও বলেন, "ডলার বন্ডের পর সুকুক বন্ড, সামুরাই বন্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড ও ডায়াসপোরা বন্ড ইস্যু করা হবে। ডলার বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিকল্প অর্থায়নের যাত্রা শুরু হলে আশা করি, অন্যান্য বন্ড ইস্যু করাও সহজ হবে।"
বিকল্প অর্থায়নে জোর
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আট সদস্যের কমিটি বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।
ভবিষ্যতে বন্ড ইস্যুর আকার, মুদ্রা ও বাজারের পাশাপাশি বন্ডের মেয়াদ, সুদহারের কাঠামো, ইস্যুর সময় এবং অন্যান্য আর্থিক ও কারিগরি বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।
বন্ড ইস্যুর জন্য সরকারের অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। সরকারের অর্থায়নের বিকল্প উৎস চিহ্নিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ যাচাইয়ের দায়িত্ব রয়েছে এ কমিটির ওপর।
তানভীর বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠনের পর থেকেই বন্ড ইস্যুর কাজ চলছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ মূলত খুব দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য গড়ে উঠেছিল। আমাদের মতো প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে থাকা একটি দেশের অর্থায়নের বিকল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের বেসরকারি বাজারে যেতে হবে। অর্থায়নের অনেক ধরন রয়েছে—সামুরাই বন্ড, হেজ ফান্ড, প্রাইভেট ইকুইটি, পান্ডা বন্ড, সার্বভৌম বন্ড। আমাদের সামনে অনেক বিকল্প রয়েছে।"
পান্ডা বন্ডের প্রস্তাব
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে বাংলাদেশকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দেয় চীন সরকার। সফরের আগে চীনের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে এবং এ প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, পান্ডা বন্ড চালুর উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও চীন সম্মত হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারের অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির বৈঠকেও পান্ডা বন্ডসহ বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৫ কোটি ডলারের পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সমর্থন জানান। তবে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, সম্ভাব্য পান্ডা বন্ড ইস্যুতে চীন সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারে।
পরে বৈঠকে পান্ডা বন্ডসহ বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
