চীনের বৃহত্তম মরুভূমির নিচে অপ্রত্যাশিতভাবে বিশাল পানির উৎসের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা
চীনের বৃহত্তম মরুভূমির নিচে দুটি বড় পানির উৎসের সন্ধান পেয়েছেন ভূতাত্ত্বিকরা। এ আবিষ্কার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বালু-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ও কৃষিকাজের জন্য নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
গ্রেট গ্রিন ওয়াল উদ্যোগের আওতায় এ মরুভূমির প্রান্তজুড়ে ব্যাপক বনায়ন এবং মরুকরণ রোধের প্রচেষ্টা চলছে। বৃষ্টিপাতের নতুন প্রবণতা চীনের শুষ্ক পশ্চিমাঞ্চলকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে।
সোমবার সিসিটিভি ফাইন্যান্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ব্যুরো তাকলামাকান মরুভূমিতে একটি পানি-সন্ধান প্রকল্প পরিচালনা করে। ভূগর্ভস্থ এই পানির আবিষ্কার সেই প্রকল্পেরই অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'মরুভূমির নিচে কেবল বদ্ধ ও লবণাক্ত পানিই থাকে'—প্রচলিত এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এ আবিষ্কার।
বদ্ধ ভূগর্ভস্থ পানি হলো এমন উৎস, যার প্রবাহ ধীর হয়ে গেছে বা সম্পূর্ণ থেমে গেছে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিক পদার্থ জমা হয়ে ওই পানি পান করা বা খাদ্য উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
নতুন আবিষ্কৃত পানির উৎসগুলোর একটি পাওয়া গেছে মিনফেং কাউন্টির আন্দির টাউনশিপে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলমান বালুর মরুভূমি তাকলামাকানের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।
দ্বিতীয় উৎসটির সন্ধান মিলেছে মরুভূমির ভেতরের দিকে, মাজারতাগ পর্বতমালার দক্ষিণে।
পানি অনুসন্ধান প্রকল্পের অংশ হিসেবে গবেষকরা একটি টেস্ট স্টেশনও নির্মাণ করেছেন। মরুভূমির প্রান্তজুড়ে সেচকাজ ও মরুকরণ রোধে ঈষৎ লোনা পানি (ব্র্যাকিশ ওয়াটার) ব্যবহার করাই এর উদ্দেশ্য। এই পানিতে মিঠা পানির চেয়ে বেশি কিন্তু সমুদ্রের পানির চেয়ে কম লবণ থাকে।
পৃথিবীর মোট পানির মাত্র কয়েক শতাংশ হলো মিঠা পানি। সেদিক থেকে ঈষৎ লোনা পানিকে অব্যবহৃত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফসলের সেচকাজ ও এআই ডেটা সেন্টার শীতল করার জন্য যেভাবে পানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে, তা এই পানি বেশ সহায়ক হতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ঈষৎ লোনা বা আধা লোনা পানিসহ অপ্রচলিত পানির উৎসগুলো সেচের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে এগুলো সীমিত পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর ব্যবহারের জন্য স্থানীয় জলবায়ু, মাটি ও ফসল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
লবণ-সহনশীল ফসল ফলানোর জন্য ঈষৎ লোনা পানি ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন চীনসহ সারা বিশ্বের গবেষকরা। তবে নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য এখনও পানি লবণমুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
শিনজিয়াংয়ের তারিম অববাহিকায় অবস্থিত তাকলামাকান মরুভূমিটি ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা আয়তনে প্রায় জার্মানির সমান। চলমান বালিয়াড়ি ও রুক্ষ জলবায়ুর কারণে এই মরুভূমির নাম দেওয়া হয়েছে 'মৃত্যুর সাগর'।
২০১৫ সালে চাইনিজ একাডেমি অভ সায়েন্সেসের শিনজিয়াং ইনস্টিটিউট অভ ইকোলজি অ্যান্ড জিওগ্রাফির গবেষকরা আবিষ্কার করেন, এই অববাহিকার নিচে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ মহাসাগর থাকতে পারে। উত্তর আমেরিকার পাঁচটি গ্রেট লেকসের সম্মিলিত পানির চেয়েও এই মহাসাগরের পানির পরিমাণ বেশি হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবেই তাকলামাকান মরুভূমিতে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম এবং বাষ্পীভবনের হার অত্যাধিক। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সম্প্রতি এখানে ভারী বৃষ্টিপাত ও নজিরবিহীন বন্যার ঘটনা বেড়েছে, যা স্থানীয় অবকাঠামোগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিস্তৃত গ্রেট গ্রিন ওয়াল উদ্যোগের আওতায় এই মরুভূমি চীনের বনায়ন ও মরুকরণ রোধ প্রচেষ্টার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বালুঝড় রোধ ও আঞ্চলিক অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে ২০২৪ সালে মরুভূমির চারপাশ ঘিরে ৩ হাজার ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সবুজ বেষ্টনীর কাজ শেষ হয়েছে। এ বেষ্টনীতে গাছপালা ও গুল্মের পাশাপাশি বালু প্রতিরোধক সোলার প্যানেল আছে।
এসব প্রতিরক্ষামূলক প্রকল্পের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে মরুভূমির প্রান্তজুড়ে ফসলের চাষও করছে চীন। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কুনইউ শহরে একটি গমের খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
বালু নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিকাজে সহায়তার জন্য চীনের শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে পিভট বা ড্রিপ সেচ পদ্ধতির মতো পানি-সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও মরুভূমিতে ফসল উৎপাদনের এসব উদ্যোগে পানি সরবরাহ বড় উদ্বেগের বিষয় হয়েই আছে।
