ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাব: চাকরি গেলেই সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে কর্মীভিসায় আসা বিদেশিদের, পাবেন না গ্রেস পিরিয়ড
যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ক ভিসায় (কর্মী ভিসা) বৈধভাবে অবস্থানকারী কোনো অভিবাসী চাকরি হারালে বা চাকরি ছেড়ে দিলে তাকে অবিলম্বে সে দেশ ত্যাগ করতে হবে—এমন একটি কঠোর নিয়মের প্রস্তাব করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) প্রস্তাবিত এই নিয়ম কার্যকর হলে বিদেশি কর্মীদের চাকরি হারানোর পর দেশটিতে থাকার প্রচলিত ৬০ দিনের অতিরিক্ত সময় (গ্রেস পিরিয়ড) পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে। এর ফলে কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিবাসীদের বৈধ অবস্থানের মর্যাদাও বাতিল হবে।
বর্তমানে ওয়ার্ক ভিসাধারীরা কোনো কারণে চাকরিচ্যুত হলে বা ইস্তফা দিলে নতুন কর্মসংস্থান খোঁজা কিংবা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুযোগ পান।
নতুন নীতিমালার প্রস্তাবে ডিএইচএস উল্লেখ করেছে, 'এই প্রস্তাবের মাধ্যমে অভিবাসীর বৈধ অবস্থান এবং যে চাকরি বা কাজের ভিত্তিতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেই সম্পর্ক আবারও স্পষ্ট করা হচ্ছে।'
প্রস্তাবিত এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে যাওয়া বহু অভিবাসীর ওপর। বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসাধারী দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য এটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্ল্যাটফর্ম 'ফেডারেল রেজিস্টারে' প্রকাশিত এই প্রস্তাবটি মূলত বিদেশি জনবলের ওপর নির্ভরশীল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। পাশাপাশি দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের জন্যও ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা স্বীকার করা হয়েছে। তবে যুক্তি হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, 'ডিএইচএস মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবাই সমান যোগ্যতার মার্কিন কর্মীদের একই চাকরির সুযোগ দেবে।'
মূলত মার্কিন নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের পরিধি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি কর্মীদের সংখ্যা কমানোর এ উদ্যোগ নিচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প 'বাই আমেরিকান অ্যান্ড হায়ার আমেরিকান' (আমেরিকান পণ্য কিনুন ও আমেরিকানদের কাজে নিন) শীর্ষক একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় কর্মীদের কাজের সুযোগ ও মজুরি বৃদ্ধি করা।
এর আগে অভিবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে ২০১৭ সালে এই ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড চালু করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, আকস্মিক চাকরি হারানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্মী যেন নতুন কোনো কাজ খুঁজতে পারেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা গুছিয়ে নিতে পারেন। তবে ডিএইচএসের দাবি, এই সময়সীমা প্রত্যাহার করা হলে বিভাগের প্রশাসনিক কাজের চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন হলে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসাধারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এইচ-১বি ভিসা, যার ওপর ভিত্তি করে ভারত ও চীনের বিপুলসংখ্যক পেশাজীবী যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান পেয়ে থাকেন।
একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর ও চিলির নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট এইচ-১বি১ দক্ষ কর্মী ভিসা এবং অস্ট্রেলীয়দের জন্য বিশেষায়িত ই-৩ ভিসাধারীরাও নতুন এই কাঠামোর আওতায় পড়বেন।
প্রস্তাবের প্রভাব পড়বে সৃষ্টিশীল ও বিনোদন অঙ্গনের পেশাজীবীদের ওপরও। বিশেষ করে যেসব খাতে চুক্তিভিত্তিক ও ঘন ঘন কাজ পরিবর্তনের সুযোগ থাকে, সেখানে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞান, খেলাধুলা কিংবা শিল্পকলায় 'অসাধারণ দক্ষতা' সম্পন্ন ব্যক্তিদের দেওয়া ও-১ ভিসাধারীরাও এই নিয়মের মধ্যে পড়বেন।
এ ছাড়া টিএন ক্যাটাগরির ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় চালু হওয়া এই ভিসার মাধ্যমে মেক্সিকো ও কানাডার যোগ্য পেশাজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতি পেয়ে থাকেন।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ই-১ ভিসা, বাণিজ্যিক যানবাহন পরিচালনায় যুক্ত ই-২ ভিসা এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্বল্পমেয়াদি এল-১ ভিসাধারীরাও এই বিধিনিষেধের কবলে পড়বেন।
তবে অবিলম্বে কার্যকর না করে জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রস্তাবটি দুই মাস উন্মুক্ত রাখা হবে। এ প্রক্রিয়ার পর চূড়ান্তভাবে এটি আইনে পরিণত হতে পারে।
