ভারতে ব্যাংকের কারেন্সি চেস্টে মিলল ১৭.২৯ কোটি রুপির জাল নোট; নেপালের যোগসূত্র থাকার সন্দেহ
ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) কর্তৃক পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (পিএনবি) এক কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের ঘটনা উত্তর প্রদেশের অন্যতম বৃহৎ জাল নোট উদ্ধারের তদন্তকে আরও জোরদার করেছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ব্যাংকের কারেন্সি চেস্টের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৭ কোটি ২৯ লাখ রুপির জাল নোট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সক্রিয় কোনো বড় চক্রের অংশ ছিল কি না। মঙ্গলবার এনআইএ-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।
পিএনবি ম্যানেজারকে গ্রেফতার করেছে এনআইএ
ঘটনার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এবং জাগাধরি কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার অমিত কুমারকে সোমবার গ্রেফতার করেছে এনআইএ। সাহারানপুরের সোফিয়া মার্কেট এলাকার পিএনবি কারেন্সি চেস্টে জাল ভারতীয় রুপি সনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকের যে তিন কর্মকর্তা তদন্তের আওতায় আসেন, তিনি তাদের অন্যতম।
জাল নোটগুলো কোনো ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে, অপরাধীদের আস্তানা থেকে কিংবা সীমান্ত পারাপারের সময় জব্দ করা হয়নি বরং এটি উদ্ধার করা হয়েছে ব্যাংকের একটি সুরক্ষিত কারেন্সি চেস্টের ভেতর থেকে। ফলে কীভাবে এসব জাল নোট ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করল এবং এর কিছু অংশ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে পড়েছিল কি না—সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এনআইএ জানিয়েছে, মামলাটি পিএনবি কারেন্সি চেস্টে জাল নোট সংক্রান্ত এক ষড়যন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত। পুরো ষড়যন্ত্র উদঘাটন করা এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের লক্ষ্যে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তের আওতায় পিএনবি-র তিন কর্মকর্তা
তদন্তে চিহ্নিত পিএনবি-র তিন কর্মকর্তা হলেন—সিনিয়র ডিভিশনাল ম্যানেজার রবি কুমার কানসে, সোফিয়া মার্কেট কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার সুশীল কুমার এবং জাগাধরি কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার অমিত কুমার। প্রাথমিক তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের তিনজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করে।
অভিযুক্তরা নেপালে পালিয়ে যেতে পারেন এমন আশঙ্কায় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করে। পরবর্তীতে এসআইটি এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চ ওই তিন কর্মকর্তার বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও নথিপত্র জব্দ করে।
তাদের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, চালচলন এবং অন্যান্যদের সাথে সম্ভাব্য কোনো যোগসাজশ রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্তকারীরা জব্দকৃত এসব উপাদান পরীক্ষা করছেন।
তদন্তের দায়িত্বে এনআইএ
গত ৩ সেপ্টেম্বর এনআইএ তদন্তের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর নতুন করে মামলাটি নথিভুক্ত করেছে। এর আগে গত ২৯ আগস্ট ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৭৮ নম্বর ধারায় সদর বাজার পুলিশ স্টেশনে মূল এফআইআর নথিবদ্ধ করা হয়। জাল নোট ধরা পড়ার আগে নগদ অর্থের লেনদেন ও চলাচলের ধারাবাহিক ক্রমপুনর্গঠন করছেন তদন্তকারীরা।
জাল নোট কীভাবে কারেন্সি চেইনে বা অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল?
তদন্ত থেকে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, গত ৬ জুলাই কারেন্সি-হ্যান্ডলিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাহারানপুর থেকে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক-এর জয়পুর কার্যালয়ে ১১১ কোটি রুপি পাঠানো হয়। জানা গেছে, এই চালানে ৫০০ টাকার নোটের ১ হাজার ৯০০টি বান্ডেল এবং ২০০ টাকার নোটের ৮০০টি বান্ডেল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তদন্তকারীরা এই চালানের প্যাকিং এবং তা প্রেরণের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করছেন—যেটি একজন খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। তারা মূলত চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন যে ঠিক কোন পর্যায়ে এই সন্দেহভাজন জাল নোটগুলো অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করে।
অনিয়মটি ধরা পড়ার আগেই এই কারেন্সি চেস্ট থেকে জাল নোটগুলো বিভিন্ন ব্যাংক শাখা এবং এটিএম-এ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তদন্তে সেই সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যতম প্রধান অমিমাংসিত প্রশ্ন হলো—সন্দেহভাজন এই জাল নোটগুলোর কী পরিমাণ অংশ ইতোমধ্যেই সাধারণ লেনদেনে ছড়িয়ে পড়েছে। কারেন্সি চেস্টের বাইরে কী পরিমাণ জাল টাকা গিয়ে থাকতে পারে, তদন্তকারীরা এখনো তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
তদন্তের অধীনে সম্ভাব্য নেপালেন যোগসূত্র
তদন্তে এখন একটি সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত মাত্রাও যোগ হয়েছে। তিন অভিযুক্ত ব্যক্তির নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি কিংবা সীমান্ত পারের সক্রিয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ ছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে পুলিশ তাদের পরিচিতি এবং চালচলন পরীক্ষা করছে। অভিযুক্তরা দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন—এমন আশঙ্কার কারণেই মূলত তাদের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করা হয়েছিল।
তবে, নেপালের সাথে কোনো নিশ্চিত যোগসূত্র এখনো প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তকারীরা আপাতত এটিকে তদন্তের একটি সম্ভাব্য পথ বা দিক হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সাহারানপুরের এসএসপি অভিনন্দন এর আগে তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধারের এবং তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
