যেভাবে একা হাতে ভারতের একটি আবর্জনাভর্তি নদী পরিষ্কার করলেন ২১ বছরের তরুণ
ভারতের ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী মাসের পর মাস ধরে নোংরা একটি নদীতে নেমে প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা ও অন্যান্য আবর্জনা তুলে পরিষ্কার করছেন। এ কাজে তার সম্বল বলতে সাধারণ কিছু সরঞ্জাম আর নিজের দুই হাত।
সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী নামের এই তরুণ অনলাইন দুনিয়ায় 'বিট্টু তাবাহি' নামে পরিচিত। ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বিয়াওরা নামক ছোট শহরের এই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী গত জানুয়ারি মাস থেকে স্থানীয় আজনার নদী পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন।
শুরুতে কয়েকজন বন্ধু তাঁকে সাহায্য করলেও ধীরে ধীরে তা একক প্রচেষ্টায় রূপ নেয়। অন্য সবাই কাজ বন্ধ করে দিলেও সুরেন্দ্র একা নদী পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী তার মা-বাবার সঙ্গেই থাকেন। প্রথম দিকে তিনি মা-বাবার কাছে মিথ্যা বলে বাড়ি থেকে বের হতেন। ক্রিকেট খেলতে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে তিনি নদী পরিষ্কার করতে চলে যেতেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে জানিয়েছেন।
আজনার নদীটি একটি মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে, যেখানে সুরেন্দ্র নিয়মিত যেতেন। সেখানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা দেখেই মূলত তিনি নদীটি পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেন। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি বলেন, 'আমি আগে থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতাম। যখনই আমি মন্দিরে যেতাম বা নদীর পাশ দিয়ে যেতাম, তখনই নদীটি পরিষ্কার করার কথা ভাবতাম।'
ঋতু পরিবর্তনের পরোয়া না করে শীত ও গ্রীষ্মের তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি এই কাজ চালিয়ে গেছেন। সাঁতার না জানা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তীব্র গরমে তিনি সন্ধ্যায়ও নদীতে নেমে যেতেন। গত এপ্রিলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি নদী পরিষ্কারের জন্য একটি মেশিন তৈরি করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। আমি একজন ছাত্র। তাই আমি ভাবলাম, নিজের হাত দিয়ে যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার করব।' দূষিত পানিতে দিনের পর দিন কাজ করার ফলে তার হাত ও পায়ের চামড়া উঠে গিয়েছিল এবং তিনি চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
সুরেন্দ্র এবং তার বন্ধুরা মিলে সরঞ্জামের জন্য টাকা জমিয়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি জানান, এই কাজে তিনি নিজের প্রায় ৩০ হাজার রুপি খরচ করেছেন। কোনো অর্থ সহায়তা ছাড়াই তিনি নদীর চারপাশে বেশ কয়েকটি ডাস্টবিনও স্থাপন করেছিলেন।
নদী পরিষ্কারের আগের ও পরের কিছু ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর বিয়াওরার বাইরেও বিপুল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সুরেন্দ্র। গত মার্চে ভারতের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও মাহিন্দ্রা গ্রুপের চেয়ারম্যান আনন্দ মাহিন্দ্রা তার কাজের একটি ভিডিও এক্সে (টুইটার) শেয়ার করেন। অনেকে সুরেন্দ্রের এই কাজকে স্রেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিউ বা লাইক পাওয়ার সস্তা চেষ্টা বলে সমালোচনা করলে তার জবাবে আনন্দ মাহিন্দ্রা বলেন, লাইক পাওয়ার ইচ্ছাও যদি 'ভালো কোনো কাজের অনুপ্রেরণা' হতে পারে, তবে তাতে তার কোনো আপত্তি নেই। তিনি সুরেন্দ্রকে তার 'সপ্তাহ শুরুর অনুপ্রেরণা' বলে অভিহিত করেন।
চলতি সপ্তাহে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক কেভিন পিটারসেনও ইনস্টাগ্রামে সুরেন্দ্রের নদী পরিষ্কারের আগের ও পরের ছবি শেয়ার করে তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন, 'আমি একে বীরত্বপূর্ণ বলব! ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য!' তবে অনেকে এই কাজের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে ছবি তৈরি করার অভিযোগ তুললে এক ভিডিও বাতায় সুরেন্দ্র তাঁর মাসের পর মাস ধরে করা শারীরিক পরিশ্রমের প্রমাণ তুলে ধরেন।
বর্তমানে বিয়াওরা পৌর কর্তৃপক্ষ জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও এই কাজে সুরেন্দ্রের সাথে যোগ দিয়েছেন বলে বার্তা সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন পৌরসভার সাব-ইঞ্জিনিয়ার রূপেশ কুমার নেতাম। তবে সুরেন্দ্রের মতে, মানুষ যদি নদীতে ময়লা ফেলা বন্ধ না করে, তবে কেবল ময়লা পরিষ্কার করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিয়াওরা নদীতে পাঁচটি বড় ড্রেনের বর্জ্য এসে পড়ে। এ জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ ১৪৭.৭ মিলিয়ন রুপির একটি সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের প্রস্তাব করেছে।
নদীতে ফেলা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার ফুল ও অন্যান্য ধর্মীয় উপচারও বর্জ্যের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। সুরেন্দ্র সেই ফুলগুলো নদী থেকে সংগ্রহ করে সার তৈরিতে ব্যবহার করছেন। তবে মানুষ যাতে নদীতে ময়লা না ফেলে, সে বিষয়ে তার কোনো হাত নেই। তিনি বলেন, 'আমি জানি না মানুষ কেন নদীতে ময়লা ফেলে। কেন তারা এমনটা করে তা আমি জানি না। আপনি তাদের থামাতে পারবেন না।'
গত শুক্রবার ডাচ বিজ্ঞানী এবং 'দ্য ওশান ক্লিনআপ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বোয়ান স্ল্যাট সুরেন্দ্রের কাজের একটি এক্স পোস্টের জবাবে স্রেফ লিখেছেন, 'আমাদের এখানে কাজ করতে চলে এসো।'
এ ছাড়া গত শনিবার মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ভোপালে তার বাসভবনে সুরেন্দ্রের সাথে দেখা করেন এবং তার এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
