পরবর্তী জেমস বন্ড নিয়ে ভক্তদের (০০)৭ প্রশ্নের উত্তর
জেমস বন্ড অনন্য এক চরিত্র। চরিত্রটি একজন অভিনয়শিল্পীকে এক অসাধারণ ও অভিজাত শ্রেণীতে উন্নীত করে। শন কনারি থেকে শুরু করে ড্যানিয়েল ক্রেইগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র সিরিজে এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়জন ব্যক্তি বন্ডের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে বন্ড চরিত্রে অভিনয় করা মোট অভিনেতার চেয়ে বেশি সংখ্যক প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন, আর চাঁদের মাটিতে হেঁটেছেন এর দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ। সর্বশেষ নতুন কোনো বন্ড অভিনেতার নাম ঘোষণা করা হয় ২১ বছর আগে, ২০০৫ সালে। তাই চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজির এই বহুল কাঙ্ক্ষিত চরিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভক্তদের মনে নানা প্রশ্ন জাগা এবং তার উত্তর খোঁজা স্বাভাবিক।
পরবর্তী (০০)৭ ভূমিকায় অভিনয়ে যিনি
গত ছয় বছর ধরে ভক্তদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। আর অফিসিয়াল ঘোষণার সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, জল্পনা-কল্পনাও বাড়ছে। কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু পরিচিত মুখ ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে। সেই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন—হেনরি ক্যাভিল, হ্যারিস ডিকিনসন, জ্যাকব ইলর্ডি, জ্যাক লোডেন, জেমস নর্টন, জ্যাক ও'কনেল, ক্যালাম টার্নার এবং অ্যারন টেলর-জনসন।
চলতি বছরের শুরুতে 'ভ্যারাইটি' প্রকাশ করে, মঞ্চ অভিনেতা টম ফ্রান্সিস এই চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছেন। আর আগস্টের শেষের দিকে 'পেজ সিক্স' দাবি করে যে চলতি মাসে আরও কিছু অডিশন হবে, এবং 'গ্ল্যাডিয়েটর ২' তারকা পল মেসাল ও 'হার্টস্টপার' এবং 'এসএএস: রোউগ হিরোজ' তারকা জ্যাক বার্টনও অডিশনের তালিকায় রয়েছেন।
পরবর্তী চলচ্চিত্রের প্রযোজকদের ঘোষণার সময় বলা হয়েছিল, বন্ডের মূল চেতনাকে টিকিয়ে রেখে তাকে তার পরবর্তী অভিযানে চালিত করা হবে—যা মূলত নিশ্চিত করে যে বন্ড চরিত্রে একজন পুরুষই থাকছেন। তবে যে নামগুলো শোনা যাচ্ছে, সেগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য নাকি নেহাতই অনুমান তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।
অডিশন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে কি না
গত মে মাসে আমাজন এমজিএম স্টুডিওস নিশ্চিত করেছে, অভিনেতা বাছাই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে এর বাইরে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বিবৃতিতে কেবল বলা হয়, 'কাস্টিং প্রক্রিয়া চলাকালীন আমরা নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার পরিকল্পনা করছি না; তবে সঠিক সময় আসামাত্রই আমরা ০০৭ ভক্তদের সাথে নতুন খবর শেয়ার করতে রোমাঞ্চিত বোধ করব।'
এখন মনে হচ্ছে যে সেই উপযুক্ত সময়টি খুব দ্রুতই ঘনিয়ে আসছে। 'ডেডলাইন'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরবর্তী চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রযোজক অ্যামি প্যাসকেলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বছরের শেষ নাগাদ বন্ড চরিত্রে কে অভিনয় করছেন সে সম্পর্কে আমরা কোনো খবর পাব কি না। তিনি উত্তরে বলেন, 'আমি বলব বছরের শেষ নাগাদ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল।' গত মাসে বিনোদন বিষয়ক লেখক ড্যানিয়েল রিচম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, 'আমি যতটুকু শুনছি, তারা জেমস বন্ডের কাস্টিংয়ের শেষ ধাপে রয়েছে এবং হয়তো ইতিমধ্যেই তাদের পছন্দসই অভিনেতাকে পেয়েও গেছে।'
অডিশন প্রক্রিয়া
অডিশন প্রক্রিয়াটি সম্ভবত আগের কাস্টিংগুলোর মতো একইভাবে পরিচালিত হয়েছে। বন্ড হতে আগ্রহী অভিনেতাদের ঐতিহ্যগতভাবেই যে দৃশ্যটিতে অভিনয় করে দেখাতে হয়, সেটি নেওয়া হয়েছে 'ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ' সিনেমা থেকে। দৃশ্যটিতে দেখা যায়, ০০৭ তার বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন তাতিয়ানা রোমানোভা তার বিছানায় শুয়ে আছেন। এটি এমন একটি দৃশ্য যেখানে অভিনেতাকে তার শারীরিক উপস্থিতি, গতিবিধি এবং আকর্ষণী ক্ষমতার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। এতে কোনো বিস্ফোরণ, মারামারি বা গ্যাজেটের ব্যবহার থাকে না।
'গোল্ডেনআই' এবং 'ক্যাসিনো রয়্যাল'-এর পরিচালক মার্টিন ক্যাম্পবেল বিনোদন বিষয়ক ওয়েবসাইট 'গোল্ড ডার্বি'-কে বলেন' 'মূল কথা হলো 'অনায়াস'। আপনি কখনোই বন্ডকে হাঁসফাঁস করতে দেখবেন না। সে অত্যন্ত মিতভাষী, দক্ষ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়। এই দৃশ্যটি মূলত একজন বন্ডের মূল দিকগুলোকে ফুটিয়ে তোলে।'
কোনো সম্ভাব্য অভিনেতা পর্দায় কেমন দেখাবেন তা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করতে কোনো রকম খরচে কৃপণতা করা হয় না। ০০৭ টিম নিজেরাও অতীতে বলেছে, 'বন্ডের স্ক্রিন টেস্টগুলো অত্যন্ত বিস্তারিত ও জাঁকজমকপূর্ণ ব্যাপার—যেখানে চুল ও মেকআপ, পোশাক, সেট নির্মাণ থেকে শুরু করে সহ-অভিনেতাদের উপস্থিতি পর্যন্ত সবকিছুরই সুব্যবস্থা থাকে।'
নতুন বন্ডকে যেভাবে সবার সামনে আনা হবে
সাধারণত, লন্ডনে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন বন্ডের নাম ঘোষণা করা হয়ে থাকে। কিন্তু ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ এখন অ্যামাজন এমজিএম-এর মতো একটি স্টুডিওর হাতে।
অ্যামাজন ২০২১ সালে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে এমজিএম ক্রয় করে, যার মধ্যে জেমস বন্ডের ডিস্ট্রিবিউশন বা পরিবেশনার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা বন্ডের ভবিষ্যৎ সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণের অধিকার পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত আরও অন্তত ২০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে।
এত বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করার পর, এটি একেবারেই অসম্ভব নয় যে অ্যামাজন এমজিএম তাদের নিজেদের স্ট্রিমিং সার্ভিসের দিকে ভক্তদের আকর্ষণ করতে চাইবে, এবং নতুন বন্ডের নাম ঘোষণার খবরটি কেবল তাদের প্রাইম ভিডিও-তেই প্রকাশ করা হবে।
এটি যে তাদের স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে, তা প্রায় নিশ্চিত। আর এ ধরনের ঘোষণা স্বভাবতই বিশ্বের সমস্ত সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে স্থান পাবে। আগামী ৫ অক্টোবর 'গ্লোবাল জেমস বন্ড ডে' যা তাদের প্রথম সিনেমা 'ডক্টর নো' মুক্তির ৬৪তম বার্ষিকী—খুব দ্রুতই ঘনিয়ে আসছে। তাই ভক্তরা হয়তো সম্ভাব্য কোনো ঘোষণার আশায় তাদের ক্যালেন্ডারে এই তারিখটি চিহ্নিত করে রাখতে পারেন।
পরবর্তী চলচ্চিত্র সম্পর্কে যা জানা গেছে
নতুন চলচ্চিত্রটির নাম কী হবে বা এটি ঠিক কবে মুক্তি পাবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। 'পিকি ব্লাইন্ডার্স' খ্যাত স্টিভেন নাইট বর্তমানে এর স্ক্রিপ্ট বা গল্প লিখছেন, এবং 'ডুন' খ্যাত ডেনি ভিলনোভ এটি পরিচালনা করবেন। তারা এবং পুরো টিম হয়তো ইতিমধ্যে কোনো নাম মাথায় রেখে দিয়েছেন। অথবা, আপাতত তারা এটিকে সাধারণ নাম 'বন্ড ২৬' বলেই ডাকতে পারেন।
এই সিরিজের বেশিরভাগ সিনেমার নামই ইয়ান ফ্লেমিংয়ের মূল গল্পগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে। তার লেখা চারটি শিরোনাম এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে—'দ্য হিলডেব্র্যান্ড র্যারিটি', 'রিসিকো', '০০৭ ইন নিউ ইয়র্ক', এবং 'দ্য প্রপার্টি অফ আ লেডি'। যদিও এসব গল্পের বিভিন্ন উপাদান ইতোমধ্যেই আগের একাধিক বন্ড সিনেমায় ব্যবহার করা হয়ে গেছে।
ভক্তরাও সম্ভাব্য শিরোনাম হিসেবে নিজেদের পছন্দমতো নাম প্রস্তাব করতে ব্যস্ত। ২০২২ সালে রাজা তৃতীয় চার্লসের সিংহাসন আরোহণের পর থেকে সেই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে 'অন হিজ ম্যাজেস্টিস সিক্রেট সার্ভিস' এবং 'কিং অ্যান্ড কান্ট্রি'। আর মুক্তির তারিখের কথা বলতে গেলে, বিভিন্ন মাধ্যমে বলা হয়েছে পরবর্তী ছবিটি ২০২৮ সালে মুক্তি পেতে পারে।
এটি হতে যাচ্ছে দুটি বন্ড সিনেমার মধ্যকার ইতিহাসের দীর্ঘতম বিরতি—যা ১৯৮৯ সালের 'লাইসেন্স টু কিল' এবং ১৯৯৫ সালের 'গোল্ডেনআই'-এর মধ্যবর্তী ছয় বছর চার মাসের সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
বন্ড টিমের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কেবলমাত্র বন্ড টিম নিজেই এর আসল উত্তর জানে। তবে অ্যামাজন এমজিএম-এর যথেষ্ট আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত পরিকল্পনা করার এবং নানা বিষয়ে বিশদ চিন্তা করার—যেমন একাধিক সিনেমা জুড়ে বন্ড কীভাবে কাজ করবে। আগামী এক দশক ধরে তার রূপান্তর বা যাত্রাকে তুলে ধরার জন্য কি কোনো সামগ্রিক কাহিনীসূত্র থাকবে। সিনেমাগুলো কি প্রতি দুই বছর, তিন বছর, নাকি প্রতি চার-পাঁচ বছর পর পর আসবে?
তাছাড়া, এত বিশাল বিনিয়োগের পর, বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কীভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে অ্যামাজন এমজিএম নিঃসন্দেহে ডিজনির 'স্টার ওয়ার্স' এবং মার্ভেলের 'মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স'-এর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী হবে। যদিও বন্ডের একাধিক স্পিন-অফ (সহায়ক চরিত্র কেন্দ্রিক নির্মাণ)—যেমন 'ইয়ং বন্ড' কিংবা 'মিস মানিপেনি'র অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে দর্শকের বেশ আগ্রহ থাকতে পারে, তবুও তারা এ বিষয়েও সতর্ক থাকবেন যাতে বাজার অতিরিক্ত পরিপূর্ণ হয়ে না পড়ে এবং বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ প্রধান চলচ্চিত্রগুলোর কোনো ক্ষতি না হয়।
পরবর্তী চলচ্চিত্রটি আগের ছবির শেষ দৃশ্যটিকে যেভাবে মেলাবে
'নো টাইম টু ডাই' চলচ্চিত্রের শেষে ড্যানিয়েল ক্রেইগের বিদায়দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল যে, ভিলেন সাফিনের (রামি মালেক) দ্বীপে একাধিক বিমান হামলা চালানো হয় এবং এই সুপার স্পাই অবশেষে মৃত্যুর মুখে পতিত হন।
গুঞ্জন ছড়িয়েছে, পরবর্তী সিনেমাটি এমআই৬-এ বন্ডের ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর গল্পকে ফুটিয়ে তুলতে পারে—যা মূলত একটি 'রিবুট' (নতুন করে শুরু)। এর ফলে গল্পে 'নো টাইম টু ডাই'-এর শেষ পরিণতির কোনো ছাপ না থাকলেও ভক্তদের মাঝে হতাশা বা কোনো চাপ থাকবে না।
আর যেকোনো পরিস্থিতিতেই বন্ড ভক্তরা আশ্বস্ত হন প্রায় প্রতিটি বন্ড সিনেমার শেষে ফুটে ওঠা সেই চিরচেনা বার্তাটি দেখে—"জেমস বন্ড আবার ফিরে আসবে"। হয়তো খুব শীঘ্রই আমরা জানতে পারব সেই নতুন জেমস বন্ড আসলে কে হতে যাচ্ছেন।
