পুরো একটি শহরকে কি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব?
তিন বছর আগের এক গ্রীষ্মের দুপুরে মাদ্রিদের তাপমাত্রা যখন ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০৭.৬° ফারেনহাইট) পৌঁছায়, তখন জেসাস আরেসো সালিনাস তার বাড়ির পেছনে একটি পাইন গাছে দুই মিটার চওড়া একটি কাপড়ের পাইপ ঝোলান। তিনতলা ভবনের সমান উঁচু ওই পাইপটি ছিল একটি অভিনব পরীক্ষার অংশ।
পাইপটির ওপরের অংশে পানি ছিটানোর পাইপ চালু করার সাথে সাথে এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাস তাকে ঘিরে ফেলে। সালিনাস জানান, 'এই প্রক্রিয়ায় বাতাস ২০ ডিগ্রি বা তার বেশি ঠান্ডা হতে পারে। ফলে ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা মুহূর্তেই ১৯ ডিগ্রিতে নেমে আসে।'
৬৪ বছর বয়সী সাবেক পেটেন্ট পরীক্ষক সালিনাস এর নাম দিয়েছেন 'তোররে কাতাবাতিকা' বা কাতাবাতিক টাওয়ার। অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহার করে তৈরি এই টাওয়ারের শীর্ষে থাকা নজল থেকে সূক্ষ্ম জলকণা ছিটানো হয়। শুষ্ক বাতাসে এই জলকণাগুলো দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে আশপাশের তাপ শোষণ করে নেয়। ফলে ঠান্ডা ও ভারী বাতাস পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসে এবং একটি শীতল পরিবেশ তৈরি করে। সালিনাসের মতে, এই পদ্ধতিটি কেবল বাড়ির আঙিনায় নয়, বরং বড় আকারে তৈরি করে শহরের রাস্তা, পার্ক বা স্কয়ার শীতল রাখতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সালিনাসের হিসাব অনুযায়ী, এই টাওয়ার বড় আকারে তৈরি করলে এর শীতল করার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। একটি আট মিটার চওড়া এবং ১০ তলা ভবনের সমান উঁচু টাওয়ার কয়েক ব্লক এলাকা শীতল করতে পারে, যদিও এতে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ লিটার পানির প্রয়োজন হবে। বর্তমানে তিনি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের কৃষি খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা চালাচ্ছেন। মাদ্রিদ শহরের একটি প্রতিযোগিতায় তিনি ১৫ মিটার উঁচু একটি টাওয়ারের পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন, যা একটি শহরের চত্বরের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
এসি বনাম পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
২০২৬ সালে ইউরোপ জুড়ে দাবদাহে অন্তত ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যেখানে এয়ার কন্ডিশন বা এসির ব্যবহার কম, সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা দিচ্ছে। এসি ঘর ঠান্ডা রাখলেও বাইরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা 'হিট আইল্যান্ড' প্রভাবকে আরও প্রকট করে।
এই সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা বিকল্প খুঁজছেন। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মারভিন জানান, চীনের সাংহাইয়ের মতো শহরগুলোতে পার্ক, বাস স্টপ এবং নির্মাণাধীন এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব পদ্ধতি মূলত বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় কাজ করে, যা শত শত বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের বাড়িগুলোতে ঝরনা বা পারস্যের 'বাতাস টাওয়ার'-এর মাধ্যমে প্রচলিত ছিল।
তবে এই প্রযুক্তির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পানির প্রাপ্যতা। অনেক শহরে দাবদাহের সময় খরা দেখা দেয়। এছাড়া আর্দ্র ক্রান্তীয় শহরগুলোতে এই পদ্ধতি খুব একটা কার্যকর হয় না।
সমুদ্রের লোনা পানি ও উইন্ড টারবাইন
পানির অভাব মেটাতে লোনা পানি ব্যবহারের পরীক্ষা চালাচ্ছেন গবেষকরা। নেদারল্যান্ডসের টিইউ ডেলফ্ট-এর ক্লাইমেট ইনস্টিটিউটের পরিচালক হারমান রুশেনবার্গ সমুদ্রতীরবর্তী উইন্ড টারবাইনগুলোর মাধ্যমে লোনা পানি আকাশে ছিটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে এই শীতল বাতাস শহরে পৌঁছাবে। তবে বাতাসের অনিশ্চিত গতিপথ এই পদ্ধতির একটি বড় বাধা।
জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে সরাসরি বায়ুমণ্ডল পরিবর্তনের পদ্ধতি বা জিওইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের 'মেক সানসেটস' নামক একটি স্টার্টআপ বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে সালফার ডাই অক্সাইড মিশ্রিত বেলুন উড়িয়ে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছে। তবে এটি অত্যন্ত বিতর্কিত। ২০২৩ সালে মেক্সিকো এই ধরনের পরীক্ষা নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চকের গুঁড়ো বাতাসে ছিটিয়ে রোদ কমানোর গবেষণাও চলছে। আগামী অক্টোবরে নেভাদায় এমন একটি পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উজ্জ্বল মেঘ ও উপকূলীয় সুরক্ষা
শহর শীতল রাখার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হলো 'মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং'। এতে সমুদ্রের পানি সূক্ষ্ম কণা হিসেবে বাতাসে ছিটানো হয়। এই কণাগুলো মেঘকে আরও ঘন এবং উজ্জ্বল করে তোলে, যা অধিক সূর্যরশ্মি মহাকাশে প্রতিফলিত করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে প্রবাল রক্ষায় এই প্রযুক্তির পরীক্ষা চলছে। বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন এটি উপকূলীয় শহরগুলোতে ব্যবহার করা যায় কি না।
লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরে যেখানে মেঘের স্তর নিচু থাকে, সেখানে এটি কার্যকর হতে পারে। তবে সিঙ্গাপুর বা মিয়ামির মতো আর্দ্র ও অস্থিতিশীল আবহাওয়া সম্পন্ন শহরে এটি কাজ করবে না। লোনা পানি ব্যবহারের কারণে শহরগুলোতে মরিচা পড়ার ভয় থাকলেও গবেষকরা মনে করছেন, ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে ভবিষ্যতে এই ইভাপোরেটিভ কুলিং প্রযুক্তিই হতে পারে প্রধান অবলম্বন।
