১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা: শিশুদের জন্য সুরক্ষাসহ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে যেসব পরিবর্তন আনছে মেটা
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা করেছে মেটা। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিতে ভূমিকা রেখেছে—এমন অভিযোগের পর এই সমঝোতা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কিশোর ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্ল্যাটফর্ম দুটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সমঝোতার আওতায় ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে প্রতিদিন দুই ঘণ্টার সীমা থাকবে। রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত 'নাইট মোডে' অ্যাপ দুটি ব্যবহার করা যাবে না। স্কুলের সময় নোটিফিকেশনও সীমিত করা হবে। এসব সেটিংস পরিবর্তনের ক্ষমতা শুধু অভিভাবকদের থাকবে।
এ ছাড়া কিশোরদের পোস্টে 'লাইক' সংখ্যা এবং 'এক্সট্রিম মেকআপ' ধরনের বিউটি ফিল্টার ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে। ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার সুবিধা বন্ধ করার সুযোগও পাবে তারা। অ্যালগরিদমের সুপারিশের পরিবর্তে অন্য ধরনের ফিড ব্যবহারের সুযোগও থাকবে। এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে মেটাকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা। মেটাকে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যাতে কিশোর ব্যবহারকারীদের বয়স নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায় এবং ১৩ বছরের কম বয়সীরা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে না পারে।
এবার থেকে মেটা নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজেই শুধু যাচাই করতে পারবে না। সমঝোতা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা তদারকিতে থাকবে স্বাধীন নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা একে 'রূপান্তরমূলক' বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, 'এটি রূপান্তরমূলক। এখন এখানে একটি বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী প্রয়োগব্যবস্থা এবং সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।'
তবে সমঝোতার অংশ হিসেবে কোনো অন্যায় স্বীকার করেনি মেটা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি বলেন, 'আমরা যে কাঠামো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছি, তা অভিভাবকদের জন্য তাঁদের সন্তানদের আমাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়টি সহজে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করবে।'
তিনি আরও বলেন, এসব পরিবর্তন 'পুরো শিল্পের জন্য সঠিক পথ তৈরি করবে'।
তবে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অনেকের মতে, পরিবর্তনগুলো যথেষ্ট নয়। তাদের অভিযোগ, কিশোরদের জন্য অ্যালগরিদমভিত্তিক ব্যক্তিগতকৃত ফিড এখনো ডিফল্ট হিসেবে থাকবে। ফলে মেটার ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার মূল ব্যবসায়িক মডেলে বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না।
১০ বছরে পরিশোধ করবে ১৮ বিলিয়ন ডলার
সমঝোতা অনুযায়ী, মেটা ১০ বছরে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে। এর মধ্যে ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার নিশ্চিতভাবে দেওয়ার কথা। বাকি অর্থের একটি অংশ টিকটক ও ইউটিউব একই ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক অবদান রাখার ওপর নির্ভর করছে।
এই অর্থ শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, অনলাইন নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যয় করার কথা। মেটা টিকটক ও ইউটিউবকেও একই ধরনের পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রয়োজন হলে অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে ১৮ বিলিয়ন ডলারের এই সমঝোতা মেটার জন্য খুব বড় আর্থিক ধাক্কা নাও হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আরও বড় জরিমানা বা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ঝুঁকি এড়াতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। সমঝোতার পর মেটার শেয়ারের দামও কিছুটা বেড়েছে।
তবে মেটার বিরুদ্ধে ব্যক্তি, স্কুল জেলা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের করা শত শত মামলা এখনো রয়েছে। এসব মামলায় বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে প্রতিষ্ঠানটিকে। ফলে এই সমঝোতায় একটি বড় মামলা শেষ হলেও শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মেটার আইনি সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
