মক্কা চুক্তির সুবাদে আরও বিকশিত হবে তুরস্কের সামরিক শিল্প, গড়ে উঠবে 'ত্রিপক্ষীয় ইকোসিস্টেম'
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর ফলে রিয়াদের কাছে আঙ্কারার অস্ত্র বিক্রি বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আরও বিশদভাবে, এই চুক্তিটি তিন দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে এক সুদৃঢ় 'ইকোসিস্টেম' বা সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসবে—এমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আলী বাকির বলেন, "মক্কা চুক্তিকে কেবল কোনো অস্ত্র রপ্তানি চুক্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর পরিধি আরও অনেক ব্যাপক। প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ, বড় ধরনের প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং একে অপরের সক্ষমতার সমন্বয় সাধনই এর লক্ষ্য। সময়ের ব্যবধানে এই চুক্তি তিন দেশের সম্পর্ককে কেবল 'ক্রেতা-বিক্রেতা'র সমীকরণ থেকে এক প্রকৃত প্রতিরক্ষা-শিল্প অংশীদারত্বে রূপান্তর করতে পারে।"
গত ৭ আগস্ট 'মক্কা চুক্তি' নামে পরিচিত এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো "যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।" চুক্তির শর্তানুযায়ী, "তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে অন্য দুটি দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।" এছাড়া এটি তিন দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার সব ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে।
পশ্চিমা সামরিক জোট– ন্যাটোর 'অনুচ্ছেদ ৫'-এর আদলে গঠিত এই চুক্তির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারার বাস্তব প্রয়োগ হয়তো খুব শীঘ্রই পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে—কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশেষ করে রিয়াদ ও আঙ্কারার জন্য।
ট্রেন্ডস রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভাইজরির তুরস্ক কর্মসূচির পরিচালক সেরহাত সুহা চুবুকসুয়োগলু বলেন, "সৌদি আরব কেবল প্রস্তুতকৃত সামরিক সরঞ্জাম বা প্ল্যাটফর্ম আমদানি করতে চায় না। বরং তারা তাদের 'ভিশন ২০৩০'-এর আওতায় দেশীয় উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল সক্ষমতা তৈরি করতে আগ্রহী। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তুরস্ক অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ অনেক ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা সরবরাহকারীর (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) তুলনায় কম রাজনৈতিক বিধিনিষেধ এবং আরও নমনীয় স্থানীয়করণ সুবিধার মাধ্যমে রিয়াদকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও কার্যকর সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে তুরস্কের।"
চুবুকসুয়োগলু উল্লেখ করেন, তুরস্কে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য দেশটির পার্লামেন্টের অনুসমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে পার্লামেন্টে এই চুক্তি আটকে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) গবেষণা বিশ্লেষক অ্যালবার্ট ভিডাল বলেন, "তুরস্কের জন্য এই চুক্তিটি এমন এক সুযোগ তৈরি করবে, যা তুর্কি কোম্পানিগুলোর জন্য সৌদির প্রতিরক্ষা বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করবে। তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক বছর ধরে এই চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, কিন্তু, কেবল 'আকিঞ্জি' ড্রোন চুক্তি ছাড়া আর বড় কোনো সাফল্য পায়নি।" উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে তুর্কি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার সৌদি আরবের নৌ ও বিমান বাহিনীর কাছে তাদের 'আকিঞ্জি' চালকবিহীন যুদ্ধবিমান বা ইউসিএভি রপ্তানির জন্য দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
ভিডাল আরও জানান, অন্যদিকে পাকিস্তান তাদের "অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা" নিয়ে এগিয়ে আসছে—যা এই সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় প্রকল্পগুলোর পরিধি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী এক উপাদান হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্লেষক আলী বাকির জোর দিয়ে বলেন, "তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান যদি তাদের নিজ নিজ আর্থিক সম্পদ, শিল্প সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সামরিক অভিজ্ঞতা ও মানবসম্পদের সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে পারে—তবে তারা আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক একটি প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে। এটি কেবল তাদের মধ্যকার প্রতিরক্ষা বাণিজ্যই বাড়াবে না, বরং তাদের যৌথ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকেও বহুগুণ শক্তিশালী করবে।"
তুর্কি সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা ও 'কান' যুদ্ধবিমান প্রকল্প
এই চুক্তির আওতায় ঠিক কোন সামরিক সরঞ্জামগুলো কেনাবেচা বা হস্তান্তরিত হতে পারে—এমন প্রশ্নে বিশ্লেষকেরা বিশেষভাবে তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের নির্মাণাধীন 'কান' (KAAN) স্টিলথ ফাইটার জেটের কথা বলেছেন।
গালফ ডিফেন্স-এর বিশ্লেষক লিওনার্দো জাকোপো মারিয়া মাজুকো বলেন, "বছরের পর বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার পর রিয়াদ এখন তার অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তুর্কি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষ করে মধ্যম ও স্বল্প মাত্রার স্তরে। মাঝারি পাল্লার জন্য 'হিসার-ও' এবং স্বল্প পাল্লা ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থার জন্য 'করকুট' ও 'গুরজ' -এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো রিয়াদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে।"
গত ফেব্রুয়ারিতে টার্কিশ অ্যারোস্পেসের সিইও মেহমেত দেমিরোগলু ব্রেকিং ডিফেন্সকে জানিয়েছিলেন যে সৌদি আরবের কাছে 'কান' যুদ্ধবিমান রপ্তানির চুক্তিটি তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। যদিও এরপর আর কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির তথ্য জানানো হয়নি। তবে আলী বাকির ব্রেকিং ডিফেন্সকে বলেছেন, মক্কা চুক্তি 'কান' যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তিকে বাস্তবায়নের অনেক কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।
সম্ভাব্য রপ্তানি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে টার্কিশ অ্যারোস্পেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি "উন্নত প্রযুক্তি ও নিজস্ব উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে তুরস্কের পাশাপাশি তাদের বন্ধুভাবাপন্ন ও মিত্র দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতে সর্বদা সমাধান প্রদান অব্যাহত রাখবে।"
তুরস্কের সামরিক যান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এফএনএসএস-এর আন্তর্জাতিক ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক গোকহান তেকিন বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান আশা করছে এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি ব্রেকিং ডিফেন্সকে বলেন, "(চুক্তিভুক্ত) দেশগুলোর সরকার ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে এবং যৌথ কার্যনির্বাহী দল গঠিত হবে। সামরিক যানবাহনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও পদ্ধতির স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনও এজেন্ডায় আসবে। ফলে একই মানদণ্ডে একে অপরের সাথে মানানসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আধুনিক পণ্য এবং ডিজাইন সরবরাহের সক্ষমতা তুর্কি কোম্পানিগুলোর রয়েছে, যার মধ্যে এফএনএসএস অন্যতম। আমরা আশা করছি, এর ফলে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের পথ উন্মুক্ত হবে।"
