বাস্তবতা থেকে 'পালিয়ে বাঁচতে' নেশাজাতীয় ড্রাগের দিকে ঝুঁকছে চীনের কিশোর-কিশোরীরা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন চ্যাট রুমে চীনা কিশোর-কিশোরীদের মাঝে এক বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কিছু কিশোর-কিশোরীর মুখে ঠিক এমনই সব গল্প শুনেছে বিবিসি। তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা হলেও অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু এক—মানসিক চাপ থেকে মুক্তির ব্যাকুল চেষ্টা।
এই কঠিন বাস্তবতা থেকে ক্ষণিকের জন্য পালিয়ে বাঁচতেই তারা শেষ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছে "ফার্মাসিউটিক্যাল হাই"—অর্থাৎ প্রেসক্রিপশন ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত সেবনে সৃষ্টি হওয়া কৃত্রিম নেশার জগত।
চীনের একটি উপকূলীয় প্রদেশের মেধাবী শিক্ষার্থী শিয়াওমেই ১৪ বছর বয়সে অতিরিক্ত মাত্রায় কাশির ওষুধ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার চেয়ে বয়সে বড় একটি ছেলেকে ইমপ্রেস করতে চেয়েছিল সে, যে তাকে বলেছিল এই ওষুধ তাকে শান্ত হতে সাহায্য করবে।
এই ট্যাবলেটগুলো সাধারণত ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যেত না, কিন্তু সে অনলাইনে সেগুলো কিনতে সক্ষম হয়। প্রথমে সে লক্ষ্য করল ওষুধগুলো তাকে কিছুটা ঝিমুনির ভাব দিচ্ছে। তবে শীঘ্রই সে এই হালকা অসাড় অনুভূতির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যা তার কাছে আসন্ন পরীক্ষার চাপ থেকে এক মুহূর্তের স্বস্তি বলে মনে হয়েছে।
অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে এই ওষুধের কারণে হ্যালুসিনেশন (বিভ্রম) এবং শারীরিক ভারসাম্যের ব্যাঘাতসহ মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। পরবর্তীতে সে চ্যাট গ্রুপে সুপারিশ করা অন্যান্য ওষুধও সেবন করে দেখে। সেগুলোর কয়েকটি ছিল ব্যথা বা মৃগী রোগের জন্য। মাঝে মাঝে সে পাঁচটি ট্যাবলেট খেত। আবার কখনো বিভিন্ন ওষুধের অনুভূতির স্বাদ পেতে ১০টিরও বেশি ট্যাবলেট খেয়ে দেখেছে।
দুই বছর ধরে সে বিভিন্ন ধরনের প্রেসক্রিপশন ড্রাগ সেবন করত। এগুলোর একটিও তার বা তার পরিবারের কারো জন্য নির্দেশিত ছিল না। সে সবই ইন্টারনেট থেকে কিনেছিল। শিয়াওমেই জানায়, 'যখন পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতাম, পরীক্ষায় ভালো ফল হয় না, কিংবা বাবা-মার সাথে ঝগড়া হতো—তখনই আমি এই ড্রাগগুলো খেয়ে নিতাম। আমি বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছিলাম।'
স্নায়ুবিক ব্যথার ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনের পর এক মেয়ে একটি ভয়েস নোট শেয়ার করে। জড়িয়ে আসা কণ্ঠে তার বলা কথাগুলো ছিল এমন, 'আমার মনে হচ্ছে শরীরটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। আমার খুব মাথা ঝিমঝিম করছে।'
'শুধু ঘুমিয়ে পড়ো, কাল সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে', জবাবে এমন পরামর্শই আসে।
এক ছেলে তার বাবার পুরনো প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে একই ওষুধের নতুন জাল প্রেসক্রিপশন তৈরি করার প্রস্তাব দেয়।
একজন ব্যবহারকারী পরামর্শ দেয়, 'তুমি যদি হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমের অনুভূতি পেতে চাও, তবে কেবল... কিনতে পারো, এটি এখনো নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত নয়।' সে মূলত পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত রোগীদের কাঁপুনি নিয়ন্ত্রণের একটি ওষুধের কথা বলছিল। অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে এটি মানসিক বিভ্রান্তি, এমনকি প্রলাপ বা তীব্র মানসিক অসংলগ্নতা তৈরি করতে পারে।
অন্য একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন করেন, "অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি খুঁজে পেতে আমার কোন কি-ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করা উচিত?"
এ সমস্যার প্রকৃত মাত্রা পরিমাপ করা কঠিন, কারণ এ বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান বা তথ্যাদি খুবই কম।
তবে বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে, দুই বছর আগে সরকার শিয়াওমেইয়ের সেবন করা কাশির ওষুধের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কঠোর অভিযান পরিচালনা করে। ওষুধটিকে "মনোসাইকোটিক বা মানসিক প্রভাব বিস্তারকারী ড্রাগ" হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়, যা কেবল চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থাকলেই রোগীরা কিনতে পারবে।
এর ফলে তরুণদের জন্য অনলাইনে এটি কেনা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর গত বছরের এপ্রিল মাসে, কর্তৃপক্ষ লক্ষ্য করে যে তরুণরা অন্য আরেকটি ওষুধের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ফার্মেসিগুলোতে ওষুধটির প্রেসক্রিপশন দেওয়া এবং বিক্রির বিষয়ে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
তা সত্ত্বেও, বিবিসির এক সাংবাদিককে একটি অনলাইন চ্যাট রুমে প্রতি গ্রাম ওষুধ মাত্র ১০ চীনা ইউয়ান (প্রায় ১.৫ ডলার) মূল্যে অফার করা হয়েছিল। বিচার মন্ত্রণালয়ের ক্রাইম প্রিভেশন ইনস্টিটিউটের জন্য রচিত ২০২৫ সালের একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়, 'অনিয়ন্ত্রিত বস্তু বা ওষুধগুলো সহজেই পাওয়া যায় এবং কর্তৃপক্ষ যখন কোনো একটি ড্রাগ নিয়ন্ত্রণে আনে, তরুণরা দ্রুতই অন্য বিকল্প খুঁজে নেয়।'
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তরুণরা ধরা পড়া এড়াতে ইন্টারনেটে ওষুধের ভিন্ন ভিন্ন নাম বা ছদ্মনাম ব্যবহার করছে, যা ২০২৫ সালের ঐ গবেষণাতেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীরা যে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে প্রেসক্রিপশন ওষুধের দিকে ঝুঁকছে—তার প্রমাণ ক্রমশ বাড়ছে।
কাজেই চীনে সস্তায় এসব প্রেসক্রিপশন ওষুধ সহজে পাওয়া খুব একটা আশ্চর্যজনক বিষয় নয়, কারণ বিশ্বের সিংহভাগ ওষুধের কাঁচামাল বা উপাদান চীনই উৎপাদন করে। শিয়াওমেই জানায়, সে যখন কাশির ওষুধটি কিনতে চেয়েছিল, তখন মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই পুরো এক বক্স ওষুধ তার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
শপিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে কেবল জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরটি বসিয়ে দিলেই সরাসরি কিনে ফেলা যেত। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) বয়স উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তাকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ওষুধটি বিক্রি করা হয়েছিল। দামও ছিল অত্যন্ত সস্তা—অনেক সময় ৫০টি ট্যাবলেটের দাম ছিল এক ডলারেরও কম। কাগজে-কলমে চীন অবৈধ ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে।
২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সী নতুন চিহ্নিত ড্রাগ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪১ শতাংশ কমে এসেছে। তবে কর্তৃপক্ষকে এটি স্বীকার করতে হয়েছে, প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার একটি ব্যাপক সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের 'ন্যাশনাল নারকোটিকস কন্ট্রোল কমিশন'-এর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, নাবালকদের মধ্যে এটি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
শিয়াওমেই জানায়, তার রসায়নের অ্যাডভান্সড ক্লাসের অনেক শিক্ষার্থীই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে নিজেদের "পুরোপুরি ব্যর্থ" মনে হওয়া এড়াতে কীভাবে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের ওভারডোজ নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করত।
তার মতে, 'পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া এবং ভালো ক্লাসে স্থান ধরে রাখাটা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের স্কুলে এই সেরা ক্লাসগুলোতে 'বিদায়' ব্যবস্থা চালু ছিল। অর্থাৎ অ্যাকাডেমিক ফলাফল একটু খারাপ হলেই ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হতো। পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে নিজেদের জীবনটাই ব্যর্থ মনে হতো, মনে হতো জীবনে আর কোনো সুযোগই অবশিষ্ট নেই।'
চীন সম্পর্কিত বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এবং 'ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপোলজি'-র পরিচালক চিয়াং বিয়াও-এর মতে, এই চাপের একটি বড় অংশ আসে অভিভাবকদের কাছ থেকে, যারা তাদের সন্তানকে ভবিষ্যৎ জীবনের একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখেন।
বিয়াও আরও বলেন, কয়েক দশক ধরে চলা এক-সন্তান নীতি (যা ২০১৬ সালে বাতিল হয়) এর কারণে অনেক পরিবারেরই মাত্র একটি সন্তান রয়েছে, যার ওপর পরিবারের সমস্ত প্রত্যাশার বোঝা চেপে বসে।
তিনি আরও বলেন, 'চীনের তরুণদের মূল পার্থক্য তাদের একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশে। তারা দিনে অন্তত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা স্কুলে কাটায়। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বা বাস্তব জীবন আসলে কেমন তা সরাসরি দেখার খুব কম সুযোগই তারা পায়।'
এছাড়া তিনি প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহারের সাথে আত্মঘাতী মনোভাব ও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির একটি সরাসরি সংযোগ দেখতে পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ বিবিসি দেখতে পায়, অনেক চ্যাট রুমেই তরুণ-তরুণীরা "কোনো অনুভূতি অনুভব করার জন্য" একে অপরকে ব্লেড বা ধারালো কিছু দিয়ে শরীরের কেনো জায়গায় কাটতে উৎসাহিত করত।
একটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হাই স্কুল ভর্তি পরীক্ষা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে, শিয়াওমেই দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে অসাড় রাখার উপায় হিসেবে অন্য আরেকটি ড্রাগ সেবন করে। সে বলে, 'কিন্তু এর ফলে আমার স্মৃতিশক্তি দ্রুত লোপ পেতে শুরু করে। আমি স্পষ্টভাবে কিছুই মনে রাখতে পারতাম না, এবং সবসময় এক ধরনের ঘোর বা ঝিমুনির মধ্যে কাটাতাম।'
এই ড্রাগটি সাধারণত মৃগী রোগের অনিয়ন্ত্রিত খিঁচুনি কমাতে এবং স্নায়ুবিক ব্যথানাশক হিসেবে দেওয়া হয়। শিয়াওমেই তার একটি চ্যাট গ্রুপে এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর কথা জানালে তারা অন্য আরেকটি ওষুধের পরামর্শ দেয়, যা মূলত ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার মতে, এটি তাকে কিছুটা মুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু শীঘ্রই তার আরও বেশি মাত্রায় ডোজের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
গুরুত্বপূর্ণ সেই পরীক্ষার ঠিক কয়েক মাস আগে, সে ৫০টি ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিল এবং তীব্র প্যানিক বা ভয়ে আক্রান্ত হতে শুরু করে। সে জানায়, 'আমার ভয় হচ্ছিল যে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারে, কিন্তু আমি পাকস্থলী ওয়াশ করাতে চাইনি, তাই মা-বাবাকে জানানোর আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম।,
কিন্তু সে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে যে অবশেষে সব সত্যি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তার মা-বাবা মেয়ের এই ঘটনাকে এক ধরনের আকুতি হিসেবেই গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, 'আমাকে এই অবস্থায় দেখে তারা কতটা ভেঙে পড়েছেন, মূলত সেটাই প্রকাশ করেছিলেন। তারা আমাকে কোনো বকাঝকা বা সমালোচনা করেননি। তাদের আচরণ ছিল খুবই সহানুভূতিশীল ও কোমল।'
তার জন্য এই বিষয়টিই সব বদলে দিয়েছে। এই বিষয়ে বিয়াও বলেন, 'অনেক শিশুই প্রচুর মনোযোগ পায়, কিন্তু তারা যে ধরনের মনোযোগ চায় তা হলো—তারা কেমন অনুভব করছে তা জানতে চাওয়া। তারা কি একাকীত্ব অনুভব করছে, নাকি মানসিক চাপে রয়েছে? চীনের অভিভাবকরা প্রায়শই এসব বিষয়কে উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে তোমাকে আরও শক্ত হতে হবে।'
তার মতে, 'পুরো চীনা সমাজ জুড়ে এখন এক তীব্র সতর্কঘণ্টা বাজছে। একজন কিশোর-কিশোরীর প্রতি কীভাবে দায়িত্বশীল হতে হয়, বয়স্কদের তা খতিয়ে দেখতে হবে। পরিবারের মাঝে খোলামেলা আলোচনা থাকাটাই সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিক।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল লড়াইটা ঠিক এখানেই। প্রেসক্রিপশন ওষুধের অনলাইন বিক্রি বন্ধ করতে সরকারের কেবল একের পর এক দমনপীড়নের পেছনে না ছুটে, তরুণদের এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মূল কারণগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।
২০২৩ সালে চীনের 'মেন্টাল হেলথ ব্লু বুক'-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগছেন এবং এদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
চীনা সরকার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তাদের পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি স্কুলে কাউন্সেলিং রুম স্থাপন, প্রতিটি কাউন্টির অন্তত একটি হাসপাতালে মনোরোগ চিকিৎসা সেবা চালু করা এবং অতিরিক্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রস্তুত করা। ২০৩০ সালের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও সংকট মোকাবিলার একটি দেশব্যাপী ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।
এখন পর্যন্ত তারা বেশ সফল বলা চলে। স্টেট কাউন্সিলের মতে, দেশের ৯২% প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯৫ শতাংশ জুনিয়র মিডেল স্কুলে এখন একজন করে কাউন্সেলর রয়েছেন। বেইজিং সহ অনেক বড় বড় শহর মানসিক স্বাস্থ্যকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করেছে।
তবে শিশুদের চিকিৎসায় নিয়োজিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের এখনো চরম ঘাটতি রয়েছে। ব্রিটিশ চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়, পুরো চীনে মাত্র ৫০০ জন যোগ্য শিশুমনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং তাদের বেশিরভাগই বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত।
তিন দশক ধরে নজিরবিহীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশের জন্য এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শিয়াওমেইয়ের মা-বাবা যে চীনে বড় হয়েছেন, শিয়াওমেই যে ভবিষ্যতের মুখোমুখি—তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মা-বাবা কমিউনিস্ট পার্টির বেঁধে দেওয়া পথ অনুসরণ করেছিলেন: কঠোর পরিশ্রম করো, সফলতা আসবেই। কিন্তু বর্তমান সময়ে তরুণরা উচ্চ নম্বর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পেলেও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মিলছে না।
মহামারীর কঠোর বিধিনিষেধের পর চীনের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। ধারণা করা হয়, প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন চাকরি খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে এবং পরিবারগুলো খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
বিয়াও বলেন,'মানুষ সার্বিকভাবে আরও হতাশাবাদী হয়ে পড়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'এই দুশ্চিন্তা বড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। আমার মনে হয় মা-বাবারা দ্বিধা ও উদ্বেগে ভুগছেন, কারণ তারা সন্তানের মধ্যে সমস্যা দেখতে পান কিন্তু কোনো বিকল্প পথ পান না। সন্তান যদি সমস্যায় পড়ে, সেটাই তাদের কাছে পৃথিবীর শেষ মনে হয়। সন্তান স্কুলে ভালো না করলে বা কথা না বললেও তাদের বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যায়। আমার মনে হয় শিশুদের পাশাপাশি আমাদের অভিভাবকদের প্রতিও সমান মনোযোগ দেওয়া উচিত।'
ভাগ্যক্রমে, শিয়াওমেই এবং তার মা-বাবা এই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজে পেয়েছেন। শিয়াওমেই জানায়, 'অতীতে আমার মা-বাবা আমাকে সত্যিই বুঝতেন না এবং বেশ কঠোর কথা বলতেন। আমার মনে হতো আমি কোনো সাহায্য পাচ্ছি না এবং পুরোপুরি একা হয়ে গেছি।'
কিন্তু ওভারডোজের পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে দৃশ্যপট বদলে যায়। তার মা-বাবা তার কথা শোনা ও তার সাথে আলোচনা করা শুরু করেন। সে বলে, 'কেউ একজন আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে—এটা জানতে পেরে আমার খুব ভালো লাগে।' এটি তাকে সেই প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফল করতে সাহায্য করেছিল, যা নিয়ে সে এতদিন ভীষণ আতঙ্কে ছিল। সে আরও জানায়, 'তাদের সমর্থন পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।'
তবে সবাই এমন সমর্থন পায় না, আর ঠিক সেখানেই সাহায্য করতে চান লু জিংচান। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ বছরের পর বছর বিষণ্নতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। প্রেসক্রিপশন ড্রাগ নেওয়ার পর যে কৃত্রিম আনন্দের অনুভূতি আসত, তা কাটিয়ে ওঠা তার জন্য কঠিন ছিল এবং তিনি চার বছরে চারবারেরও বেশি ওভারডোজ করেছিলেন।
তিনি বলেন, 'এই ওষুধগুলো আমাকে উন্মাদনার শেষপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এই ড্রাগস আপনাকে আসক্তির অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাওয়ার এবং আপনার স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।' তিনি এখন সব ধরনের প্রেসক্রিপশন ড্রাগ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় ব্যয় করে অন্যদের এগুলো শুরু না করার জন্য অনুরোধ জানান।
আর যেসব তরুণ-তরুণী একসময় তার মতো মানসিক চাপের সাথে লড়াই করছে, তাদের জন্য তার পরামর্শ, 'আমি আশা করি তোমরা ওষুধ দিয়ে নিজেদের অসাড় না করে জীবনের মুখোমুখি রুখে দাঁড়াবে। তোমরা যদি অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রাগস নিয়ে থাকো, তবে আমি তোমাদের তা থামানোর সাহস দিতে চাই। আমি বিশ্বাস করি তোমাদের জীবনের উন্নতি হবে। আমি বিশ্বাস করি তোমরা সবাই সুখের সন্ধান পাবে।'
