চীন থেকে ২০ জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ, ব্যয় ২.৩০২ বিলিয়ন ডলার
চীন থেকে ২.৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ২০টি 'জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট' কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের মূল দাম ৬২.৭ মিলিয়ন ডলার হলেও প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস, পূর্তকাজ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয় যুক্ত হওয়ায় প্রতিটি বিমানের পেছনে খরচ হবে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবিত এই ক্রয়সংক্রান্ত সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তৈরি একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে— বৈদেশিক ও স্থানীয় প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল এসেনসিয়াল আইটেম, টেকনিক্যাল অ্যান্ড লজিস্টিক সাপোর্ট (টিএসটি), ফ্রেইট, বীমা, ভ্যাট, পূর্তকাজসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয়।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ওই প্রতিবেদনে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরে ২০টি যুদ্ধবিমান সংগ্রহে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জে-১০ যুদ্ধবিমান কিনতে পারে—এ ধরনের আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের সময় চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান ভারতের একটি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার তথ্য এখন প্রতিষ্ঠিত।'
জাহেদ উর রহমান বলেন, 'রাফালকে ৪.৫ প্রজন্মের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে জে-১০সিই খুব ভালো করেছে। তাই বাংলাদেশ বিমানটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।'
তিনি আরও জানিয়েছেন, চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জে-১০সিই একটি একক ইঞ্জিন ও একক আসনের আধুনিক মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট। এটি চীনের বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি ফাইটার বিমানের রপ্তানি সংস্করণ।
প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় বেড়েছে ব্যয়
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে চীন থেকে এসব যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু করে।
ওই সময় প্রতিটি যুদ্ধবিমানের দাম ধরা হয়েছিল ৬০ মিলিয়ন ডলার। পরে এসব বিমান কেনার জন্য ২.২০ বিলিয়ন ডলার বা ২৭ হাজার ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয় নীতিগত অনুমোদন দেয়।
তবে চূড়ান্ত প্রস্তাবে প্রতিটি বিমানের দাম বেড়ে ৬২.৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন চেয়ে গত ৪ আগস্ট সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, এই ২০টি বিমানের মধ্যে ১০টি বিমান 'টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট' (টিওঅ্যান্ডই)-এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, এই ১০টি বিমান সরাসরি বিমানবাহিনীতে যুক্ত হবে। বাকি ১০টি বিমান টিওঅ্যান্ডইয়ের বাইরে থাকবে।
বিমানবাহিনীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈদেশিক ও স্থানীয় প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল এসেনসিয়াল আইটেম, টেকনিক্যাল অ্যান্ড লজিস্টিক সাপোর্ট (টিএসটি) এবং ফ্রেইট বাবদ ব্যয় হবে ৮৮৮ মিলিয়ন ডলার।
বীমা, ভ্যাট ও পূর্তকাজ বাবদ ব্যয় হবে আরও ১৫৮ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ৮০০ লিটার ও ১ হাজার ৭০০ লিটারের এক্সটারনাল ফুয়েল ট্যাংক বাবদ প্রয়োজন হবে ২.২৮ মিলিয়ন ডলার।
সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) আলোচনার মাধ্যমে চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএটিআইসি) থেকে এসব বিমান কেনা হচ্ছে।
সিএটিআইসি চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সামরিক ও বিমান চলাচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এটি মূলত সামরিক ও বেসামরিক বিমান, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি ও রপ্তানি করে থাকে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এসব বিমান কেনার চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
যুদ্ধবিমানগুলোর ব্যয় মেটাতে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে থোক বরাদ্দ দিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।
২০২৫ সালের মার্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় এসব বিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে ওই সফরের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছিল।
পরে একই বছরের এপ্রিলে এসব যুদ্ধবিমান কেনার জন্য আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি চূড়ান্ত করতে বিমানবাহিনীর প্রধানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়।
