হিউম্যানয়েড রোবটকে ছাড়িয়ে চীনে উন্মোচিত হচ্ছে এক নীরব যন্ত্র বিপ্লব
এআই, রোবোটিক্স এগুলো এখন আর কোনো সাধারণ বিষয় নয়—বরং এক বিশাল অগ্রগতি। চেন তিয়ানইউ, ২৮ বছর বয়সী একজন শিক্ষক যিনি হালের সব প্রযুক্তির খবর রাখতে চীনের বিভিন্ন কারখানায় ঘুরে তার অবসর সময় কাটান। এসব কারখানাগুলো দ্রুত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। আর এ থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, এআই এবং রোবটিক্স সম্পর্কিত ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কোন বিষয়টি আগে শেখাতে হবে।
উদ্ভাবনে দেশকে সবকিছুর শীর্ষে রাখতে এবং আমেরিকার সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামার উদ্দেশ্যে শি জিনপিংয়ের ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীনে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
হাংঝৌর উপকণ্ঠে অবস্থিত 'হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউট' এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো চায় প্রযুক্তি-প্রকৌশলীদের এক নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে।
চেন-এর কাছে প্রায় ৩০ জন কলেজ শিক্ষার্থী কোডিং শিখছে। এক সারিতে রাখা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটগুলো প্রোগ্রামিংয়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে, আর ক্লাসরুমের অন্য প্রান্তে একদল শিক্ষার্থী চেষ্টা করছে চিকিৎসায় ব্যবহৃত রোবটিক সরঞ্জাম তৈরি করতে।
চেন বলেন, 'আপনি যদি এআই এবং রোবটিক্সের এই নতুন বিশ্বের জন্য প্রয়োজনীয় না হন, তবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াদের তালিকায় পড়তে হবে।'
পুরো দেশজুড়ে চীনের কারখানাগুলোতে ২০ লক্ষেরও বেশি রোবট কাজ করছে যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। এ সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
চীনের এমন পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো একটি বড় উদ্যোগ। আগেও এভাবে চীনের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। চীন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোবট পাঠানো শুরু করেছে। বর্তমান বিশ্বের অর্ধেকের বেশি শিল্প-রোবট চীনেই তৈরি হয়।
তবে বিশ্ব উৎপাদন, বাণিজ্য ও নতুন প্রযুক্তির কেন্দ্রে থাকা একটি দেশে এমন যন্ত্রের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যেমন—চীনের সাধারণ মানুষের চাকরির ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী পড়বে? আর যেখানে সরকার সব তথ্য কড়া নজরদারিতে রাখে, সেখানে এই পরিবর্তনের ফলে সত্যি কতটা ক্ষতি বা লাভ হচ্ছে তা মাপা যাবে কীভাবে?
পুরো বিশ্ব আজ চীনের যে প্রযুক্তির ঝলক দেখছে, তাতে সে দেশের সাধারণ শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কিছুটা অনিশ্চিত। চারপাশের চকচকে সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে নিঃশব্দ ব্যস্ত রাস্তা, কিংবা দ্রুত চলা যন্ত্রগুলোই এর বড় প্রমাণ। সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত 'ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড গেমসে' রোবটদের বক্সিং ও দৌড় প্রতিযোগিতাও দেখা গেছে।
চীনের কিছু কারখানায় মানুষ আকৃতির রোবট নেই, এগুলো নাচ গানও করে না। তবে এরা অনবরত গাড়ি তৈরি, রং করা, ভারী জিনিস তোলা ও জোড়া লাগানোর কাজ করে যাচ্ছে। কিছু রোবটকে তৈরিই করা হয়েছে নতুন রোবট বানানোর জন্য। চীনে এমন কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও রয়েছে, যেখানে রোবটদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করার জন্য মানুষদের তৈরি করা হচ্ছে।
চীন সরকার যেটিকে দেশের "নতুন উৎপাদন ক্ষমতা" বলছে এবং এই ব্যবস্থা যেভাবে পুরো চীনের রূপ বদলে দিতে পারে—এটি যেন তারই এক জীবন্ত ছবি।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর চেংডুর একটি কারখানার একই ছাদের নিচে পুরোনো ও নতুন প্রযুক্তির কাজ চলছে। একপাশে প্রায় ৩০ জন মধ্যবয়সী কর্মী— যান্ত্রিক হাত (রোবোটিক আর্ম) তৈরি করছেন। অন্যপাশে চারজন তরুণ প্রকৌশলী একটি কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে নতুন এক রোবটের কোড লেখার চেষ্টা করছেন। তাদের আশা, এই নতুন রোবটটি অন্যান্য রোবট তৈরিতে সাহায্য করবে।
গবেষণা দলের ৩১ বছর বয়সী প্রকৌশলী পাং কাই নতুন তৈরি করা রোবটের কঙ্কালটি ঠেলে একটু দূরে নেন। এই রোবটটি এখনো কাজের জন্য পুরোপুরি তৈরি নয়। আপাতত এটি কেবল কিউআর কোড স্ক্যান করার মতো সহজ কিছু কাজ করতে পারে। কাই মৃদু হেসে বলেন, 'হয়তো আরও ছয় মাস পর এটি অন্য আরেকটি কাজ শিখবে।'
৩০০ কর্মী নিয়ে চলা সিআরপি টেকনোলজি দীর্ঘ ৯ বছর ধরে রোবটের যান্ত্রিক হাত বানিয়ে আসছে। কোনো কারখানার চাহিদা অনুযায়ী গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স বা উইন্ড টারবাইন তৈরির জন্য এই হাতগুলোকে সাজানো যায়। কোম্পানির দাবি, একটি যান্ত্রিক হাত দিয়েই কারখানার ৯০ শতাংশের বেশি একঘেয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।
প্রকৌশলীরা ভাবছেন, ভবিষ্যতে কি এই রোবট দিয়ে মানুষের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব? কাই বলেন, 'আমরা চাই এই রোবটগুলো মানুষের মতো কাজ করুক এবং নিজেরা চিন্তা করতে পারুক। ১০ বছর পর হয়তো চীনে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত মানুষ থাকবে না, তাই আমাদের এখন থেকেই এমন রোবট দরকার।'
চীনের জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং কর্মক্ষম মানুষের বয়স বেড়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ। ফলে বেইজিং তাদের কারখানাগুলোতে দ্রুত আধুনিক বিপ্লব আনতে চাইছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের মোট জনসংখ্যার তিনভাগের একভাগের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছর পার হয়ে যাবে। কিছু ধারণা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে দেশটিতে প্রায় ৬ কোটি মানুষ কমবে—যা প্রায় পুরো ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার সমান!
আশা করা হচ্ছে, শ্রমিকের এই অভাব কাটাতে এবং মন্দায় থাকা অর্থনীতিকে বাঁচাতে রোবট ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি সাহায্য করবে। তবে এই পরিবর্তনের গতি সঠিক রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ। এখনো প্রায় ১২ কোটি মানুষ চীনের বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন। চীনের সরকার যদি খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে, তবে কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে চরম বিপদে পড়বেন, কারণ তাদের সংসার চলে কারখানার বেতনের ওপর।
ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান লিপমোটরের সহ-সভাপতি চাও লি বলেন, 'তাত্ত্বিকভাবে যন্ত্র ২৪ ঘণ্টাই কাজ করতে পারে, যা সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় একটি বড় সুবিধা। কিন্তু যন্ত্রেরও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন এর জন্য সময়ের দরকার হয়, আর প্রতি মাসে পুরো উৎপাদন লাইন পরীক্ষা ও মেরামতের মধ্য দিয়ে যায়।'
ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ব্র্যান্ডের সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তি নির্ভর গাড়িগুলো হ্যাংঝৌ এর কারখানায় তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি ধাপে রোবটই সাহায্য করে। তবে অ্যাসেম্বলি লাইনের শেষ মাথায় এসে আবারও মানুষের দেখা মেলে।
কোম্পানিটিতে ২৫ হাজারে বেশি কর্মী রয়েছে, যাদের মধ্যে শত শত কর্মী নতুন গাড়িগুলো বের হওয়ার সময় শেষবারের মতো পরীক্ষা করে দেখেন।
এমন কোনো দিন কি আসবে যখন তাদের আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না? এমন প্রশ্নের উত্তরে চাও বলেন, 'এটি সম্ভব এবং সেই দিনটি হয়তো দ্রুতই আসবে। আমাদের কারখানার মেটাল কাটা, ঝালাই এবং রং করার মতো ধাপগুলোতে আমরা ইতিমধ্যেই প্রায় শতভাগ স্বয়ংক্রিয়তা (অটোমেশন) অর্জন করেছি।'
চীনের বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে আমেরিকার চেয়ে তারা বেশ এগিয়ে রয়েছে। একটি রোবটের শরীর তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই তাদের হাতের কাছে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স ফেডারেশনের মহাসচিব ড. সুসান বাইলার বলেন, 'চীনের নিজস্ব ধারণা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে তারা নিজেদের কোথায় দেখতে চায়, তা তারা ভালো করেই জানে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই পরিকল্পনাগুলো তৈরি হয় এবং দেশের অঞ্চল ও স্থানীয় পৌরসভাগুলোতে তা ভাগ করে দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'আপনি যদি শেনঝেন শহরে একটি রোবট তৈরি করতে চান, তবে সেখানে তার সব ব্যবস্থা রয়েছে। রোবট তৈরির উপাদান সংগ্রহ করতে এক ঘণ্টারও কম সময় লাগে। অথচ ইউরোপে একই কাজের জন্য পুরো এক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।'
তবে তার মতে, চীন যন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো তৈরিতে পারদর্শী হলেও, যুক্তরাষ্ট্র এখনও এর 'মস্তিষ্ক' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে এগিয়ে আছে, যা রোবটগুলোকে পরিচালনা করে। তবুও, ডিপসিক থেকে শুরু করে মুনশট-এর মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক নতুনে এআই মডেল নিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এগুলো আমেরিকার সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেক্কা দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে।
"ওপেন-সোর্স" পদ্ধতির ওপর ভর করে উন্নত চিপ রপ্তানিতে আমেরিকার নানা বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও চীনা উদ্ভাবন প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশ্লেষকরা এখন মনে করছেন, এই প্রতিযোগিতার পরবর্তী ধাপ কে সবচেয়ে ভালো ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি করতে পারলো তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং কে এই বুদ্ধিমত্তাকে কোটি কোটি যন্ত্রের ভেতরে সফলভাবে ছড়িয়ে দিতে পারছে, বিজয়ী নির্ধারণে সেটাই হবে মূল বিষয়।
আর এ কারণেই চীন এমন এক প্রজন্ম গড়তে বিনিয়োগ করছে, যারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রযুক্তি ও পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে শিখছে।
উদাহরণস্বরূপ, হ্যাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটে তরুণরা মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই ভর্তি হতে পারে। আর সেখানে যা শেখানো হচ্ছে, তার ব্যাপ্তি সত্য়িই অবাক করার মতো। সেখানে ইঞ্জিন এবং বিমান চালনা সংক্রান্ত বিদ্যার জন্য আলাদা একটি পুরো ভবন রয়েছে।
এছাড়া একটি বিশেষ সংরক্ষিত ফ্লোর রয়েছে কেবল সেই শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা ওয়াশিংটনের সাথে প্রতিযোগিতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান 'বিরল মৃত্তিকা' প্রক্রিয়াকরণে চীনকে শীর্ষে রাখতে কাজ করবে।
অনেকে এটিকে চীনের তরুণদের উচ্চ বেকারত্বের সমাধানের পথ হিসেবে দেখছেন, যেখানে প্রতি পাঁচজনে একজন কাজ খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছেন। চেন বলেন, 'আমাদের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং তারা পড়াশোনা শেষ করার আগেই বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে বুক হয়ে যায়। চাকরি নিয়ে তাদের একদমই দুশ্চিন্তা করতে হয় না, আর তাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে আমরা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করি।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রযুক্তির এই জোয়ারের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াই শ্রেয়। অগ্রগতির এই প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবেই, আর এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ভেতরেই রয়েছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগ।'
তবে চীন এখনও গভীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘায়িত আবাসন সংকট থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারগুলোর বিশাল ঋণ এবং ধারাবাহিক নিম্নমুখী ভোক্তা ব্যয়।
বেইজিং যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বারবার বলছে, তা এই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে কি না বা কীভাবে করবে—সেটি এখনো অস্পষ্ট। পাশাপাশি, প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের ফলে যাদের চাকরি ঝুঁকিতে রয়েছে, তারা আসন্ন এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন, তা অনুধাবন করাও বেশ কঠিন। রোবট কি তাদের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দেবে, নাকি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নেবে?
চেন বলেন, 'আমার ছাত্ররা আমাকে জিজ্ঞেস করে ভবিষ্যতে কী হবে। আমি বলি, আমি জানি না। প্রযুক্তি এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে! তবে আমরা হাত গুটিয়ে অলস বসে থাকতে পারি না। আমাদের নিজেদের সক্ষমতা পরখ করে দেখতে হলেও সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হবে।'
