গেমারদের ‘সিক্রেট এজেন্ট’ হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা
রাশিয়ার ক্রমাগত সাইবার হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে এক অভিনব কৌশল নিয়েছে জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা 'বুন্দেসনাখরিচটেনডিনস্ট' (বিএনডি)। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষায় এবং রুশ হ্যাকারদের মোকাবিলায় প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন নতুন প্রজন্মের গোপন এজেন্ট হিসেবে গেমারদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
'দ্য টেলিগ্রাফ' জানিয়েছে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স-এর জার্মান সংস্করণ হিসেবে পরিচিত বিএন্ডডি-র কর্মকর্তারা বিশ্বের বৃহত্তম ভিডিও গেম উৎসব 'গেমসকম ২০২৬'-এ উপস্থিত থাকবেন তরুণ স্পাইদের খুঁজে পেতে। জার্মানির কোলন শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই উৎসব থেকেই মূলত মেধাবী গেমারদের বাছাই করা হবে।
বিএন্ডডি কর্মকর্তাদের মতে, গেমারদের সহজাত দক্ষতা এবং রাশিয়ার সাইবার হামলার প্রতিশোধ নিতে সংস্থার প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মধ্যে 'যথেষ্ট মিল' রয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি জার্মানির গোয়েন্দা বিভাগকে ঢেলে সাজানোর একটি পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য বিএন্ডডি-কে এমআই-সিক্স কিংবা ইসরায়েলের মোসাদের মতো শক্তিশালী সংস্থায় রূপান্তর করা।
একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, উৎসবে আসা যেসব গেমারের প্রোফাইল সংস্থার সাথে মিলবে, তাদের পাঁচ ধাপের একটি চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এর মাধ্যমে তাদের সাইবার নিরাপত্তা এবং হ্যাকিংয়ের পারদর্শিতা যাচাই করা হবে।
সম্প্রতি জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের মন্ত্রিসভা বিএন্ডডি-র জন্য একটি বিশেষ সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর ফলে এখন থেকে মাঠ পর্যায়ের এজেন্টরা প্রয়োজনে গুলি চালাতে এবং বিদেশে নাশকতামূলক অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন। তবে কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে কার্যকর ক্ষমতা হলো 'হ্যাক ব্যাক' বা পাল্টা হ্যাকিংয়ের অধিকার। এর মাধ্যমে সংস্থাটি এখন থেকে রাশিয়ার সাইবার হামলার সরাসরি জবাব দিতে পারবে।
ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভকে সমর্থন দেওয়ায় জার্মানি রাশিয়ার ক্রমাগত সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের মার্চে, যখন জার্মান বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অতি-গোপন কথোপকথন ও সামরিক কৌশল রেকর্ড করে ফেলেছিল মস্কো। এছাড়া বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিসংযোগ এবং বিমানবন্দরে বোমা হামলার পরিকল্পনার পেছনেও রাশিয়ার হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তবে কেবল সাইবার জগতই নয়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হত্যা, ইউক্রেনে সরঞ্জাম সরবরাহকারী কারখানায় অগ্নিসংযোগ এবং জার্মান বিমানবন্দরে বোমা পুঁতে রাখার ষড়যন্ত্রেরও সন্দেহ করা হচ্ছে। এসব গোয়েন্দা সংস্কারের ফলে গেমারদের নিয়োগ এখন বিএন্ডডি-র কাছে প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সংস্থাটি জার্মানির বিরুদ্ধে রাশিয়ার তথাকথিত 'হাইব্রিড ওয়ার' প্রতিহত করার নতুন পথ খুঁজছে।
গোয়েন্দাগিরির এই নতুন যুগে জার্মানির তরুণ গোয়েন্দাদের মস্কোর গোয়েন্দা ডাটাবেজ বা অস্ত্র উৎপাদন নেটওয়ার্কে হ্যাক করার মাধ্যমে রুশ সাইবার হামলার সরাসরি বদলা নিতে হতে পারে। বিএন্ডডি-র মুখপাত্র জুলিয়া লিনার টেলিগ্রাফকে বলেন, 'গেমারদের মেধা এবং আমাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মধ্যে আমরা একটি বড় মিল দেখতে পাই। তারা প্রযুক্তি-সচেতন, বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে পছন্দ করেন, বিভিন্ন মিশন সম্পন্ন করেন এবং সফল না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়েন না।'
তিনি আরও জানান, বর্তমানে যে আইনি সংস্কারগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে, তার মাধ্যমে গঠিত 'নতুন বিএন্ডডি'-তে সম্ভবত এই নতুন মেধাবীরাই যোগ দেবেন।
গেমসকম উৎসবে বিএন্ডডি-র স্টলে তাদের নিজস্ব তৈরি গেম 'বিএন্ডডি লিজেন্ডস' খেলার সুযোগ থাকবে। বিএন্ডডি সূত্রগুলো বলছে, স্টলটির মূল আকর্ষণ হবে গেমারদের এই গেমটি খেলার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি করা। তবে একই সময়ে কিছু এজেন্ট বিএন্ডডি-র কাজের আরও নাটকীয় দিক—বিশেষ করে হ্যাকিংয়ের জন্য 'যোগ্য পেশাদারদের' খুঁজে বের করবেন।
জার্মানি তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তি বাড়াতে কেবল এটাই একমাত্র অস্বাভাবিক কৌশল নয়। দেশটির সেনাবাহিনী (বুন্দেসওয়েহর) তাদের ক্যারিয়ার ওয়েবসাইটের লিংকসহ ছদ্মবেশী বা 'ক্যামোফ্লেজ' রঙের 'কাবাব র্যাপার' (মোড়ক) বিলি করে প্রচারণা চালাচ্ছে। সেই মোড়কে লেখা আছে— 'ওয়ান ক্যারিয়ার উইথ এভরিথিং'। এটি মূলত জার্মান ভাষায় প্রচলিত 'সবকিছু দিয়ে একটি কাবাব' বাক্যটির একটি ভিন্ন রূপ।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএন্ডডি-কে শুরুতে নাৎসি আমলের গেস্টাপো বা এসএস-এর নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়াবহ ইতিহাস থেকে আলাদা রাখতে কেবল একজন দুর্বল 'পর্যবেক্ষক' হিসেবে রাখা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএন্ডডি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন এই বিধিনিষেধগুলো এখন অযৌক্তিক এবং মান্ধাতা আমলের; বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে যেখানে রাশিয়া পশ্চিমের জন্য একটি বড় হুমকি।
চ্যান্সেলর মার্জের সরকার এই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডট বলেছেন, এর মাধ্যমে অবশেষে জার্মানি 'প্রকৃত গোয়েন্দা পরিষেবা' পেতে যাচ্ছে। তবে বিএন্ডডি-কে জেমস বন্ডের মতো শক্তিশালী সংস্থায় রূপান্তরের এই স্বপ্ন জার্মানির ভেতরেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বামপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলো এর বিরোধিতা করছে।
বামপন্থী দল 'ডি লিঙ্কে' দাবি করেছে, গোয়েন্দা সংস্থাকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হবে একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ, যা জার্মানিকে আবারও নাৎসি আমলের মতো নজরদারি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। দলটির সংসদ সদস্য উলরিখ থোডেন বলেন, গোয়েন্দা পরিষেবার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হলো 'আমাদের ইতিহাসের একটি তিক্ত শিক্ষা, যা বিশেষ করে গেস্টাপো থেকে আমাদের শিখতে হয়েছে।'
অন্যদিকে উগ্র ডানপন্থী দল 'অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি', যারা আগামী সেপ্টেম্বরে বড় ধরনের জয়ের সম্ভাবনা দেখছে, তারাও এই সংস্কার নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে। গত বছরের নির্বাচনের পর পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হওয়া এই দলটি জার্মান নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এত সংস্কারের মাঝেও বিএন্ডডি-কে জেমস বন্ডের মতো 'লাইসেন্স টু কিল' বা হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।
