চীন ও রাশিয়া ‘আতঙ্কে’ পশ্চিমাদের সাহায্য নিয়ে নতুন গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করছে জাপান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীভূত গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ কাজে পশ্চিমা মিত্রদের সাহায্য নিচ্ছে দেশটি।
সম্প্রতি জাপানের শীর্ষ নেতারা প্রযুক্তি, কর্মী নিয়োগ ও অগ্রাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে পরামর্শের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির মতো দেশগুলোর সঙ্গে একান্তে যোগাযোগ করেছেন। জাপান ও অন্যান্য দেশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানতে পেরেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে কয়েক ডজন রুশ গুপ্তচর জাপানে আশ্রয় নিয়েছে। কারণ ক্রেমলিনের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জাপান থেকে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ কেনা, সেগুলো রাশিয়ায় পাঠানো ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানো। বিদেশি কর্মকর্তারা এই বিষয়ে জাপানকে সতর্ক করলেও তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ ধীর।
জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই খণ্ডিত। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা, কূটনীতিক, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে, কিন্তু নিজেদের মধ্যে তা আদানপ্রদান করে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমন্বয়হীনতার কারণেই জাপান গুপ্তচরবৃত্তি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের কাছে এতটা অরক্ষিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে একটি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা গঠন তার এই প্রচেষ্টার অংশ।
'শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ' জাপানের স্বপ্ন দেখানো এই কট্টরপন্থি নেতা ইতিমধ্যেই অস্ত্র রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। যুদ্ধোত্তর যুগে জাপানের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।
এখন তাকাইচি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি রক্ষা এবং বিদেশি প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা, বিশেষ করে চীনের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাইছেন।
সাইবার সিকিউরিটি রিসার্চ গ্রুপ সিটিজেন ল্যাবের গবেষকদের তথ্যমতে, বেইজিংপন্থি মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য চীন সম্প্রতি জাপানি ভাষার নিউজ চ্যানেলের ছদ্মবেশে বেশ কিছু ওয়েবসাইট তৈরি করেছে।
জাপানে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যান্ড্রু শিয়ারার—যিনি তাকাইচি সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ দিয়েছেন—বলেন, জাপানি কর্মকর্তারা মনে করেন তাদের দেশের গোয়েন্দা সক্ষমতা 'কয়েক দশক ধরে এক জায়গাতেই থমকে আছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এটি বাস্তবায়নে তার রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করছেন, এটা অনেক বড় ব্যাপার।'
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন শিয়ারার। ২০২০ সাল থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ার ডিরেক্টর জেনারেল অভ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মে মাসে যখন সানা তাকাইচি ক্যানবেরা সফর করেন, তখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজকে ধন্যবাদ জানান। কারণ গোয়েন্দা কার্যক্রমে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
নিউইয়র্ক টাইমস জানতে পেরেছে, গত কয়েক মাসে:
• জাপানের প্রধান নিরাপত্তা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শিল্প গুপ্তচরবৃত্তি দমনের কৌশল নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
• জাপানে পরিচালিত বিদেশি বিনিয়োগ ও এজেন্টদের ওপর নজরদারি কীভাবে আরও জোরদার করা যায়, সে বিষয়েও মার্কিনীরা মতামত জানিয়েছেন।
• বিএনডি নামে পরিচিত জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সম্প্রতি টোকিও সফর করেছেন। জাপানের নতুন গোয়েন্দা সংস্থা গঠন এবং দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান কীভাবে উন্নত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা ছিল এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য। সফর সম্পর্কে অবহিত দুই ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।
• শিয়ারার জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে কীভাবে একটি দল হিসেবে কাজ করা যায় এবং নিজেদের মধ্যে তথ্য শেয়ার করা যায়, সেই কৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা।
নতুন এই সংস্থা গঠনের ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মকর্তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জাপান সরকার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা কেবল বলেছে, জাপান 'নিয়মিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমকক্ষ সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখে।'
সানায়ে তাকাইচির পরিকল্পনা হলো, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকে কেন্দ্রীভূত করা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সেই তথ্য আদানপ্রদানে উৎসাহিত করা। তবে তার এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাকাইচির বিরুদ্ধে সামরিকায়নের অভিযোগ তুলেছে চীনও।
জাপানেও কিছু আইনপ্রণেতা ও অধিকারকর্মী বলছেন, এই নতুন সংস্থার ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি বা জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে, যা দেশটির শান্তিবাদী আদর্শের পরিপন্থি। সাম্রাজ্যবাদী জাপানের ভয়াল স্মৃতি এখনো মানুষের মনে গেঁথে আছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তোক্কো নামে পরিচিত পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সেই ভয়ংকর রাজত্বের কথা, যারা মূলত সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করত।
পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা মিজুহো ফুকুশিমার মতে, গত আট দশকে কোনো স্বাধীন গোয়েন্দা সংস্থা না থাকাটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, এর মূলে রয়েছে 'যুদ্ধ প্রত্যাখ্যানকারী শান্তিকামী জাতি হিসেবে থাকার প্রতি জাপানের প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের অতীত ইতিহাস থেকে নেওয়া শিক্ষা।'
নতুন এই সংস্থা সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, এটি 'ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার লঙ্ঘন করে এবং নজরদারি সমাজ গড়ার পথ প্রশস্ত করে।'
সানায়ে তাকাইচি ও তার মিত্ররা অবশ্য এর পক্ষেই শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তাকাইচি চাইছেন, জাপানের গুপ্তচরবৃত্তি-বিরোধী আইন আরও কঠোর হোক। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার সিআইএ-র ধাঁচে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের পক্ষেও সায় দিয়েছেন তিনি। কারণ বিশ্বের হাতেগোনা যে কটি পরাশক্তির এমন নিজস্ব কোনো সংস্থা নেই, জাপান তাদের অন্যতম।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় ৪০৭ মিলিয়ন ডলার বাজেটের নতুন এই গোয়েন্দা সংস্থার পুরোদমে কাজ শুরু করার কথা রয়েছে। শুরুতে এর কর্মী সংখ্যা হবে কয়েকশো। এই দলে থাকবেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিদেশি লিয়াজোঁ কর্মকর্তারা। জাপানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, আগামী বছরই নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
জাপানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মূল কেন্দ্র হতে যাচ্ছে নতুন এই সংস্থা। পুলিশ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—জাপান সরকারজুড়ে গোয়েন্দা কার্যক্রমে যুক্ত আছেন প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ। বিশাল এই কর্মীবাহিনীর কাজের মধ্যে নিশ্ছিদ্র সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব থাকবে এই সংস্থার কাঁধে।
তথ্যের আদানপ্রদান সমন্বয় করার জন্য জাপানের একটি ক্যাবিনেট অফিস আগে থেকেই আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, অন্য সংস্থাগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করতে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। তাকাইচির এই ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাপান একটি পৃথক ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলও গঠন করতে যাচ্ছে। এই কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী। কাউন্সিলটি গোয়েন্দা ব্যবস্থার মূল কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করবে।
জাপানের ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েটের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেন, সাইবার হামলার মাধ্যমে অতিগোপনীয় তথ্য চুরি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো অপতথ্য ঠেকাতে এই গোয়েন্দা সংস্থা এখন সময়ের দাবি।
ওই মুখপাত্র আরও বলেন, 'বিদেশি সংস্থাগুলোর কার্যকলাপ' মূল্যায়ন করার পাশাপাশি 'সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে' কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন দখলদারিত্বের সময় জাপানের একসময়ের দুর্ধর্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যের জন্য এরপর থেকেই জাপান যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর হয়ে পড়ে। দেশের ভেতরেও স্বাধীন কোনো গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের ব্যাপারে তখন তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। কারণ তোক্কোর সেই ভয়ংকর বাড়াবাড়ির স্মৃতি তখনও সবার মনে তাজা।
পরের কয়েক দশকে জাপান পরিচিতি পায় 'গুপ্তচরদের স্বর্গরাজ্য' হিসেবে। এখানে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের সহজেই কিনে নেওয়া যায়। আর বিদেশি এজেন্টরা কোনো শাস্তির ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারে।
দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে ২০১৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ওপর চাপানো অনেক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেন জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০২২ সালে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া আবে ছিলেন তাকাইচির রাজনৈতিক গুরু।
ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির রক্ষণশীল নেতা হিসেবে দুজনেই মনে করতেন, নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনী পুনর্গঠনের চেয়ে যুদ্ধকালীন ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ক্ষমা চাইতেই জাপান বড্ড বেশি সময় নষ্ট করে ফেলেছে।
আবে আমেরিকার ধাঁচে একটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ও সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা করেন। তথ্য ফাঁসের বদনাম ঘোচাতে একটি জাতীয় গোপনীয়তা আইন প্রণয়নেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি চাইতেন, জাপান একটি 'স্বাভাবিক' রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—যে রাষ্ট্র নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম এবং বিশ্বমঞ্চে আরও বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
শিনজো আবের সেই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন তাকাইচি। অতি-স্পর্শকাতর প্রযুক্তি চুরি ঠেকাতে তার সরকার এরইমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়ক কমিটিও গঠন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাকাইচির এই মিশন কতটা সফল হবে, তা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, তিনি জাপানি আমলাতন্ত্রের অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে পারবেন কি না। দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারবেন কি না।
