রাজপরিবারে উত্তরাধিকার সংকট, তবু কেন কোনো নারীকে সিংহাসনে বসতে দিচ্ছে না জাপান?
ইতিহাস গড়ে হয়তো প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে জাপান। কিন্তু দেশটির রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার সংকট এড়াতে তার সরকারের নেওয়া নতুন পদক্ষেপগুলো রাজকীয় 'চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসনে' কোনো নারীর আরোহণের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে তুলছে। বর্তমানে এই সিংহাসনের মাত্র তিনজন যোগ্য পুরুষ উত্তরাধিকারী রয়েছেন—যাদের মধ্যে দুজনই আবার ষাটোর্ধ্ব। ফলে এক চরম উত্তরাধিকার সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে জাপানের রাজপরিবার।
শত শত বছর ধরে জাপানের রাজতন্ত্রে কেবল পুরুষদেরই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার নিয়ম বজায় রাখা হয়েছে। জাপানের মতো একটি চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য এটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়, যেখানে ব্যবসা থেকে শুরু করে রাজনীতি—সবখানেই পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য।
কিন্তু ঐতিহ্য ধরে রাখার এই অনমনীয় জেদই এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্রের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কারণ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জাপানি রাজপরিবারে কন্যাসন্তানের তুলনায় পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছে খুবই কম।
উত্তরাধিকারের এই চরম ঘাটতি মেটাতে সরকারের মন্ত্রীরা রাজপরিবারের পুরনো শাখাগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে পুরুষ উত্তরাধিকারীর পরিধি বাড়ানো যায়। এই আইনি পরিবর্তনগুলো এখন কেবল সংসদীয় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে গবেষক, বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ নাগরিকদের মনে এক বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে: কেন নারীদের রাজসিংহাসনে বসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না?
টোকিওর চুইও ইউনিভার্সিটির রাজকীয় বংশানুক্রম গবেষক অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া বলেন, 'কোনো নারীকে সম্রাট হতে না দেওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।'
ঐতিহাসিকভাবে জাপানে পূর্বে আটজন নারী সম্রাট (সম্রাজ্ঞী) ছিলেন, বিশেষ করে যখন পুরুষ উত্তরাধিকারীরা শাসন করার জন্য অতি অল্পবয়সী ছিলেন। কিন্তু মেইজি যুগে ১৮৮৯ সালে 'ইম্পেরিয়াল হাউজ ল' (রাজকীয় গৃহ আইন) পাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের সম্রাট হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
তবে ওকাওয়া বলেন, এই আইন থাকা সত্ত্বেও জাপানের বর্তমান সংবিধানে নারীদের সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই এবং নারীদের বাদ দেওয়াকে জাপানের চিরাচরিত ঐতিহ্য হিসেবেও গণ্য করা যায় না। ওকাওয়ার মতে, 'নারীরা সম্রাট হওয়ার অযোগ্য—এমন ধারণা নিয়ে তাদের শুরুতেই বাদ দিয়ে দেওয়াটা মূলত চরম ও প্রকাশ্য নারীবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই নয়।'
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, জাপানের অধিকাংশ মানুষ নারী সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কানা সাকাকুরা উল্লেখ করেন যে, ইউরোপের দেশগুলোতে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে নারী শাসকদের এক দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। তিনি বলেন, 'অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয়, জাপানে এখনও এমন একটি পরিবেশ রয়ে গেছে যেখানে সমাজে নারীদের শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া এড়িয়ে চলা হয়।'
কিন্তু জাপানে নারী উত্তরাধিকার চালুর দাবিটি বরাবরই অবহেলিত থেকে গেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং তার ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিরোধী। এ বছরের শুরুতে এক সংসদীয় আলোচনায় তাকাইচি বলেছিলেন, 'উত্তরাধিকার কেবল রাজকীয় বংশের পুরুষ বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন।'
যদিও জাপানের রাজপরিবারের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী, তবুও সূর্যের দেবীর বংশধর হিসেবে পরিচিত এই রাজপরিবার ১২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দেশে ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই জাপানের পুনর্গঠন তদারকি করতে গিয়ে মার্কিন সেনা জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার এক টেলিগ্রামে সম্রাটকে পুরো জাপানি জাতির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছিলেন, 'সম্রাট হলেন এমন এক প্রতীক যা সব জাপানিকে একত্রিত করে। তাকে ধ্বংস করলে এই জাতি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।'
যুদ্ধপূর্ব জাপানে অবশ্য রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী খুঁজে পাওয়া এতটা কঠিন ছিল না। সে সময় রাজপরিবার অনেক বড় ছিল এবং এর সমান্তরাল অন্যান্য শাখা বা 'ওকে' সক্রিয় ছিল, যা মূল রাজবংশে পুত্রসন্তান না থাকলেও উত্তরাধিকারীর জোগান দিত।
কিন্তু ১৯৪৭ সালে সবকিছু বদলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত অর্থনীতির কারণে রাজকীয় ব্যয় কমাতে ইম্পেরিয়াল হাউস ল সংশোধন করা হয়। এর ফলে রাজপরিবারের পরিধি ছোট করে ফেলা হয় এবং তৎকালীন সম্রাট হিরোহিতোর নিকটাত্মীয়দের বাইরে থাকা ১১টি সমান্তরাল শাখাকে রাজকীয় মর্যাদা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আর এর মাধ্যমেই আজকের এই উত্তরাধিকার সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল।
এই আইনের ফলে ৬৭ সদস্যের রাজপরিবার সংকুচিত হয়ে মাত্র ১৬ সদস্যে নেমে আসে। এর ওপর আরেকটি কঠোর নিয়ম হলো, কোনো রাজকন্যা যদি সাধারণ ঘরের কোনো ছেলেকে বিয়ে করেন, তবে তাকে রাজকীয় মর্যাদা ও রাজপরিবার ত্যাগ করতে হবে।
সরকারের নতুন প্রস্তাবে রাজপরিবারকে এই সমান্তরাল শাখাগুলোর ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, অবিবাহিত ও নিঃসন্তান তরুণদের 'দত্তক' নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে তাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে সিংহাসনে বসার যোগ্য হতে পারে।
বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী সম্রাট নারুহিতোর একমাত্র সন্তান হলেন দেশজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজকুমারী আইকো। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে ২৪ বছর বয়সী আইকোর সিংহাসনে বসার কোনো আইনি অধিকার নেই। আইকোর কোনো সন্তান নেই, আর থাকলেও সেই পুত্রসন্তান সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারতেন না।
বর্তমানে সম্রাটের যোগ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রয়েছেন তার ৯০ বছর বয়সী চাচা হিতাচি এবং তার ৬০ বছর বয়সী ছোট ভাই আভিশিনো। আর তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হলেন আভিশিনোর ১৯ বছর বয়সী পুত্র হিসাহিটো, যিনি গত ৪০ বছরের মধ্যে রাজপরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া একমাত্র পুরুষ সদস্য।
রাজপরিবারের পরিধি ও সদস্যদের বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন নিয়মিত রাজকীয় দায়িত্ব পালন করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বিলে রাজকন্যারা সাধারণ ঘরের ছেলেকে বিয়ে করলেও রাজপরিবারে থাকার অনুমতি পাবেন এবং কাজ ভাগ করে নিতে পারবেন, তবে তাদের পুত্রসন্তানরা সিংহাসনের দাবিদার হতে পারবেন না।
অধ্যাপক ওকাওয়া মনে করেন, এগুলো কেবল সাময়িক জোড়াতালি মাত্র, যা সীমিত সংখ্যক পুরুষ উত্তরাধিকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। তিনি বলেন, 'যতক্ষণ না নারীদের সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে, ততক্ষণ রাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।'
তবে অনেকের কাছে এই নারী উত্তরাধিকারের বিষয়টি শত বছরের সেই কড়া ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানার মতো, যে ঐতিহ্য দেশকে দীর্ঘকাল স্থিতিশীলতা দিয়ে এসেছে।
সাবেক রাজকীয় শাখার এক বংশধর জুনেয়াসু তাকেদা সিএনএন-কে বলেন, 'যারা নারী উত্তরাধিকারের পক্ষে, তারা এটিকে সমস্যা হিসেবে নাও দেখতে পারেন। কিন্তু আমার মতো যারা মনে করেন আমাদের ঐতিহ্যবাহী পুরুষতান্ত্রিক রক্তধারা বজায় রাখা উচিত, তাদের কাছে এটি একটি বড় ঝুঁকি।'
তাকেদা ইতিমধ্যে বিবাহিত থাকায় এই নতুন আইনের অধীনে দত্তক নেওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। তার ছেলে ১৫ বছর বয়সে পৌঁছালে যোগ্য হতে পারে, তবে তাকেদা চান তাঁর ছেলে তার ব্যবসা দেখাশোনা করুক।
তাকেদা আরও বলেন, 'কোনো ঐতিহ্যকে স্রেফ জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার (পপুলারিটি কনটেস্ট) মাধ্যমে বদলে ফেলা উচিত নয়। একটি গণতান্ত্রিক ভোটে যদি সামান্য ব্যবধানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াও হয়, তবুও যদি জনগণের একটি অংশ সম্রাটকে মেনে নিতে অস্বীকার করে, তবে রাজতন্ত্র তার মর্যাদা হারাবে। এটি মূলত জাপানের ভিত্তিমূলকেই নাড়িয়ে দেবে।'
তবে স্থানীয় বাসিন্দা আকিও কুবোতা এই যুক্তির দ্বিমত পোষণ করে বলেন, 'আজকের বিশ্বে আমরা লিঙ্গ সমতার কথা বলি। সে ক্ষেত্রে শুধু সম্রাটের পদটি কঠোরভাবে কেবল পুরুষদের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হবে—বিষয়টি দেখতে এখন একটু অদ্ভুতই লাগে।'
