যেভাবে জাপানকে গুপ্তচরদের আস্তানা বানালেন পুতিন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ সেনারা ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরপরই পশ্চিমা নেতারা নিজেদের রাজধানী থেকে শত শত রুশ গুপ্তচরকে বহিষ্কার করেন এবং ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা কোম্পানিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেন।
সমন্বিত ওই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ক্রেমলিনের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং মাইক্রোচিপ, ট্রান্সমিটার ও অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মতো সরঞ্জাম কেনা কঠিন করে তোলা।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এরপর থেকে বহিষ্কৃত ওই গুপ্তচরদের কয়েক ডজনকে একটি অপ্রত্যাশিত জায়গা—জাপানে দেখা গেছে।
দেশটির দুর্বল গুপ্তচরবৃত্তি আইন এবং সমৃদ্ধ উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় জাপানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ইউক্রেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে জাপানি যন্ত্রাংশ রয়েছে।
টোকিওতে এই কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন ইউনিট, যার নাম '২০তম অধিদপ্তর'। এই ইউনিটের ভূমিকা কখনো প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। পশ্চিমা পাঁচটি গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, কূটনীতিক বা ব্যবসায়ীর পরিচয়ে থাকা এই ইউনিটের কর্মকর্তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রযুক্তি কিনতে বা চুরি করতে এবং তা গোপনে রাশিয়ায় পাঠানোর কাজ করেন।
টোকিওতে ২০তম অধিদপ্তরের কার্যক্রম তদারককারী ব্যক্তি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা অ্যারোফ্লোটের একজন কর্মী হিসেবে নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন বলে চারটি গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এই প্রচেষ্টার ফল ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাতের বেলায় চালানো হামলা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে স্পষ্ট। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং পুরো শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চার বছর পরও রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, এর একটি কারণ হলো জাপান থেকে সংগ্রহ করা প্রযুক্তির মতো উন্নত প্রযুক্তি রাশিয়াতে অব্যাহত প্রবেশাধিকার।
চলতি বছরের মে-তে রাশিয়ার একটি কেএইচ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করে এবং অন্তত ২৪ জন নিহত হয়। এরপর তদন্তকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করেন। ইউক্রেনের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, তারা দেখতে পান যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরিচালনার জন্য এমন জাপানি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলো রাশিয়ায় রপ্তানি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সরকারি গোপন নথি, কোম্পানির রেকর্ড এবং তিন মহাদেশের কয়েক ডজন গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসন্ধান করে, ২০তম অধিদপ্তর কীভাবে কাজ করে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ভি. পুতিনের চালানো যুদ্ধে টোকিও স্টেশন কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তা অনুসন্ধান করেছে। বেশির ভাগ কর্মকর্তা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন, কারণ তাদের প্রকাশ্যে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের অনুমতি ছিল না।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জাপানের কাছে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, রুশ হামলায় তাদের দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে—নথি ও সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে ইউক্রেনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জাপান সরকার ব্যবস্থা নিতে ধীরগতি দেখিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের বিধিনিষেধের কারণে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুপ্তচরদের জন্য একটি সহজ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধজয়ী দেশগুলো তৈরি করা এসব বিধিনিষেধের কারণে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এমনকি জাপানের কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও নেই। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি সম্পর্কে সচেতন এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কয়েক দশক পুরোনো বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করছেন।
'এই পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মধ্যে সংকটের অনুভূতি রয়েছে,' বলেছেন ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা এবং শিল্প গুপ্তচরবৃত্তির মামলার সাবেক আইনজীবী আকিহিসা শিওজাকি।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তবে তারা বলেছে, রাশিয়ার কাছে সামরিক সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে সরকার পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে কাজ করেছে।
মন্ত্রণালয় এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, 'ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন এমন একটি নিন্দনীয় কর্মকাণ্ড, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।'
তবে জাপানি কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই রুশ গুপ্তচররা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
টোকিওতে অ্যারোফ্লোটের কার্যালয়টি জাতীয় পুলিশ সংস্থার সদর দপ্তর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। এই সংস্থাই গুপ্তচরবৃত্তির তদন্ত করে থাকে। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, ২২ তলায় অবস্থিত ওই বিমান সংস্থার কার্যালয় থেকেই টোকিওতে ২০তম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তার প্রাণঘাতী কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তার নাম ম্যাকসিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ।
টোকিওতে এক গুপ্তচরের আগমন
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৯ বছর বয়সী ফিলচেনকভ টোকিওতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাশিয়া উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশের তীব্র সংকটে ছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধ তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো কামানযুদ্ধ থেকে ধীরে ধীরে ড্রোননির্ভর যুদ্ধে রূপ নিচ্ছিল এবং ইউক্রেন প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
যুদ্ধে টিকে থাকতে রাশিয়াকে প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হচ্ছিল। চীন এ ক্ষেত্রে কিছু সহায়তা করতে পারলেও, দেশটির সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র তৈরির জন্য যেসব উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম, মেশিন টুলস ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ দরকার ছিল, সেগুলোর বিকল্প ছিল না। অথচ যুদ্ধ শুরুর পর বহু প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য রাশিয়ার কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ করে দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নামেন ফিলচেনকভ। তিনি রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে তিনি একবার জাপানে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম খুঁজে বের করা এবং সেগুলো রাশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ছিল।
ব্যবসায়িক নথি ও সাক্ষাৎকারের তথ্য অনুযায়ী, ফিলচেনকভ জাপান থেকে রাশিয়ায় পণ্য পরিবহনকারী লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করেন।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা জাপানকে সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের সম্পর্ক জিআরইউ কর্মকর্তাদের ভুয়া পরিচয়ে সংবেদনশীল প্রযুক্তি কেনা এবং কখনো কখনো জাল পরিবহন নথি ব্যবহার করে তা রাশিয়ায় পাঠানোর সুযোগ করে দেয়।
বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এখানেই ২০তম পরিদপ্তর পারদর্শী। যদিও এই ইউনিটের ইতিহাস অস্পষ্ট, কর্মকর্তারা বলেছেন যে এটি ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই বিদ্যমান ছিল। তারা বলেন, সেই লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এটি সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহের জন্য ক্রেমলিনের প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে।
সোভিয়েত আমল থেকেই জিআরইউ-এর গুপ্তচররা পশ্চিমা প্রযুক্তি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অ্যারোফ্লোটের চাকরিকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। টোকিওতে অ্যারোফ্লোট কার্যালয়ের প্রবেশপথ দেখতে অনেকটা কারাগারের দরজার মতো। সেখানে একটি সরু কাচের ফাঁক এবং একটি ডোরবেল রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে মাঝবয়সী এক নারী, যার চুল খড়ের মতো রঙের এবং গলায় রুশ অর্থোডক্স ক্রুশ ঝুলছিল, দরজা খুলেছিলেন। তিনি সেখানে অতিথি দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন।
নারীটি বলেন, ফিলচেনকভ সেখানে নেই। তিনি জানেন না, তিনি কখন ফিরবেন।
জাপানের পক্ষ থেকে অ্যারোফ্লোটকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হয়নি। তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও সেবা সংগ্রহ করতে না পারায় কার্যত দেশটিতে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
তবে অ্যারোফ্লোটের আনুষ্ঠানিক অংশীদাররা এখনো সক্রিয় রয়েছে।
তাদের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান হলো প্রোকো এয়ার। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের 'জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন' হিসেবে প্রচার করে। প্রোকো এয়ার শ্রীলঙ্কা বা উজবেকিস্তানের মতো যেসব দেশে অ্যারোফ্লোটের কার্যক্রম রয়েছে, সেসব দেশে যাতায়াতকারী বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পণ্য পরিবহনের জায়গা ভাড়া নেয়। এরপর অ্যারোফ্লোট সেসব দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। এতে বেআইনি কিছু নেই, এমনকি এটি অস্বাভাবিকও নয়। রাশিয়ায় এখনো অনেক পণ্য বৈধভাবে পাঠানো যায় এবং এ ধরনের অংশীদারত্ব সেই বাণিজ্য চালু রাখতে সহায়তা করে।
তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, ২০তম অধিদপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের নথি অনুযায়ী, ক্রেমলিন যে সংবেদনশীল দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি (যে প্রযুক্তি বেসামরিক ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়) সংগ্রহ করতে চাইছে, তার বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ হলো জাপান।
চোরাকারবারিদের এসব সরঞ্জাম সরাসরি রাশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের শুধু এমন কোনো দেশে পৌঁছে দিতে হবে, যে দেশ রাশিয়ার কাছে এসব পণ্য বিক্রি করতে রাজি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানের সংবেদনশীল প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো ভিয়েতনাম। আবার ভিয়েতনামই রাশিয়ায় সংবেদনশীল প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উৎস।
প্রোকো এয়ার টোকিওর একটি শিল্পাঞ্চলীয় বন্দর এলাকায় অবস্থিত। অ্যারোফ্লোটের কার্যালয় থেকে গাড়িতে সেখানে যেতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে।
সেখানেও ফিলচেনকভকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তাকেহিকো মিকি এবং তার স্ত্রী কথা বলতে রাজি হন।
জাপানি নাগরিক মিকি বলেন, ২০১৮ সালের দিকে ফিলচেনকভের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তবে ফিলচেনকভ ছয় বছর পর টোকিওতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তিনি তার সঙ্গে নিয়মিতভাবে কাজ শুরু করেননি।
মিকির স্ত্রী তাদের রুশ ব্যবসায়িক অংশীদারকে এমন একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি কখনো হাসতেন না এবং কেবল তার 'ব্যবসায়িক দিক'টিই অন্যদের দেখাতেন।
এই ঘটনা সম্পর্কে সরাসরি অবগত দুই ব্যক্তির মতে, গত বছর মিকি চীনে অবস্থানরত একজন সহযোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই সহযোগীর সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ফিলচেনকভ। ওই ব্যক্তিরা জানান, মিকি বিশেষভাবে এমন কিছু পণ্য পরিবহনে সহায়তা চেয়েছিলেন, যেগুলো রাশিয়ায় পাঠানো নিষিদ্ধ বলে তিনি স্বীকার করেছিলেন।
সাক্ষাৎকার এবং পরবর্তী যোগাযোগে মিকি অস্বীকার করেন, ফিলচেনকভের রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। রাশিয়ায় নিষিদ্ধ কোনো পণ্য পাঠানোর জন্য তিনি কখনো সহায়তা চেয়েছেন—এমন অভিযোগও তিনি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। মিকি বলেন, প্রোকো এয়ার শুধু অনুমোদিত পণ্যই পরিবহন করে। এর মধ্যে 'মূলত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং কিছু প্রসাধনী পণ্য' রয়েছে।
নিজের বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে তিনি তার স্ত্রীকে একটি সাম্প্রতিক এয়ার বিল নিয়ে আসতে বলেন। তবে নথিটি হাতে দেওয়ার আগে মিকি কলম দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নাম কালো করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
নথিটি মিকির বক্তব্যকে সমর্থন করেছিল। এতে দেখা যায়, ১২ মার্চ শ্রীলঙ্কার মাধ্যমে রাশিয়ায় চিকিৎসা সরঞ্জামের একটি চালান পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু কালো করা অংশটি কার্যকর হয়নি। ফলে নথিতে দেখা যায়, মিকি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করছিলেন, যার ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
নথিতে স্পষ্টভাবে পণ্য গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মস্কোভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি আর-ফার্মের নাম উল্লেখ ছিল।
আর-ফার্ম নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সেই রেপিককে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছে। যদিও জাপান তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখেনি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এসব দেশ রেপিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। রেপিক বহুবার পুতিনের পাশে উপস্থিত হয়েছেন এবং যুদ্ধকে সমর্থনের প্রচেষ্টার কথা বলেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকও রয়েছে, যেখানে তিনি রুশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুদ্ধের জন্য 'অভূতপূর্ব সহায়তা' দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান।
গত বছর রেপিক বলেছিলেন, 'আমি মনে করি, এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়ার সব ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে আমাদের মাতৃভূমির রক্ষকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।'
প্রোকো এয়ারের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। মিকি বলেন, জাপানি কর্তৃপক্ষ কখনো তার পণ্য পরিবহন কার্যক্রম নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তিনি বলেন, 'কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যক্তির কাছে পণ্য পরিবহনে আমি কখনো জেনে-শুনে সহায়তা করিনি।'
কূটনৈতিক সতর্কবার্তা
বিদেশি সরকারগুলো বারবার জাপানকে সতর্ক করেছে যে, দেশটির প্রযুক্তি পাচার হয়ে রাশিয়ার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
শুধু ২০২৫ সালের এপ্রিলেই ইউক্রেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে অন্তত আটটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছিল।
এসব বার্তায় বেসামরিক স্থাপনায় হামলার পর উদ্ধার করা রুশ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামে জাপানি যন্ত্রাংশ পাওয়ার প্রমাণের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। একজন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা জানান, ওই বছর আরও প্রায় আটটি কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল।
এসব চিঠির সঙ্গে উদ্ধার করা কয়েক ডজন জাপানি তৈরি যন্ত্রাংশের তালিকা ও ছবি পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সার্কিট বোর্ড, ট্রান্সমিটার এবং অর্ধপরিবাহী (সেমিকন্ডাক্টর)। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এসব চিঠির একটি পর্যালোচনা করেছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেও জাপানি যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পাঠানো ওই চিঠিতে লেখা ছিল, 'রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করার সময় অথবা তৃতীয় দেশে সংবেদনশীল পণ্য ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার ক্ষেত্রে আমি আশা করি, আপনারা এই তথ্য বিবেচনায় নেবেন।'
ইউক্রেন জাপানের কাছে উদ্ধার করা যন্ত্রাংশের তালিকা দিয়েছিল, যেগুলো দেশটির কয়েকটি বড় কোম্পানি—যেমন নিপ্পন ইলেকট্রিক করপোরেশন, প্যানাসনিক, তোশিবা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান—তৈরি করেছিল।
তবে এসব নথিতে এমন কোনো প্রমাণ ছিল না যে, কোম্পানিগুলো জেনেশুনে তাদের পণ্য রাশিয়ার কাছে বিক্রি করেছে। বরং ধারণা করা হচ্ছে, পণ্যগুলো প্রথমে অন্য দেশে পাঠানো হয়েছিল এবং পরে সেখান থেকে পুনরায় বিক্রি হয়ে রাশিয়ায় পৌঁছেছে।
সব কোম্পানিই কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা জাপানের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নিপ্পন বলেছে, ইউক্রেন যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশগুলোর কথা উল্লেখ করেছে, সেগুলো পুরোনো এবং বহু বছর ধরে কোম্পানিটি আর বিক্রি করে না।
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রচেষ্টা সম্পর্কে তারা কোম্পানি ও শিল্প সংগঠনগুলোকে সতর্ক করেছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে বলে সন্দেহ করা কয়েক ডজন বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে তারা কালো তালিকাভুক্ত করেছে।
ইউক্রেনের বাইরের পশ্চিমা কর্মকর্তারাও জাপান সরকারকে রুশ গোয়েন্দাদের প্রযুক্তি সংগ্রহের প্রচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সন্দেহের তালিকায় থাকা প্রোকোর মতো কোম্পানিসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গুপ্তচররা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পণ্য রাশিয়ায় পাঠাতে পারে, সে সম্পর্কেও তারা জাপানি কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়েছেন বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন।
যদিও ফিলচেনকভের বিরুদ্ধে জাপান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, তবে ইউক্রেনের প্রতি দেশটির সহানুভূতির অভাব নেই।
পুতিন ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর দিনই জাপান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে জাপান ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া শুরু করে। এর মধ্যে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পাঠানো।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দেশটি গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অবৈধ রপ্তানি ঠেকানো এবং গুপ্তচরদের কার্যক্রম প্রতিহত করা।
জানুয়ারিতে টোকিও পুলিশ জানায়, তারা এমন এক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তার সন্ধান পেয়েছে, যিনি ইউক্রেনীয় পরিচয় ব্যবহার করে জাপানের এক কর্মীর কাছ থেকে বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরি করার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে জাপানে গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কিত বিশেষ আইন না থাকায় পুলিশ ওই কর্মীর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করে।
এর আগেই ওই গুপ্তচর জাপান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকরা যখন দ্বিতীয়বার অ্যারোফ্লোটের কার্যালয়ে যান, তখনও ফিলচেনকভের দেখা মেলেনি। তার টেলিগ্রাম ও ই-মেইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তৃতীয়বার সেখানে গেলে দরজা খোলা ওই নারী তাকে ফোন করতে রাজি হন।
কার্যালয়ের ভেতরে বড় বড় ফাইল রাখার আলমারি ছিল। প্রতিটি আলমারির ওপর অ্যারোফ্লোটের বিমানের ছোট মডেল রাখা ছিল। জানালার ভেনেশিয়ান ব্লাইন্ড নামানো ছিল। সেখানে থাকা ওই নারীকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি ছাড়া আর কেউই কার্যালয়ে ছিলেন না।
রুশ ভাষায় কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলার পর তিনি ফিরে আসেন। তিনি জানান, ফিলচেনকভ কথা বলতে চান না।
