আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ গুম কমিশনের
দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সময়ে 'অপব্যবহার' করার বিষয়টি উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন। কমিশনের মতে, সেনাবাহিনীর কাজ সেনানিবাসে প্রশিক্ষণ নেওয়া ও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কেবল পুলিশের।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুম সংক্রান্ত কমিশনের কার্যক্রম ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমিশন প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এর আগে রোববার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'দেশের প্রত্যেকটি গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে 'নাক গলায়', কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়। তাদেরকে নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা মিডিয়া হাউজ দখল করা কি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইয়ের কাজ?'
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বের বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, 'পুলিশের কাজ হচ্ছে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টে থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল রপ্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাঁদের প্রত্যাহার করতে হবে। বরং পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে।'
গুম কমিশন তাদের প্রতিবেদনে র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) বিলুপ্তিরও সুপারিশ করেছে। কমিশন প্রধান বলেন, 'আগের সরকারগুলো এবং 'সদ্য বিদায়ী' সরকার, সবাই তাদের অপব্যবহার করেছে। তবে 'সদ্য বিদায়ী' সরকার অনেক বেশি করেছে। সেই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।'
তদন্তের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, কমিশনে দাখিল করা মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত হওয়ায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে বর্তমানে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের লাশ গুম পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, 'নিখোঁজ ব্যক্তিদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সব বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে।'
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে গুমের মতো কাজে যুক্ত করা হয়েছিল উল্লেখ করে কমিশন প্রধান জানান, তদন্তে মোট ৪০টি 'ডিটেনশন সেন্টার' বা বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে কমিশন, যার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টিই ছিল র্যাবের। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র্যাব সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংস করেছে।
