ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: যে সংঘাত শুরুর আগেই সতর্ক করেছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা
ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার কয়েক দিন আগে ওভাল অফিসে দেশের গোয়েন্দা প্রধানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রশ্ন করেন—ইরানের ওপর এই বড় ধরনের হামলা চালানো কতটা ফলপ্রসূ হবে?
তার আগে ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ইরান এই মুহূর্তে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তাই দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার এবং নিজেকে একজন "ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রনায়ক" হিসেবে তুলে ধরতে ট্রাম্পের জন্য এটাই সবচেয়ে মোক্ষম সুযোগ।
তাই গোয়েন্দা প্রধানের কাছে প্রশ্ন ছিল– এই ধরনের অভিযান সত্যিই কাজ করবে কিনা, অর্থাৎ, এভাবে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো সম্ভব কি-না?
সেই বৈঠকে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসী গ্যাবার্ড, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের কথা ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে জানান। এই আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের মতে, গ্যাবার্ড সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে—তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে আরও কট্টরপন্থীরা, যারা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকবে। এছাড়া তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা চালাবে, যা মিত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা ট্রাম্পকে জানান—এই যুদ্ধ মার্কিন বাহিনীর জন্য ব্যাপক হতাহতের কারণ হবে, অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আনবে এবং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।
কিন্তু এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন ট্রাম্প এবং ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানান। যে যুদ্ধ ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ছয় মাস পরও তার কোনো স্পষ্ট সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখনো দেশটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত পিতার জায়গায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিয়েছেন মোজতবা খামেনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার কোনোভাবেই ওয়াশিংটনের সামনে নতি স্বীকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পারমাণবিক চুক্তি না হলেও শুধু হরমুজ উন্মুক্ত করা সম্ভব হলেই ট্রাম্প 'জয়' ঘোষণা করে ইরান থেকে পিছু হটার কথা ভাবছেন।
ট্রাম্প এবার পারমাণবিক চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পরিবর্তে—ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ আরও কঠোর করার কৌশল গ্রহণ করেছেন, যাকে তিনি ইরানকে কাবু করার কৌশল বলে বর্ণনা করছেন।
এপর্যন্ত যুদ্ধকালীন অভিযানে আনুমানিক ৩,০০০ ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, আরও ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেলের রিজার্ভে টান পড়েছে এবং অস্ত্রাগার খালি হতে বসেছে। রাজনৈতিকভাবেও এটি ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা দিয়েছে; বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এখন তিনি নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওয়েলস বলেন, "তিনি কখনই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবেন না। ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।"
চলতি বছরের শুরুতে ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে গত বছরের জুনে চালানো হামলার পর—ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শক্তির আরও প্রদর্শন চেয়েছিলেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে পারমাণবিক চুক্তি অর্জনের পক্ষে ছিলেন, যা ব্যর্থ হলে কেবল সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের উপস্থাপন করা 'চূড়ান্ত' সামরিক পরিকল্পনার দিকেই ট্রাম্প ঝুঁকে পড়েন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রিসোর্ট মার-এ-লাগোতে এক অনুষ্ঠান চলাকালে— সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ও ট্রাম্পের ইরান বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ খবর আনেন যে ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। এতে ট্রাম্প উল্লসিত হলেও সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাসের বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়। সৌদি আরব ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানোর তাগিদ দিতে থাকেন।
এরপর চলতি বছরের জুন মাসে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও—তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত ১৭ আগস্ট পরমাণু আলোচনার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখন 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট'-এর মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল গ্রহণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া যুদ্ধ শুরু করার কারণেই আমেরিকা আজ এই কূটনৈতিক জটিলতায় আটকা পড়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের ওপর ভরসা করছেন, কিন্তু ছয় মাস পার হলেও সংঘাতের সমাপ্তি কোন পথে হবে—তা এখনো অস্পষ্ট।
