যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ‘বিধ্বংসী’ জবাব দেওয়ার হুমকি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর
ইরানি নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন প্রতিশ্রুতির জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। শুক্রবার ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হুমকির বিরুদ্ধে তাদের পাল্টা জবাব হবে অত্যন্ত 'বিধ্বংসী'।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সোমবার তিনি এই পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করবেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো দেশের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যারা 'ইরানকে যেকোনো ধরনের আর্থিক বা বাণিজ্যিক লাইফলাইন (সহায়তা) প্রদান করবে' তাদের কঠোর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
মার্কিন হুমকির জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট। ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাতে তিনি বলেন, 'স্থল, জল, আকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সাইবার স্পেসজুড়ে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুর যেকোনো নতুন হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর, শাস্তিমূলক এবং বিধ্বংসী জবাব দেবে।'
প্রায় ছয় মাস আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে সংকটের মুখে ফেলেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতেও উভয় পক্ষের নেতারা একে অপরকে পরাজিত করার দাবি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন হামলায় ইরানের অর্থনীতি ও তাদের প্রথাগত সামরিক বাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তেহরানের কাছে এখনও হরমুজ প্রণালীতে তেল ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত করার এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলা চালানোর মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাত করার জন্য ইরানি জনগণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা এখনও অর্জন করতে পারেননি। বরং এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় খোদ মার্কিন জনগণের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তার বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
আমেরিকার সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক ও দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্যালিবাফ বলেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে তারা জয়ী হতে পারবে না। প্রতিবেশি ইরাক সফরে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের এই অন্যায় নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার পরিকল্পনা করতে হবে যাতে আমরা এগুলো কাটিয়ে উঠতে পারি।'
তবে বৃহস্পতিবার ইরান ও ইরাকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে ক্যালিবাফ ইরানের অর্থনীতির ওপর চলমান চাপের বিষয়টি স্বীকার করেন। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে তিনি বলেন, 'আমাদের যতই সামরিক শক্তি থাকুক না কেন, দেশের মানুষ যদি ক্ষুধার্ত থাকে এবং আমাদের যদি পর্যাপ্ত আর্থিক লেনদেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় উৎপাদন না থাকে, তবে আমরা টিকে থাকতে পারব না।'
নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকির পর শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী সপ্তাহগুলোতে সরবরাহ আরও সংকীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট সিএনবিসি-কে বলেন, আগামী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নতুন নিষেধাজ্ঞার বিবরণ দেবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমরা এই ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে যাচ্ছি।' উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে ইরান ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছে, যার ফলে দেশটির সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং জ্বালানি সংকটের শিকার হচ্ছে।
তবে ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। বেসেন্ট বলেন, চীন তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির অর্ধেক উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পায়, তাই তাদের উচিত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। বৈশ্লেষিক প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কেনে চীন। ফলে বেইজিংয়ের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, 'নিষেধাজ্ঞা এবং চাপ প্রয়োগ কোনো সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে না' এবং তারা আলোচনার তাগিদ দিয়েছে।
এই দ্বন্দ্বে মার্কিন মিত্রদের ওপরও বড় ঝুঁকি রয়েছে। ইতিপূর্বে ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের কিছু জ্বালানি স্থাপনা এবং পানীয় জলের জন্য নির্ভরশীল লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
নিরাপদে জাহাজ চলাচলের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতিমধ্যে এপ্রিল ও জুনে দুইবার সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান ও ওমান আলাদা আলোচনা করছে, তবে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক আরোপের তীব্র বিরোধিতা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-যান চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখতে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন ন্যাটোর শীর্ষ মার্কিন কমান্ডার জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচ। তাঁর মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এটি কোনো অফিশিয়াল ন্যাটো মিশন নয়, তবে ন্যাটোর সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে তারা এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছে।
