নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আগে ইরানি মুদ্রার দরপতনে নতুন রেকর্ড, ১ ডলারে মিলছে ২০.২ লাখ রিয়াল
ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য সোমবার রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। এই একই সময়ে ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এসব নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যে আগের নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
মুদ্রাবাজারে লেনদেন শুরুর সময় এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম কমে ২০ লাখ ২০ হাজারে এসে পৌঁছেছে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল। তবে বাজারে প্রচলিত হারই ইরানের অধিকাংশ মানুষকে দিতে হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগেই দেশটির মুদ্রার ওপর চাপ ছিল। তখন ইরান দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি ও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে ছিল। তবে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে দেশটির অর্থনীতির ওপর আরও বড় ধরনের চাপ পড়ায় রিয়ালের মূল্য বারবার নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
ইরানের মানুষের জন্য প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা ক্রমেই অসাধ্য হয়ে উঠছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চালের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে এবং গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে।
তবে এখনো অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক চাপে রূপ নেয়নি। ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলা ও হামলার হুমকির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে এবং কংগ্রেসের নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে।
এর ফলে যুদ্ধটি এখন মূলত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে পরিবাহিত মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত। ইরান এখন বলছে, জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে না, যদি না জাহাজগুলোর কাছ থেকে এর জন্য অর্থ আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়।
ইরান ও হরমুজ প্রণালির অপর পাশে অবস্থিত ওমান জলপথটির যৌথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি পরিকল্পনায় সমঝোতায় পৌঁছানোর চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার ইরান সফর করবেন।
এই অচলাবস্থা ভাঙার চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার ঘোষণা করেছে, ইতোমধ্যে কার্যকর থাকা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় লিখেছেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে ধ্বংস করেছেন যে রিয়ালের মূল্য কখনো এত দুর্বল ছিল না এবং মূল্যস্ফীতিও খুব কম সময়েই এত বেশি ছিল।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'এখন ইরানি সরকারের শেষ আশ্রয় হলো এমন ভীত দেশগুলোর আত্মপ্রতারণা, যারা এখনো বিশ্বাস করে যে আগ্রাসনের সঙ্গে আপস করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।'
এরই মধ্যে গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার তেহরানে সাংবাদিকদের বলেন, 'এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে নিঃসন্দেহে এর পরিণতি খারাপ হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের হাত বাঁধা নেই।'
জুন মাসে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে মূল ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে আলোচনা করতে সোমবারে ইরানে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে বলে দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
মধ্য তেহরানে, ৭৩ বছর বয়সী সাদেক মাহমুদি সমাধানের কোনো আশা দেখছেন না। তিনি তার অবশিষ্ট সঞ্চয় দিয়ে আরও দরপতন থেকে রক্ষা করতে মার্কিন ডলার কিনতে প্রায় এক ডজন মানুষের সাথে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, 'কোনো সমঝোতা বা শান্তির আশা নেই।'
