দিনে ৩৩৮ শব্দ কম বলছি আমরা, মানুষ কি তবে চিরতরে নিশ্চুপ হয়ে যাবে?
কয়েক বছর আগেও কোনো গলি বা মফস্বলের পাড়ায় সকালবেলা কাজে বের হলে কত মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় হতো। ফার্মেসি, মুদির দোকান বা কাঁচাবাজারে বেচাকেনা কিংবা রিকশা খোঁজার মাঝেই জমে উঠত টুকটাক আলাপ। খুব বিশেষ কোনো কথাবার্তা না হলেও পাড়াতুতো এসব কথোপকথনের মধ্যেই বেঁচে থাকত সামাজিক বন্ধন ও এক ধরনের আপন অনুভূতি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নতুন একটি এলাকায় থেকেও সেই আমেজ আজকাল আর পান না অনেকেই।
এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে দ্য টেলিগ্রাফের ফিচার লেখক মেলিসা টুইগ দায়ী বলে মনে করছেন স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধার পেছনে ছোটাকে। তিনি নিজে ব্যাংকের কাজ অনলাইনে করেন, টাটকা পাউরুটি কেনেন অনলাইন ডেলিভারি ওয়েবসাইট থেকে, আর টেসকো বা বুটস-এ গেলে সেলফ-সার্ভিস কাউন্টারে নিজেই বিল মিটিয়ে নেন। তবে কিছু বিষয় অভ্যাসেও পরিণত হয়ে গেছে। মেলিসা হাতে ফোন আর কানে পডকাস্টের বিনোদনে এতটাই অভ্যস্ত যে, লাইনে দাঁড়িয়ে আবহাওয়া নিয়ে দু-একটি কথা বলার জন্য কখনোই আর পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান না।
এর পরিণতি বেশ করুণ বলে মনে করেন তিনি—নিজের পরিচিত চারপাশ থেকেও আজকাল নিজেকে যেন একদম বিচ্ছিন্ন মনে করেন।
সম্প্রতি 'পারসপেক্টিভস অন সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে এমন তথ্য। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক কম কথা বলছে, আর এর সরাসরি ধাক্কা গিয়ে পড়ছে আমাদের সামাজিক যোগাযোগের ওপর।
মিসৌরি-কানসাস সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ ভ্যালেরিয়া ফাইফার এবং অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথিয়াস মেহল ১৫ বছর ধরে এই বিশদ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তারা ইউরোপ ও আমেরিকার হাজার হাজার মানুষের ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। এ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১০ থেকে ৯৪ বছর। তাদের সারাদিনের কথাবার্তা রেকর্ড করার জন্য সাথে দেওয়া হয়েছিল একটি ছোট্ট যন্ত্র—যাকে বলা হয় 'ইলেক্ট্রনিক্যালি অ্যাক্টিভেটেড রেকর্ডার' বা ইএআর।
২০০৫ সালে গবেষণায় অংশ নেওয়া একেকজন মানুষ দিনে গড়ে ১৬,৬৩২টি শব্দ বলতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে গবেষণাটি যখন শেষ হয়, ততদিনে সেই সংখ্যাটি নেমে দাঁড়ায় ১১,৯০০-তে। পুরো সময় জুড়ে কথা বলার পরিমাণ কমেছে ২৮ শতাংশ, যার অর্থ আমরা প্রতি বছর দিনে গড়ে ৩৩৮টি করে শব্দ হারিয়ে ফেলছি! অর্থাৎ, প্রতি বছর আমরা তার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শব্দ কম বলছি।
ফাইফার ও মেহলের গবেষণা বলছে, অন্য যে কোনো আলাপের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের হাঁকডাক ও টুকটাক ছোটখাটো কথাবার্তাই সবচেয়ে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মেহল বলেন, 'যে কথোপকথনগুলো সবচেয়ে বেশি কমছে, তা হলো পথে-ঘাটে বা কাজে বের হয়ে চেনা কিংবা অচেনা মানুষের সঙ্গে হওয়া হঠাৎ আলাপগুলো। এদিক-সেদিক হওয়া এই ক্ষণিক কথাবার্তাগুলোই সমাজে আমাদের একটি নিজস্ব জায়গা বা আপনত্বের অনুভূতি দিত।'
তারা যদি কোভিড-পরবর্তী বছরগুলোতেও এ গবেষণা চালিয়ে যেতেন তবে এই সংখ্যা যে আরও বহুগুণ নিচে নেমে যেত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ফাইফার বলেন, 'এর প্রধান অপরাধী নিশ্চিতভাবেই প্রযুক্তি।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের গবেষণার সময়কালের সাথে মিলে যায় স্মার্টফোনের প্রসার এবং মেসেজিং অ্যাপগুলোর জনপ্রিয়তার বিষয়টি। পাশাপাশি এমন সব অ্যাপের ব্যবহার বেড়েছে যেগুলো মানুষের সাথে দৈনন্দিন মেলামেশার সুযোগকেই ছাঁটাই করে দিচ্ছে।'
উদাহরণ হিসেবে তিনি জিপিএস-এর কথা তুলে ধরেন, যে কারণে দিক চেনার জন্য এখন আর কোনো অপরিচিত মানুষের কাছে পথ জিজ্ঞেস করতে হয় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অফিসের কাছের স্টারবাক্স কফি শপের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে এখন আর সরাসরি গিয়ে কফি কেনার কোনো সুযোগ নেই, কারণ দোকানটি পুরোটাই অনলাইন অর্ডারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
তবে রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করা, এক কাপ কফি কেনা, অভ্যর্থনাকারীর সাথে কথা বলা বা কোনো কথা না বলেই ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলার মতো বিষয়গুলোর পরিণাম আমাদের অনেকের ধারণার চেয়েও সুদূরপ্রসারী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী রবিন ডানবার বলেন, 'এটি একটি বড় সমস্যা, কারণ মুখোমুখি যোগাযোগের মাঝে বিশেষ কিছু আছে যা আমরা হারাচ্ছি।' তিনি এমন এক গবেষণা করেছেন যেখানে দেখা গেছে হাসি কীভাবে এন্ডোরফিন হরমোনের নিঃসরণ ঘটিয়ে ব্যথা ও বিষণ্নতা দূর করতে সাহায্য করে।
তিনি আরও বলেন, 'অবশ্যই, আপনার প্রিয়জনদের সাথে কথপোকথন আপনাকে সবচেয়ে বেশি সুখী করে, তবে এমন যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে পরিচিত বা আধা-পরিচিতদের সাথে রাস্তায় চলতে চলতে খুব সাধারণ একটি কথোপকথন থেকেও আপনি এক ধরনের আনন্দ পান; মূলত এটি বন্ধনকে ফুটিয়ে তোলে, যা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
একইভাবে, ডিজিটাল প্রযুক্তি—যেমন টেক্সট মেসেজ বা ইমোজি—আমাদের পরিচিতদের সাথে ক্যাজুয়াল বা সাধারণ কথোপকথনের ক্ষেত্রে বেশ ভালো বিকল্প হতে পারে, কিন্তু নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি ততটা সফল নয়। কারো মুখের অভিব্যক্তি ও কণ্ঠস্বরের সূক্ষ্ম ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করার কোনো তুলনাই হয় না—আর এছাড়া গভীর বোঝাপড়া তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
অপরিচিতদের সাথে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া আমাদের নিরাপদ বোধ করায়
বিখ্যাত বিবিসি চিত্রনাট্যকার এবং রেডিও ফোরের 'দ্য আর্চার্স'-এর শত শত পর্বে কাজ করা কেটি হিমস বলেন, 'মানুষের একে অপরের সাথে কথা বলার ভঙ্গিটি সত্যিই ভীষণ আকর্ষণীয়। কিছু মানুষ এত সরাসরি কথা বলে যে তা প্রায় ভয়ের উদ্রেক করে, আবার কিছু মানুষ নির্যাতন চালালেও তাদের চাহিদা মুখ ফুটে বলতে পারে না। দীর্ঘ বিরতি বা আকস্মিক হাসির মাঝে যে গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকে, লিখিত বার্তা বা ইমোজি সেটির স্থান দখল করতে পারে—এই ধারণাটি আমার কাছে একেবারেই অর্থহীন মনে হয়। কথোপকথনের মাধ্যমে আপনি তাৎক্ষণিকভাবে চরিত্র, পরিস্থিতি এবং সময় ও পরিবেশের এক অদ্ভুত অনুভূতি পেয়ে যান, যা যোগাযোগের অন্য কোনো মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব।'
অ্যামব্রিজের বাসিন্দাদের জন্য কেবল সংলাপের মাধ্যমে বছরের পর বছর ব্যক্তিত্ব ও প্লট তৈরি করার পর, হিমস এটিও লক্ষ্য করেছেন যে আপাতদৃষ্টিতে ভুলে যাওয়ার মতো সাধারণ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের সম্পর্কে যতটা বুঝতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশ করে ফেলি।
হিমস বলেন, 'ছোটখাটো কথোপকথনের সাধারণ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমি ভীষণ উৎসাহী, কারণ আপনি যদি একটু মন দেন, তবে এগুলো আপনাকে দারুণ এক রোমাঞ্চ এনে দিতে পারে।'
তিনি একটি ঘটনার কথা বলেন, যেখানে ওয়েট্রোজ-এ থাকার সময় একজন ক্যাশিয়ার সেদিনের তারিখটি একটি প্যালিন্ড্রোম (সামনে বা পেছন থেকে পড়লে একই হয়, যেমন 20.02.2002) হওয়া নিয়ে কিছু একটা বলেছিলেন। হিমস বলেন , 'আমরা বিষয়টি নিয়ে বেশ মেতে উঠলাম, এবং যখন আমি চলে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি আমাকে ফ্লাইং কিস দিলেন। এটি তুচ্ছ কিছু একটা হতে পারত, কিন্তু তা ছিল না; আর যখন কেউ সাধারণ কথোপকথন থেকে সামান্য বেরিয়ে এসে আপনার সাথে কথা বলে, তখন আমার তা দারুণ লাগে।'
মানুষ এক জটিল প্রজাতি, যারা গভীরভাবে তৃপ্তি পেতে চায় অথচ তা অর্জনে ভীষণভাবে ব্যর্থ। একের পর এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমাদের অনেকেই এখন কথা বলার এই ছোট ছোট সুযোগগুলোকে এড়িয়ে চলে, অথচ এগুলোর মাধ্যমেই আমরা উপকৃত হতে পারি।
২০১৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় একটি পরীক্ষা চালায় যা দেখায়, আমরা কতটা ধারাবাহিকভাবে অপরিচিতদের সাথে কথা বলার আনন্দকে কম মূল্যায়ন করি। একদল লোককে ট্রেনে ভ্রমণের জন্য পাঠানো হয়েছিল—অর্ধেক লোককে চুপচাপ খবরের কাগজ পড়তে বলা হয়েছিল, আর বাকি অর্ধেককে অন্য যাত্রীর সাথে কথোপকথন শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আগে থেকেই প্রায় সবাই অনুমান করেছিল যে অপরিচিত কারো সাথে কথা বলা একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হবে, কিন্তু বাস্তবে যে দলটি কথা বলেছিল তারা জানিয়েছিল তাদের ভ্রমণ অনেক বেশি উপভোগ্য হয়েছিল।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার, যিনি সুখের ওপর বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী গবেষণার তদারকি করেছেন, তিনি বলেন, 'ঠিক যেমন আমাদের পেট খাবার পেলে মস্তিষ্ক আমাদের আনন্দের অনুভূতি দিয়ে পুরস্কৃত করে, তেমনি অন্যের সাথে সামান্য হলেও যোগাযোগ হলে মস্তিষ্ক একই প্রতিক্রিয়া দেখায়। অপরিচিতদের সাথে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া আমাদের শরীরকে জানান দেয় যে আমরা নিরাপদ আছি, যা আমাদের শারীরিক উত্তেজনা কমায় এবং কল্যাণের অনুভূতি বাড়ায়।'
অথচ আমরা প্রায়ই এটিকে প্রত্যাখ্যান করি। কর্মচারীদের অফিসে ভালো বন্ধু থাকলে তারা যে বেশি সুখী হন, তা প্রমাণিত হলেও তারা এমন চাকরি নিয়মিত ফিরিয়ে দেন যা বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ দেয় না। এমনকি তারা অফিসে থাকলেও অনেকে সহকর্মীর টেবিলে হেঁটে যাওয়ার বদলে গুগল চ্যাট, টিমস বা স্ল্যাক-এর মাধ্যমে বার্তা পাঠান—এতে কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগই হাতছাড়া হয় না, বরং স্পষ্ট বা আরও স্বচ্ছন্দ কথোপকথনের সুযোগও হারায় যা আরও ভালো সহযোগিতার পথ দেখাতে পারে।
একইভাবে, আমরা যদি প্রতিবেশীদের চিনি এবং তাদের সাথে কথা বলি, তবে আমাদের এলাকা নিজেদের অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু আমাদের অনেকেই যে ঘনিষ্ঠ সমাজে বড় হয়েছি তা ছেড়ে বড় এবং আরও ক্ষণস্থায়ী শহরে বসবাস করতে যাই, যেখানে সাধারণ কথোপকথনের ধারণাই ভীতিকর বলে মনে হতে পারে।
ডানবার বলেন, 'আমরা কোনো একভাবে ঠিক করেছি যে আগের মতো রাস্তার ধারে জীবন কাটানোর চেয়ে চার দেয়ালের মধ্যে একা বসবাস করা ভালো। নারীরা আগের মতো সামনের সিঁড়িতে বসে গল্প করে না, পুরুষরাও আগের মতো স্থানীয় কোথাও একত্র হয় না এবং রাতের খাবারের পর শিশুরা একসাথে ফুটবল খেলে না। দূরে থাকা বন্ধুর সাথেও মূলত টেক্সটের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়।'
আশ্চর্যজনকভাবে, এই নীরব নতুন বাস্তবতা তরুণদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে। জেনারেশন জেড বা জেন-জি অনেক দিক থেকেই অত্যন্ত যোগাযোগপ্রিয়। তারা ক্রমাগত টেক্সট করছে, ডিএম পাঠাচ্ছে, ভয়েস নোট দিচ্ছে, ইমোজি শেয়ার করছে এবং স্ন্যাপচ্যাট করছে।
কিন্তু তারা কোনো ছাত্রাবাসে আড্ডা দেওয়া কিংবা কেবল সময় কাটানোর জন্য পার্ক বা শহরের কেন্দ্রস্থলে জমায়েত হচ্ছে না। ফাইফার-মেহল গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫ বছরের কম বয়সীরা অন্যদের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ৪৩১টি শব্দ কম ব্যবহার করে। যেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে এই হ্রাসের পরিমাণ ৩১৪টি শব্দ।
ডানবারের মতে, 'এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পৃথিবী একটি জটিল, অপ্রত্যাশিত এবং অস্থিতিশীল জায়গা, এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে প্রাপ্তবয়স্কদের মিথস্ক্রিয়ার দক্ষতা শিখতে জীবনের প্রায় ২৫ বছর সময় লাগে—আর তরুণরা সেই অনুশীলনীটুকুই পাচ্ছে না, যার ফলে তারা নিজেদের ভীষণ একা অনুভব করতে পারে এবং কীভাবে সামনে এগোবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে পারে।'
তরুণ প্রজন্মের কথা বলার ধরনেও ইন্টারনেট যুগের প্রভাব পড়েছে এবং পরিবর্তন এসেছে। হিমস বলেন, 'আমার মনে হয় সংলাপে এখন আরও বেশি সংক্ষিপ্ত রূপ বা শর্টহ্যান্ড ব্যবহার করা হয়, ফলে কথোপকথন কিছুটা টেক্সটের মতো হয়ে যায়।' যেমন, ইউটিউব বা টিকটকে সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হওয়ায় 'আই রিয়েলি লাভ দিস' কথাটি সংক্ষেপে 'লাভ ইট' হয়ে যায়, কারণ সেখানে একটি নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহৃত হয় যা অত্যন্ত পরিমিত ও সংক্ষিপ্ত।
এর পাশাপাশি রয়েছে জেন-জি স্টেয়ার। ধারণা করা হয়, বিশের কোঠার তরুণ-তরুণীদের কোনো প্রশ্ন করা হলে উত্তরে কেবল একটি শূন্য দৃষ্টি মেলে—আর ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভাষাবিজ্ঞানী কার্স্টি কিং বিশ্বাস করেন যে অনলাইনে কাটানো শৈশব-কৈশোর তাদের এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে শিখিয়েছে যখন তারা কী বলবে তা বুঝতে পারে না। তিনি বলেন, "আরেকটি যুক্তি হলো এটি তাদের মিথস্ক্রিয়ায় ধীরগতির করে তুলেছে, যা ইঙ্গিত করে যে তারা আসলে এক ধরনের প্রক্রিয়াধীন মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের কণ্ঠস্বরে প্রচুর তথ্য লুকিয়ে থাকে
এটি কেবল কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় যে তারা কথা বলার শিল্প ভুলে গেছে। বরং আমরা সবাই আমাদের অবসর সময়ের একটি বড় অংশ পডকাস্টে অন্যের আড্ডা শুনে কাটাচ্ছি, অথচ নিজেরা ফোনে কথা বলছি অনেক কম। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনে কথা বলার মোট সময় ২০১৪ সালের ২২৯ বিলিয়ন মিনিট থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৭৬ বিলিয়ন মিনিটে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে, ভয়েস নোটের জনপ্রিয়তা—হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় সাত বিলিয়ন ভয়েস নোট পাঠানো হয়—একমুখী কথার (অ্যাসিনক্রোনাস মনোলোগ) এক নতুন রূপ তৈরি করেছে।
হিমস বলেন, 'এটি বেশ আত্মকেন্দ্রিক (সলিপসিস্টিক), কারণ কেউ উত্তর দিচ্ছে না এবং আপনি স্বাভাবিক কথোপকথনের চেয়ে অনেক কম শব্দ ব্যবহার করছেন। একজন লেখক হিসেবে মাঝেমধ্যে ভয়েস নোট ব্যবহার করতে আমার ভালো লাগে, কিন্তু যেহেতু এতে কোনো আদান-প্রদান বা বাকবিতণ্ডা নেই, তাই এটি দেয়ালের সাথে টেনিস বল ছোড়ার মতো—কিছুক্ষণ হয়তো আনন্দদায়ক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশ অতৃপ্তিকর।'
একইভাবে, আমাদের সামাজিক জীবনকে অতিরিক্ত মাত্রায় অনলাইনমুখী করে তোলা—বিশেষ করে নতুন বন্ধু বা সঙ্গী খোঁজার কাজটিকে ডিজিটাল দুনিয়ার হাতে সঁপে দেওয়া—নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর ফলে আমরা মানুষের মন পড়ার বা মানুষকে বোঝার ক্ষমতা হারাচ্ছি। 'দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব লাইজ' বইটির লেখক কিং উল্লেখ করেন যে, রোমান্স স্ক্যামার বা প্রেমের ফাঁদ পাতার প্রতারকরা শত শত বছর ধরে সক্রিয় থাকলেও বর্তমান সময়ের মতো এত বেশি সফল তারা আগে কখনো হয়নি।
কিং বলেন, 'কী বলা হচ্ছে তার চেয়ে কীভাবে বলা হচ্ছে তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই যখন আমরা প্যারাভার্বাল বা বাকসংক্রান্ত ভঙ্গিগুলো হারিয়ে ফেলি, তখন কণ্ঠস্বর, স্বরের উচ্চতা বা ওঠানামার মাধ্যমে যে সমস্ত তথ্য আদান-প্রদান হয়, তা আমরা হারাই। ফলে কেউ কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে কি না, দ্বিধায় পড়ছে কি না, কিংবা তার কণ্ঠে কর্তৃত্ব বা সৌহার্দ্য প্রকাশ পাচ্ছে কি না—তা আমরা বুঝতে পারি না। এর ফলে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে যাই।'
এর বাইরেও কিং আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আমরা যখন অপরিচিতদের সাথে কথা বলায় কম অভ্যস্ত হয়ে পড়ব—এবং এর ফলে যোগাযোগের সাধারণ নিয়মগুলো বজায় রাখতে কম সক্ষম হব—তখন আমরা যেকোনো অপরিচিত মানুষকে নিয়ে আরও বেশি ভয় পেতে শুরু করব।
তিনি বলেন, 'মূলত, আমাদের তাৎক্ষণিক পরিচিত পরিবেশের বাইরের মানুষগুলোকে আমরা আর বিশ্বাস করব না। ছোটখাটো ও ঝুঁকিমুক্ত এই মিথস্ক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে আমাদের ক্রমাগত যোগাযোগশিল্পের প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন এবং এই মর্মে সচেতন হওয়া দরকার যে বেশিরভাগ মানুষই পরোপকারী। যদি তা না ঘটে, তবে আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে আরও অনেক বেশি সন্দেহপ্রবণ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।'
আমরা প্রায়শই মনে করি সভ্যতা বুঝি মহান বক্তৃতা, অলংকারশাস্ত্র এবং গভীর সব আলাপচারিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এটি এমন শত শত ক্ষুদ্র মৌখিক আদান-প্রদানের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল, যেগুলো এতই তুচ্ছ মনে হয় যে এগুলো হারিয়ে গেলেও আমরা তা টেরই পাই না। কিন্তু আমাদের সমাজ ২০ বছর পর কেমন হবে— হিসাব অনুযায়ী তখন আমরা প্রতি বছর আড়াই মিলিয়ন শব্দ কম ব্যবহার করব।
