‘গোদি মিডিয়া’ তকমা: ভারতে বিক্ষোভকারীদের রোষানলে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা
ভারতের ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেও এখনও বিক্ষোভ চলমান। আর এই বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে খোদ আন্দোলনকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভারতের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরকারের 'লেজুড়বৃত্তি' করছে এবং জনগণের প্রকৃত সমস্যা আড়াল করছে।
গত সপ্তাহে মোদিবিরোধী এক বিশাল বিক্ষোভ কভার করতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন টেলিভিশন সাংবাদিক দেব কোটাক। ভারতের প্রভাবশালী চ্যানেল 'টাইমস নাউ'-এর এই সংবাদকর্মী সরাসরি সম্প্রচার শুরু করতেই আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ধরে 'গোদি মিডিয়া' (সরকারের কোলের ওপর থাকা সংবাদমাধ্যম) বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী তাকে মারধর করেন। এই লাঞ্ছনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ৩৬ বছর বয়সী কোটাক বলেন, 'উত্তেজিত জনতা আমাকে মেরেই ফেলত হয়তো। তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ কাজ করছিল, কারণ তারা মনে করে মিডিয়া তাদের পক্ষের কথা বলছে না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাকে চড়, লাথি ও ঘুষি মারা হয়েছে, পানির বোতল ছোড়া হয়েছে। আমি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম।'
গত সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জের পর জনরোষ আরও তীব্র হয়। কোটাক জানান, বিক্ষোভকারীরা বারবার অভিযোগ করছিল যে সংবাদমাধ্যম তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা তুলে ধরছে না। যদিও কোটাক দাবি করেছেন, তিনি উভয় পক্ষের আহতের খবরই প্রচার করেছেন। এই বিষয়ে টাইমস নাউ-এর প্রধান সম্পাদক নাভিকা কুমার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এই আক্রমণ ভারতে গণমাধ্যমের ক্রমহ্রাসমান স্বাধীনতার চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। 'রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স'-এর বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে ২০১০ সালে ১২২তম স্থানে থাকা ভারত ২০২৬ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৭তম স্থানে নেমে এসেছে। সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের মালিকানায় সংবাদমাধ্যমের কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে এই পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার বিজয়ী রবীশ কুমার 'গোদি মিডিয়া' শব্দটি জনপ্রিয় করেছেন। তিনি বলেন, 'গোদি মিডিয়া হচ্ছে গণতন্ত্রবিরোধী ও জনবিরোধী। তারা বিরোধীদের ভিলেন হিসেবে তুলে ধরে এবং সমালোচকদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে। এদের কাজ এখন কেবল সরকারের গুণগান করা।'
এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা 'ককরোচ জনতা পার্টি'র মুখপাত্র দীপক বালিয়ান বলেন, তারা বিক্ষোভকারীদের বারবার অনুরোধ করেছেন সাংবাদিকদের সাথে খারাপ আচরণ না করতে। তিনি বলেন, 'আমরা চাই তারা তাদের কাজ করুক। কেউ যেন অপদস্থ না হয় তা নিশ্চিত করতে চাই।'
ডিজিটাল সংবাদ প্ল্যাটফর্ম 'নিউজ লন্ড্রি'-র সম্পাদকীয় পরিচালক মনীষা পাণ্ডে মনে করেন, মূলধারার টেলিভিশনের প্রতি বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অনাস্থাই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, '২০১৪ সালের পর সংবাদমাধ্যমের ধরনে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে; তারা এখন গণবিরোধী অবস্থানে চলে গেছে।'
সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানের জনপ্রিয় ইউটিউবার আকাশ ব্যানার্জি বলেন, 'মূলধারার সংবাদমাধ্যম সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষ এখন বিকল্প ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে। এখন একজন সাংবাদিককে আর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় না, তাকে মনে করা হয় জনগণের দুঃখ-কষ্টের প্রতি উদাসীন একটি শক্তিশালী ব্যবস্থার মুখ।'
এদিকে, এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, 'পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে এবং সমাজের কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।'
সাংবাদিক পেটানোর এই ঘটনায় ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা ক্ষমতাসীন বিজেপি এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
