সাইডলাইনে থাকলেও ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে ইসরায়েল। একইসঙ্গে এই যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় সামরিক ও কার্যকরী পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে। তবে তিনটি ইসরায়েলি সূত্রের মতে, তারা আপাতত মাঠের বাইরে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং এই মুহূর্তে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার মতো কোনো জরুরি পরিকল্পনা তেল আবিবের নেই।
চলতি জুলাইয়ের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে ইরান হামলা চালানোর পর নতুন করে লড়াই শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে সূত্রগুলো জানায়, নতুন দফার লড়াইয়ে সরাসরি অংশ নেয়নি ইসরায়েল। এছাড়া ওয়াশিংটনও এ পর্যন্ত তেল আবিবকে এই সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার অনুরোধ করেনি। তবে সূত্রের একজন জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হামলা বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ইসরায়েলকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তাহলে "আমরাও প্রস্তুত থাকব।"
অন্য আরেকটি সূত্রের বরাতে জানা যায়, ইরানের সাথে উদ্ভূত সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে সোমবার রাতে এক নিরাপত্তা বৈঠক আয়োজন করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উক্ত বৈঠকে এমন কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় যার মাধ্যমে ইসরায়েল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে– ওয়াশিংটনের অনুরোধে যোগ দেওয়া, ইরানের কোনো পদক্ষেপের ফলে ইসরায়েলি পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়া, অথবা আসন্ন কোনো বড় হুমকি বানচাল করতে [ইরানে] ইসরায়েলের আগাম আক্রমণ চালানো।
রোববার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির সামরিক বাহিনীর এই প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, "আমরা অবিলম্বে লড়াইয়ে ফিরে আসার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আমাদের ক্ষতি করবে এমন যে কারও বিরুদ্ধে আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে ব্যবস্থা নেব।"
সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও, একটি সূত্র জানিয়েছে যে ইসরায়েল বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে। তারা কোনো সংঘাতের মাঝখানে না জড়িয়ে নিষ্ক্রিয় থাকতে চায়; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একে অপরকে আঘাত করতে থাকবে এবং পরমাণু চুক্তি হওয়া থেকে দূরে থাকবে, অন্যদিকে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বেড়ে চলবে। অর্থাৎ, এই পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের জন্য অনুকূলই মনে করা হচ্ছে, যেখানে ইরানের শক্তিসামর্থ্যের ক্ষয় ঘটায় সন্তষ্ট তেল আবিব।
এদিকে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা বিষয়ক পরামর্শসভায় অংশ নেওয়া ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ আজ মঙ্গলবার বলেছেন, "এই মুহূর্তে এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার মতো কোনো আগ্রহ ইসরায়েলের নেই।" একটি সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্মোৎরিচ বলেন, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সীমিত সংঘাত ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করছে, কারণ এটি ইরানি শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরানের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কথা উল্লেখ করে স্মোৎরিচ বলেন, "এই শাসনের পতন ঘটানোর সর্বোত্তম উপায় হলো এদের অর্থনৈতিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া। সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে রয়েছে এবং নিজেদের এতে ঠেলে দেওয়ার কোনো আগ্রহ আমাদের নেই।"
একটি সূত্রে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নিজস্ব মূল্যায়ন হলো—সম্প্রতি ইরানের ভেতরের বিভিন্ন সেতুতে মার্কিন হামলা দেশটির পরিবহন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। সূত্রটি জানায়, "ইরানি অর্থনীতি ধসে পড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত এটি ওই শাসনব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলবে।" অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য এর আগেও গত জানুয়ারিতে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল, আর ইসরায়েল এই অর্থনৈতিক সংকটকে ইরানি কর্তৃপক্ষের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে হামলা বেড়ে যাওয়া এবং তার ফলে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে ইসরায়েলের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেড়েছে। তবে চিত্রটি এখনও রূপান্তরশীল, কারণ এই সংকট প্রশমনে আঞ্চলিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাগুলোকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে ইসরায়েল। ওই কর্মকর্তা বলেন, "পরিস্থিতি বেশ গতিশীল।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কিছু ব্যক্তি বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে এখনো কূটনীতির পক্ষে জোর দিচ্ছেন।
অন্য একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েল যদি শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে যোগ দেয়, তবে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার চেষ্টা করবে—বিশেষ করে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো। মার্চ মাসের অভিযানের সময় থেকেই ইসরায়েল এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে চেয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্পের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, "এগুলো এমন সব লক্ষ্যবস্তু যা যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। তবে এই ধরনের হামলা আবার পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং জ্বালানি তেলের দামের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে, যা এ পর্যন্ত আমেরিকানরা নিতে চায়নি।"
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, সূত্রগুলো জানায় যে নেতানিয়াহু কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পের সাথে সরাসরি এক বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করছেন। তবে সেই বৈঠকের এখনও কোনো দিনক্ষণ ঠিক করা যায়নি। ইরানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগের সময়, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে এই দুই নেতার মুখোমুখি দেখা হয়নি, যদিও তারা নিয়মিত ফোনালাপ করেছেন। একটি সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের কথা ভাবছেন নেতানিয়াহু এবং সেই সফরের সুযোগেই ট্রাম্পের সাথে বৈঠকটি সেরে ফেলার চিন্তা করছেন।
