প্রথমবারের মতো আত্মঘাতী ‘কামিকাজে ড্রোন বোট’ দিয়ে ইরানের নৌঘাঁটিতে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানবহীন 'কামিকাজে ড্রোন বোট' বা আত্মঘাতী সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিতে সফল হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত রবিবার হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত ইরানের বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটির সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে তিনটি ড্রোন বোট দিয়ে এই হামলা চালানো হয় বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর সমুদ্র ড্রোন ব্যবহারের এটিই প্রথম ঘটনা। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার অংশ হিসেবে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, তুলনামূলক ধীরগতির কিন্তু অত্যন্ত প্রাণঘাতী একটি ড্রোন বোট ইরানি নৌবাহিনীর প্রধান সদর দফতর বন্দর আব্বাস ঘাঁটির জেটির দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। এটি জেটির গায়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই সেখানে একটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। সেন্টকম এই মিশনটিকে 'সফল' বলে বর্ণনা করেছে।
মার্কিন বাহিনীর এই হামলা মূলত কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পরিচালিত সামরিক অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইউক্রেনই প্রথম রুশ যুদ্ধজাহাজগুলোকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কম খরচের কামিকাজে সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করে নৌ-যুদ্ধের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছিল। কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের অভাবনীয় সাফল্যের পর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোও এই ধরনের মানবহীন যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র গত মার্চ মাসে প্রথম টেক্সাস-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান 'সায়রোনিক টেকনোলজিস'-এর তৈরি 'সায়রোনিক করসেয়ার ইউএসভি' তাদের বহরে যুক্ত করে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার অংশ হিসেবে এটি মোতায়েন করা হয়েছিল।
সেন্টকম জানিয়েছে, 'তিনটি করসেয়ার ড্রোন বোট বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী কর্তৃক সি-ড্রোন ব্যবহারের এটিই প্রথম ঘটনা। এই হামলার ফলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ইরানের নৌ-সক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।'
এর আগে গত মাসে ওমান উপসাগরে ইরানের হামলায় একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই মডেলের ড্রোন বোটটিই সফলভাবে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়া দুই মার্কিন পাইলটকে উদ্ধার করেছিল। এটি ছিল কোনো স্বায়ত্তশাসিত সামুদ্রিক যান দ্বারা মার্কিন বাহিনীর প্রথম উদ্ধার অভিযান।
২৪ ফুট দীর্ঘ এই সায়রোনিক করসেয়ার ড্রোন বোটটির সর্বোচ্চ গতি ৩৫ নটস (ঘণ্টায় ৪০ মাইল) এবং এটি ১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বিস্ফোরক বা পেলোড বহন করতে পারে। প্রায় ১ হাজার নটিক্যাল মাইল পাল্লার এই ড্রোন বোটটি দূরপাল্লার নিখুঁত হামলায় অত্যন্ত কার্যকরী।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে, যা যুদ্ধ অবসানের চলমান আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা।
গত সপ্তাহের শেষে তেহরান ঘোষণা করেছিল যে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্বীকার করেছিলেন।
তবে গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন অবস্থান নিয়ে ঘোষণা করেন যে, তিনি ইরানের ওপর আবারও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবেন এবং এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত জাহাজের ওপর একটি 'ফি' বা টোল ট্যাক্স ধার্য করবেন। এটি মূলত ট্রাম্পের আগের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে তিনি এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি সবার জন্য উন্মুক্ত ও টোলমুক্ত রাখার পক্ষে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন।
দুই দেশের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি হামলা সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিচ্ছে, যা স্থায়ী শান্তি চুক্তির চলমান প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।
সোমবার ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, 'যুক্তরাষ্ট্রকে কখনোই এই আন্তর্জাতিক নৌপথের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।'
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাও (আইএমও) ট্রাম্পের এই টোল ট্যাক্স প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলোতে যেকোনো ধরনের ফি বা টোল ধার্যের বিরোধী। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ধরনের প্রণালি পারাপারে বাধ্যতামূলক টোল আদায়ের কোনো আইনি ভিত্তি আন্তর্জাতিক আইনে নেই।
