ট্রাম্পের কাছে এরদোয়ানকে নিয়ে 'নালিশ' নেতানিয়াহুর, তুরস্কের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে মানা করলেন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন, তুরস্কের বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণে সহায়ক হতে পারে— এমন অস্ত্র বা সামরিক প্রযুক্তি বিক্রির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহু এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চলতি সপ্তাহে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের কথা রয়েছে। সেখানে তার এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকেরও কথা রয়েছে।
গত দুই বছরে গাজা ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে ট্রাম্প উভয় নেতার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর প্রভাব কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে এবং তার রাজনৈতিক জোটের মধ্যেও মতভেদ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাব কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং তুরস্কে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
ট্রাম্প সোমবার ন্যাটো নেতাদের সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কে যাচ্ছেন। সেখানে তুরস্কের যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ৭০ কোটি ডলারের নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ চুক্তি এবং দেশটির পুনরায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বহিষ্কার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, এস-৪০০ ব্যবস্থার কারণে এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে জানান, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাতে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করা যেতে পারে, তা খতিয়ে দেখছে পেন্টাগন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে এ ধরনের বিক্রির জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
নেতানিয়াহুর দৃষ্টিতে সম্ভাব্য এ অস্ত্র বিক্রি তুরস্ক সরকারের ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গত সপ্তাহে এরদোয়ান জায়নবাদকে 'গণহত্যার মতাদর্শ' বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, এটি তুরস্কের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি। এরপর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইসরায়েল সরকারকে 'মানবজাতির জন্য অসহনীয় বোঝা' এবং 'পুরো বিশ্বের জন্য সমস্যা' আখ্যা দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
শুক্রবারের ফোনালাপে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এরদোয়ানকে 'সংযত' করার অনুরোধ জানান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'নেতানিয়াহু তার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং প্রেসিডেন্ট তা শুনেছেন। তিনি হয়তো এরদোয়ানকে বলতে পারেন, আপনি কি এ বিষয়ে একটু সংযত হতে পারেন?'
তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং হোয়াইট হাউস।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ইরান সংঘাতের অবসান নিয়ে ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগে নেতানিয়াহু অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহু যেসব ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার অনেকগুলো বাস্তবে মেলেনি। চলতি মাসের শেষ দিকে তার হোয়াইট হাউস সফরের কথা রয়েছে।
এদিকে সোমবার ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও এরদোয়ানের সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন, তুরস্কের শীর্ষ নেতারা ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে 'খারাপ পক্ষকে' সমর্থন করছে।
নেতানিয়াহু বলেন, 'মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী চরমপন্থী আদর্শে প্রভাবিত একটি সরকারকে এফ-৩৫ বা যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন দেওয়া উচিত হবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হবে, যা বর্তমানে ইসরায়েলের আকাশসামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে বজায় রয়েছে।'
