কিয়েভে বছরের সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা রুশ বাহিনীর, ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের আঘাতে নিহত অন্তত ৩০
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বৃহস্পতিবার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এ হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ এই হামলায় কিয়েভের প্রায় ১৩০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সারারাত ধরে চলা এসব বিস্ফোরণে পুরো কিয়েভ শহর কেঁপে ওঠে। প্রাণভয়ে হাজার হাজার বাসিন্দা আশ্রয়কেন্দ্র ও আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নেন।
ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগ জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও তিনটি মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো এর আগে জানিয়েছিলেন, হামলায় ৯১ জন আহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা সারারাত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালিয়েছেন। তৈমুর তকাচেঙ্কো বলেন, 'সব ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল বিরতিহীনভাবে কাজ করবে। দুর্ভাগ্যবশত নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।'
পাঁচ বছরে পদার্পণ করা এই যুদ্ধে কিয়েভজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞের এমন মাত্রা খুব কমই দেখা গেছে। এর আগে গত মে মাসে কিয়েভে রুশ হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন।
এদিকে আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত একটি ৯ তলা আবাসিক ভবন পরিদর্শন করেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ না করাকে দায়ী করেছেন।
ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি বলেন, 'আমাদের অংশীদাররা যদি সময়মতো তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করত, তবে আজ হয়তো আরও অনেক বাড়ি এবং প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। আমরা আমাদের অংশীদারদের কাছে কেবল সেটুকুই চাইছি যা নিয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম। আমরা তার চেয়ে বেশি কিছু চাইছি না।'
জেলেনস্কি আরও জানান, আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টি অন্যতম প্রধান ইস্যু হবে। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'যদি ন্যাটো মিত্রদের কাছে এখনো কোনো গুরুত্ব বহন করে, তবে রাশিয়ার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সব ধরনের হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা জরুরি।'
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতভর ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন ছুড়েছে। বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত বলেন, এবার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল এবং সেগুলো প্রতিহত করার হার ছিল কম। মূলত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটের কারণে ইউক্রেন রুশ হামলা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে জানিয়েছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এই 'ব্যাপক হামলা' চালানো হয়েছে। মস্কোর দাবি, কিয়েভের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা এবং বিমানবন্দরগুলো ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে রাশিয়া জানিয়েছে। ক্রেমলিন জানায়, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এই অভিযানের বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে এবং যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে চাপ আরও বাড়ানো হবে।
কিয়েভে শোক দিবস
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো শুক্রবার রাজধানীতে শোক দিবস ঘোষণা করেছেন। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই শহরের সর্বত্র ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। ইউক্রেনীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, কিয়েভে তাদের মানবিক সহায়তা পণ্যের গুদামটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে জরুরি ত্রাণ ও মানবিক কার্যক্রমের জন্য রাখা প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার সামগ্রী নষ্ট হয়েছে।
ইউক্রেনে ইইউ রাষ্ট্রদূত ক্যাটারিনা ম্যাথারনোভা বলেন, 'রাশিয়া কিয়েভে নরক নামিয়ে এনেছিল।' হামলায় কূটনৈতিক কর্মীদের ব্যবহৃত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আহতদের মধ্যে শিশু, প্যারামেডিক কর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রয়েছেন।
কিয়েভের বাসিন্দা ইরিনা প্লেখোভা ফেসবুকে ধ্বংস হওয়া ভবনের ছবি দিয়ে লেখেন, 'আমাদের বাড়িটি জ্বলছে। আমাদের আর কোনো বাড়ি নেই।'
হামলায় ইউক্রেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োকেমিস্ট্রির অত্যাধুনিক গবেষণাগারটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। জীববিজ্ঞানী ইউরি দানিলোভিচ রয়টার্সকে বলেন, 'এটি ইউক্রেনের চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের জন্য একটি বড় বিপর্যয়।'
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ইউক্রেনের প্রতিবেশী ও ন্যাটো সদস্য দেশ পোল্যান্ড সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। ফিনল্যান্ডও তাদের আকাশসীমায় সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করেছে।
এদিকে ইইউ-র পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'মস্কো যত বেশি বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালাবে, তত বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।'
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
এদিকে জেলেনস্কি পুতিনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ক্রেমলিন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। ইউক্রেনীয় ও মার্কিন কর্মকর্তারা গত দুই দিন বৈঠক করেছেন বলেও জানান তিনি।
