সার সংকটের তীব্র ধাক্কা: বড় ধরনের খাদ্য সংকটের আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র মতে, বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ তেল সরবরাহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। গত আড়াই মাস ধরে চলা এই জ্বালানি ঘাটতি অন্যান্য খাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে সার শিল্পে এর ধাক্কা লেগেছে সবচেয়ে বেশি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কৃষকেরা ফসল ফলানোর জন্য চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, যা আগামী মাসগুলোতে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা পারস্য উপসাগরের সাথে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে সংযুক্তকারী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট। স্বাভাবিক অবস্থায় বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, তবে গত দুই মাসে এর সামান্য একটি অংশ মাত্র এই জলসীমা পার হতে পেরেছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, যা অনেক দেশের সরকারকে তেল ও গ্যাসের ব্যবহারে রেশনিং বা সীমিতকরণের নীতি গ্রহণে বাধ্য করছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি হলো সার শিল্প, কারণ সার উৎপাদনের কাঁচামাল বা জ্বালানি এবং উৎপাদিত সার—উভয়েরই পরিবহন এখন মারাত্মকভাবে সীমিত। উত্তর গোলার্ধের বেশিরভাগ অঞ্চলের জন্য এই ঘাটতি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সেখানে ফসল বোনার মূল মৌসুম চলছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) উপ-নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, "সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এর অর্থ হলো আগামী মৌসুমে ফসলের ফলন কম হবে এবং ফসলহানি ঘটবে। আর তুলনামূলক ভালো পরিস্থিতি হলেও, উৎপাদন উপকরণের বাড়তি খরচ আগামী বছর খাদ্যের দামের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।"
হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে সারের দুটি প্রধান উপাদান—নাইট্রোজেন ও ফসফেট সরবরাহ এখন তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে পড়েছে। উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং ফলন বাড়ানোর জন্য বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়া-সহ নাইট্রোজেনের সরবরাহ সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। মূলত জাহাজ চলাচলে বিলম্ব ও ব্যাঘাত এবং সার উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল লিক্যুফায়েড সিন্থেটিক গ্যাস বা এলএসজি-র আকাশচুম্বী দামের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশ তাদের সার সরবরাহের জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিছু দেশের কাছে সারের মজুদ থাকলেও—অন্য দেশগুলো ইতিমধ্যে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের সার বাণিজ্য আরও ব্যাহত হতে পারে, কারণ দেশগুলো এখন তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থাৎ, এ অবস্থায় তারা সার রপ্তানি করতে তেমন উৎসাহী হবে না। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে সরকার এখন দেশজ বাজারকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সার উৎপাদনের জন্য নিজস্ব ইউরিয়া সরবরাহ ব্যবহার করছে।
মে মাসের শুরুতে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'ইয়ারা' (Yara)-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সভেইন তোরে হোলসেথার সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ইরান যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ বিলিয়ন মিল বা প্রতি বেলার খাবার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং এর ফলে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হোলসেথার বলেন, "আমরা বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি, তার কারণে বিশ্বজুড়ে এপর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ টন নাইট্রোজেন সার উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি।" তিনি উল্লেখ করেন, সারের সীমিত ব্যবহারের কারণে ফসলের ফলন কমে গেলে তা বিশ্ববাজারে খাদ্য নিয়ে এক ধরণের 'বিডিং ওয়ার' বা কাড়াকাড়ি ও দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। একই সাথে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে অন্য দেশগুলোর "সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ" জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য মূল্যযুদ্ধের প্রভাবটি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
হোলসেথার জোর দিয়ে বলেন, নাইট্রোজেন সারের সঠিক প্রয়োগ না হলে প্রথম মৌসুমেই কিছু নির্দিষ্ট ফসলের ফলন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ইয়ারা-র সিইও ব্যাখ্যা করেন, "সারের বাজারটি অত্যন্ত বৈশ্বিক, তাই এর কাঁচামাল বা উপাদানগুলো পুরো পৃথিবীজুড়েই আবর্তিত হয়। তবে এর মূল গন্তব্যগুলো হলো এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা, যেখানে এই সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাবে।" তিনি আরও বলেন, এই সংকট বিশ্বের এমন কিছু অঞ্চলে সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে— যেখানে সারের বিতরণ এমনিতেই কম, যেমন সাব-সাহারান বা উপ-সাহারা আফ্রিকা অঞ্চল।
আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোয় ব্যবহৃত সারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয় এবং উচ্চ জাহাজ ভাড়ার কারণে প্রায়শই ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি দামে তাদের এই সার কিনতে হয়। অনেক আফ্রিকান দেশের জন্য সার নিরাপত্তা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত, যা তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম মূল চাবিকাঠি। এই সার সংকট আফ্রিকার ক্ষুদ্র চাষীদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যারা সাব-সাহারা আফ্রিকার মোট খাদ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে থাকেন।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা—উভয় দেশই সারের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-র প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই দুটি দেশ যৌথভাবে বিশ্বের মোট গমের প্রায় ১০ শতাংশ, ভুট্টার ৩৯ শতাংশ এবং সয়াবিন রপ্তানির ৬৬ শতাংশ জোগান দিয়ে থাকে। এই দুটি দেশই সার আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে।
যদিও এই অঞ্চলে ফসল বোনার বেশিরভাগ কাজ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে হয়ে থাকে, তবে পরিবহনের সময়কাল বিবেচনায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সরবরাহ পাওয়ার জন্য সারের বুকিং বা অর্ডার এখনই দিতে হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা বর্তমানে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) খুঁজে বের করার জন্য এক তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যাতে সারের অভাবে তাদের ফসলের উৎপাদন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য কখন এবং কীভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে—তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা থাকায়, বেশ কয়েকটি দেশ বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে কিংবা অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য জ্বালানি মজুদ করছে। তবে, জ্বালানি ও সারের এই বাণিজ্য যদি আরও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হতে থাকে, তবে আগামী বছর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে—এমন আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
