বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটেও যেভাবে ডলারের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে পর্দার আড়ালে এক নতুন মুদ্রা যুদ্ধ দানা বেঁধে উঠেছে। এই সপ্তাহে চীনের বেইজিংয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার বৈঠকে মূলত শুল্ক, তাইওয়ান, ইরান এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা নিয়েই উত্তপ্ত আলোচনার কথা রয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এর বাইরেও এই লড়াই চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমেই বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং পশ্চিমা অর্থব্যবস্থা থেকে নিজেদের শত্রুদের একঘরে করে রাখতে একের পর এক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ—এই সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে রিজার্ভ মুদ্রার মজুত হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থান নিয়ে অনেক দেশের মনেই বেশ সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
আর এই ভয়ের কারণেই বিশ্বে হঠাৎ করেই সোনার চাহিদা হু হু করে বেড়েছে। এমনকি তেলের বেচাকেনায় অনেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনের মুদ্রা 'রেনমিনবি'-ও ব্যবহার করা শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে ডলারের আধিপত্য কমে যাওয়াটা আমেরিকার অর্থনীতির জন্য অবশ্যই একটা বিপদের কথা। কিন্তু, পরিস্থিতি সামলাতে আমেরিকা এখন ডলারের সিংহাসন মজবুত করতে নানান ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনার মূল হাতিয়ার হলো 'কারেন্সি সোয়াপ লাইন' বা মুদ্রার সরাসরি বিনিময় সুবিধা। এ বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনা চলছে। এই সোয়াপ লাইনগুলো মূলত আমেরিকার অর্থ মন্ত্রণালয় (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ' (ফেড) দিয়ে থাকে।
সহজ কথায়, এই চুক্তির মানে হলো—যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের মুদ্রার বিনিময়ে তাদেরকে পর্যাপ্ত ডলার দেবে, যাতে ওই দেশগুলোকে তেল বা অন্যান্য বাণিজ্যের জন্য ডলারের বদলে চীনা মুদ্রা 'রেনমিনবি' বা অন্য কোনো মুদ্রার কাছে ছুটতে না হয়। এই কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমে, আমেরিকা আরেক দেশের মুদ্রা কিনে ওই দেশটিকে সরাসরি মার্কিন ডলার তুলে দেয়।
সাধারণত, ফেডারেল রিজার্ভই এসব সোয়াপ লাইনের ব্যবস্থা করে। অতীতে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার সময় যখন মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, ঠিক তখন বাজারের চাপ সামাল দিতেই এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডের (আইএমএফ) চীন বিভাগের সাবেক প্রধান এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ঈশ্বর প্রসাদ এ বিষয়ে বলেন, 'এই কারেন্সি সোয়াপ লাইন বা মুদ্রার বিনিময়ের সুযোগ দেওয়াটা বিশ্বজুড়ে কোন দেশের মুদ্রার জোর কত বেশি—তা প্রমাণ করা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের এক বড় কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের এই সুবিধা দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এই তাড়াহুড়ার দুটি লক্ষ্য আছে। প্রথমত, ওই দেশগুলোকে ইরান যুদ্ধের কারণে হওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করা এবং দ্বিতীয়ত, ওই অঞ্চলে যেন চীন মাথা গলাতে না পারে তা নিশ্চিত করা।'
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জাপানে এবং দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে এই সপ্তাহে চীনের বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে যোগ দেবেন। কারেন্সি সোয়াপ নিয়ে এই সমস্ত আলোচনা তিনিই দেখভাল করছেন।
গত মাসে সিনেটে এক শুনানিতে বেসেন্ট জানান, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়া মিত্র দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে তিনি এই সোয়াপ লাইন বা মুদ্রার বিনিময় নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, ডলারের বাজার স্বাভাবিক রাখতে এবং আমেরিকান সম্পদের হঠাৎ পতন ঠেকাতেই তিনি এমন একটা পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মেক্সিকোর মতো মার্কিন মিত্ররা যখন বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ত, মূলত তখনই এই সোয়াপ লাইনের ব্যবস্থা করা হতো।
ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালিতে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গাল্ফ বা উপসাগরীয় দেশগুলো বিপদে পড়লেও, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের অর্থনৈতিক ভিত এখনও বেশ শক্ত রয়েছে। অবশ্য, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ক্ষমতাবলে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে এ ধরনের সোয়াপ লাইন তৈরির একচেটিয়া অধিকারও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ বা পছন্দের রাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে সাহায্য করাই নয়।
তার মতে, 'সোয়াপ লাইন' মূলত আমেরিকার 'ইকোনমিক শিল্ড' বা অর্থনৈতিক সুরক্ষার বর্ম শক্ত করার একটি পথ, যার মাধ্যমে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো যাবে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর তেলের ব্যবসা ডলারের বদলে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে চলে যাওয়া নিয়ে চিন্তায় রয়েছে।
বেসেন্ট তার ওই পোস্টে লিখেছেন, 'এই ধরনের স্থায়ী সোয়াপ লাইন উপসাগরীয় ও এশীয় অঞ্চলে মার্কিন ডলারের লেনদেন কেন্দ্র স্থাপনের পথে বড় ধরনের একটি পদক্ষেপ। ক্রমাগতভাবে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে ডলারের আধিপত্য বজায় থাকে এবং রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে এর গুরুত্ব টিকে থাকে। আর এই ব্যবস্থার কারণেই বিভিন্ন বিকল্প, বা ঝামেলা করতে পারে এমন লেনদেনের উত্থান সহজেই ঠেকানো যায়।'
এর আগে গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা মূলত কোনো ধরনের 'বেইলআউট' বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পেতে এই সোয়াপ লাইনে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ আরও জোরদার করতেই তাদের এই উদ্যোগ।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা একটু ভিন্ন কৌশলে এ ধরনের 'আর্থিক টোপ' ব্যবহার করছে। যেমন, গত বছর ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট আর্জেন্টিনাকে অর্থনীতি ঠিক রাখতে ২ হাজার কোটি ডলার সাহায্য করেছিলেন। আর এর প্রধান কারণ ছিল দেশটির প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ের মিলেকে তার রাজনৈতিক জায়গা শক্ত করতে সহায়তা করা।
বেসেন্টের ওই সময়ে আর্জেন্টিনাকে সাহায্য করার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, অর্থ দপ্তরের যে কাজ কেবল অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা, সেটাকে তিনি রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছেন। যদিও ওই ঋণ পরে শোধ করা হয়, এবং প্রেসিডেন্ট মেলের দলও মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় কোনো বিপদে পড়েনি।
তবে আমেরিকা যেমন এসব আর্থিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিধি বাড়িয়েছে, চীনও গত কয়েক বছরে পিছিয়ে নেই। 'কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস' (সিএফআর)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে চীন ৪০টিরও বেশি দেশের সাথে 'দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা বিনিময় চুক্তি' করেছে। তাদের উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার— 'পিপলস ব্যাংক অব চায়না' থেকে এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে নিজেদের মুদ্রায় ঋণ দেওয়া এবং বিশ্বে এর চাহিদা আরও বাড়ানো।
বর্তমানে 'ফেডারেল রিজার্ভ'-এর অধীনে আমেরিকার এমন ৬টি সোয়াপ লাইন চালু আছে। এগুলোর মাধ্যমে তারা প্রধান সহযোগী বা মিত্র দেশগুলোর সাথে লেনদেনের সুযোগ দিয়ে আসছে। মহামারির সময়েও, ফেড তাদের এই ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করেছিল যাতে ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্কসহ মোট আটটি দেশের ব্যাংকগুলোকে সহজেই সহযোগিতা করা যায়।
তবে, নতুন করে এখন যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে নাকি এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (ইএসএফ)-এর মাধ্যমে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বেসেন্ট মূলত এই তহবিলের ব্যবহারের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ট্রাম্পের পছন্দের নতুন ফেড চেয়ার বা গভর্নর কেভিন ওয়ার্শ সম্প্রতি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই ব্যাপারগুলোতে তিনি ট্রেজারি আর ফেড-এর মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয় দেখতে চান।
এদিকে, আমেরিকার ট্রেজারি দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা মার্ক সোবেল এই পদক্ষেপকে একটি 'ভুল নীতি' হিসেবে দাবি করে বলেন, 'চীনের প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকার আরো নতুন নতুন 'সোয়াপ লাইন' চালু করাটা বোকামি। কারণ চীনের চুক্তিগুলো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় এবং সেখানে চড়া সুদ গুনতে হয়।'
তিনি মনে করেন, চীনের এই সোয়াপ ব্যবস্থা মূলত বিশ্ববাজারে 'রেনমিনবি'-কে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থই হয়েছে। সোবেল সতর্ক করে দেন যে, কেবল রাজনীতি বা ক্ষমতায় থাকার জন্য যদি 'ইএসএফ' বা ওই তহবিলকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে এটা সমাধানের বদলে বড়সড় ক্ষতিই বেশি করে ফেলবে এবং এই তহবিলের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
তিনি বলেন, 'এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার মানে হলো 'ইএসএফ'কে একেবারে অচেনা মাঠে ছুড়ে ফেলা, এবং এটি এক নতুন বিপদের দুয়ার খুলে দিতে পারে।'
এত সমালোচনা, বিভিন্ন বিকল্প মুদ্রার খোঁজাখুঁজি এবং এত চেষ্টা-তদবিরের পরেও, বিশ্ববাজারের রাজা হিসেবে 'ডলারের' পতন খুব সহজে হওয়ার নয় বলে অনেকেই মনে করছেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ে বা রিজার্ভে এখনও সিংহভাগ অংশজুড়ে রয়েছে মার্কিন ডলারই।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, খোদ ইরানও আমেরিকার সাথে আলোচনা চালাচ্ছে যেন কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয় এবং তারাও ডলারের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ ফিরে পায়!
এই বিষয়ে 'কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস'-এর একজন ফেলো বা গবেষক ব্র্যাড সেটসার বলেন, 'আমার মতে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে একটা মনগড়া আতঙ্ক নিয়ে পড়ে আছে, বাস্তবে এই হুমকির কোনো অস্তিত্বই নেই।'
তার যুক্তি, ডলারের রাজত্ব এত তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার নয়। নতুন করে আর কোনো 'সোয়াপ লাইনে'র তেমন কোনো দরকার নেই। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, চীনা মুদ্রায় তেলের দাম নিলে রপ্তানিকারকদের উল্টো নিজেদের ক্ষতির মুখ দেখতে হয়, কারণ তাদের তেলের দামে কিছুটা ছাড় দিতে হয়।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় অন্য দেশের অযৌক্তিক হুমকির ফাঁদে পা দেওয়া। কারণ যদি তারা নিজেদের সুবিধা ভেবে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কে ঝুঁকে পড়ে, শেষমেশ সেটি তাদের জন্যই আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।'
