ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থেকে যে শিক্ষা নিতে পারে চীন
ইরান যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন সামরিক বাহিনী কীভাবে কাজ করে, তা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে চীন। সেই সঙ্গে এই যুদ্ধ বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় শিক্ষাও রেখে যাচ্ছে—যুদ্ধক্ষেত্রে ফলাফল কী হবে, তা নির্ধারণে সব সময়ই প্রতিপক্ষের বড় ভূমিকা থাকে।
পারস্য উপসাগর ও এর আশপাশে গত দুই মাসের এই সংঘাতের আলোকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চীন, তাইওয়ান এবং অন্যান্য অঞ্চলের কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে সিএনএন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চীন হয়তো নিজেদের শক্তি নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে। তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই এবং সংঘাত ও এর পরিণতি সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও খুব সংকীর্ণ।
চীনের বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল ফু কিয়ানশাও মনে করেন, এই যুদ্ধ থেকে চীনের প্রধান শিক্ষা হলো—পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কোনোভাবেই তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অবহেলা করলে চলবে না। তিনি বলেন, প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার উপায় বের করে ফেলেছে ইরান।
ফু সিএনএনকে বলেন, 'ভবিষ্যতের যুদ্ধে অপরাজিত থাকতে হলে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে হবে।'
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিএলএ আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। তারা এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করেছে, যেগুলো ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে।
ব্রিটিশ থিংকট্যাংক আরইউএসআইয়ের মতে, চীন তাদের বিমানবাহিনীতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ (রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম এমন) ফাইটার যুক্ত করছে। তারা দূরপাল্লার নিখুঁত হামলার জন্য মার্কিন এফ-৩৫-এর প্রায় সমকক্ষ অন্তত এক হাজার জে-২০ ফাইটার জেট মাঠে নামাবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বা বি-২১-এর মতো দূরপাল্লার স্টেলথ বোমারু বিমান তৈরির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে চীন।
তবে প্রতিরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, অপেক্ষাকৃত সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেই পারস্য উপসাগরে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পেরেছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে সস্তা শাহেদ ড্রোন এবং স্বল্পমূল্যের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫ ও বি-২-এর মতো অনেক বেশি অত্যাধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছে। এর পাশাপাশি তারা বি-১, বি-৫২ ও এফ-১৫ থেকে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও কম প্রযুক্তির গাইডেড বোমাও ফেলেছে। মিসাইল লঞ্চার থেকে শুরু করে নৌযান, সেতু—সবকিছুই তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সাবেক কর্নেল ফু বলেন, 'এই মিশ্র কৌশলের মোকাবিলা করার জন্য বেইজিংকে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানঘাঁটি এবং বন্দরগুলোকে হামলা থেকে রক্ষা করতে আরও গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে।'
তাইওয়ান নিয়ে সংঘাতের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের কথা এলেই অবধারিতভাবে তাইওয়ানের নাম উঠে আসে।
তাইওয়ানকে কখনোই শাসন না করলেও, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এই স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপটিকে 'একত্রিত' করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি চীনের নেতা শি জিনপিং।
তাইওয়ানের বিশ্লেষকেরা স্বীকার করেন যে চীনের হাতে এখন এমন এক সামরিক বাহিনী রয়েছে, যা হাই-টেক বা উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্রের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এবং স্বল্পমূল্যের ড্রোন হামলার দিক থেকে ইরানের সমকক্ষ।
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক চিহ চুং সিএনএনকে বলেন, 'তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন (ড্রোন সোয়ার্ম) নিশ্চিতভাবেই বড় ভূমিকা পালন করবে।'
কিন্তু এটি কি তাইওয়ানে যুদ্ধ জয়ের জন্য যথেষ্ট হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, চীন বিশ্বের শীর্ষ ড্রোন প্রস্তুতকারক দেশ। দেশটির নির্মাতারা যে পরিমাণ চালকবিহীন অস্ত্র তৈরি করতে পারে, তার হিসাব সত্যিই অবাক করার মতো।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্ল্যাটফর্ম 'ওয়ার অন দ্য রকস'-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'চীনা বেসামরিক নির্মাতাদের মাত্র এক বছরের মধ্যেই নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে বছরে ১ বিলিয়ন অস্ত্রবাহী ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।'
অনেকের আশঙ্কা, এত বিপুলসংখ্যক ড্রোন মোকাবিলার জন্য তাইওয়ান এখনো প্রস্তুত নয়।
সরকারের নজরদারি সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থাগুলো অকার্যকর। এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটির জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তবে তাইওয়ান বসে নেই। তারা এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাইওয়ানের শীর্ষ ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'থান্ডার টাইগার'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিন সু দেশটিতে ড্রোন উৎপাদনে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'শত্রুদের মোকাবিলা করতে আমাদের দিন-রাত উৎপাদন চালিয়ে যেতে হবে।'
যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধ থেকে শিখছে। তারা বুঝতে পারছে যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো সংঘাত বাধলে তারা হয়তো আক্রমণকারীর বদলে রক্ষকের ভূমিকায় থাকবে।
এপ্রিল মাসে মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো বলেছিলেন, ড্রোনের কারণে আক্রমণকারী পক্ষের জন্য যুদ্ধের খরচ অনেক বেড়ে যায়।
তাইওয়ান নিয়ে যদি যুদ্ধ বাধে, তবে দ্বীপটি বা যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন ব্যবহার করে চীনা জাহাজ বা বিমানে হামলা চালাতে পারে। এসব যানে হয়তো লাখ লাখ পিএলএ সেনা তাইওয়ান প্রণালি পার হয়ে আক্রমণের জন্য আসবে।
একটি জাহাজ বা বিমান এবং তার ভেতরে থাকা সেনাদের মূল্য তাদের ধ্বংস করতে আসা ড্রোনের চেয়ে অনেক বেশি। ইরান যুদ্ধেও এই ভীতির বিষয়টি স্পষ্ট দেখা গেছে। ইরানের অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলের কথা মাথায় রেখে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজ পাঠাতে বেশ সতর্কতা দেখিয়েছে।
অ্যাডমিরাল পাপারোর একটি প্রস্তাব বেইজিংয়ের নজর এড়ায়নি। পাপারো প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে চীনা সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে তাইওয়ান প্রণালির আকাশ ও পানিতে হাজার হাজার ড্রোন মোতায়েন করা উচিত, যাতে পিএলএ সেনাদের জন্য এই জলপথ পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বসে নেই প্রতিপক্ষও
ইরান যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া সব সামরিক বাহিনীর জন্যই একটি বড় বার্তা হলো—আপনার শত্রুরাও কিন্তু শিখছে। এবং তারা হয়তো সেই শিক্ষা এমনভাবে কাজে লাগাবে, যা আপনি আশাই করেননি।
ইরানে যুদ্ধ দুই মাসের বেশি গড়ালেও অনেক বিশ্লেষক এখনো হিসাব মেলাতে পারছেন না যে ওয়াশিংটনের যুদ্ধকালীন নেতারা কেন আগে থেকে ভাবেননি যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
আবার অনেকে অবাক হচ্ছেন যে এত সামরিক হামলার পরও ইরান সরকার কীভাবে টিকে আছে। তবে তারা বেইজিংয়ের জন্য এখানে একটি পরিষ্কার শিক্ষা দেখছেন।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রেইগ সিঙ্গেলটন সিএনএনকে বলেন, 'কৌশলগত বিজয় মানেই রাজনৈতিক সাফল্য নয়। সামরিক চাপ দিলেই যে একটি টেকসই রাজনৈতিক মীমাংসা চলে আসবে, এমন কোনো কথা নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'চীনের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে সফল হলেই যে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত পরিণতি পাবেন, তা নয়।'
এর বাইরেও একটি বড় বিষয়—চীনা সামরিক বাহিনীর যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধের পর পিএলএ আর কোনো যুদ্ধের মাঠে নামেনি। এর মধ্যে মার্কিন বাহিনী ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ করেছে এবং কসোভো ও পানামার মতো জায়গায় দ্রুতগতিতে অভিযান চালিয়েছে।
চীনা সামরিক বিশ্লেষক সং জংপিং ইরান সংঘাত সম্পর্কে বলেন, 'আসল যুদ্ধ এমনই হয়।'
আগামী দশকে যদি চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সংঘাত হয়, তবে ওয়াশিংটনের হাতে এমন অনেক সেনা থাকবে, যাদের পারস্য উপসাগরের বর্তমান যুদ্ধে সরাসরি কাজ করার বা পরিকল্পনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তারা সহযোদ্ধা হারিয়েছে, সম্পদ হারিয়েছে, জয় পেয়েছে এবং নিখুঁত যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করেছে। তারা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতেও শিখেছে। যেমন, বিমান হামলার বদলে ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করা।
আক্রমণের মুখে পিএলএ কত দ্রুত এমন পরিবর্তনশীল রণক্ষেত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্রু থম্পসন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সর্বশেষ সংঘাত—কোরীয় যুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনেছেন।
ওই সময় চীনের কাছে সেরা ফাইটার জেট ছিল—সোভিয়েতের তৈরি মিগ-১৫। কিন্তু মার্কিন পাইলটরা সাধারণ মানের এফ-৮৬ চালিয়েও বেশি সফল হয়েছিলেন, কারণ তাদের অনেকেরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল।
থম্পসন বলেন, 'এখান থেকে শিক্ষা হলো, একটি সাধারণ মানের বিমানে থাকা একজন দুর্দান্ত পাইলট সব সময়ই একটি দুর্দান্ত বিমানে থাকা সাধারণ মানের পাইলটকে হারিয়ে দেবে।'
ইরান থেকে নেওয়ার মতো আরেকটি শিক্ষা হলো—একটি পরাশক্তি এবং একটি দুর্বল শক্তির মধ্যে হওয়া যুদ্ধ সব সময় নিখুঁত হয় না, যা মাঝরাতে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে প্রেসিডেন্টকে তুলে আনার মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে (যেমনটা ভেনিজুয়েলায় হয়েছিল)।
এফডিডি-এর সিঙ্গেলটন বলেন, 'একটি কৌশলগত পথ আটকে দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করার যে সক্ষমতা ইরান দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে একটি স্থানীয় সংঘাত কত দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে।'
তিনি বলেন, 'বেইজিংয়ের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো সংঘাত শুরু হলে তা অবধারিতভাবেই বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং তৃতীয় পক্ষগুলোকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলবে, যা কল্পনা করাও কঠিন।'
