বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা কারখানা চালু করতে সহায়তা দেবে সরকার, বন্ধ সরকারি কারখানা ছাড়া হবে উদ্যোক্তাদের হাতে
দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বন্ধ কারখানা চালু করার পাশাপাশি নতুন করে যাতে কোনো কারখানা বন্ধ না হয়, সেজন্য ধুঁকে ধুঁকে চলা কারখানাগুলোকেও সহায়তা দিয়ে সচল রাখা হবে বলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে সরকারি বন্ধ কারখানাগুলো সরকার চালু করবে না, আগ্রহী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করা হবে।
সোমবার (১১ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নেতারা টিবিএসকে এ তথ্য জানান।
সভা শেষে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নির্বাহীরা জানান, বন্ধ হওয়া ও বন্ধ হওয়ার উপক্রম কারখানাগুলো চালু করতে কোন ধরনের নীতি সহায়তা দরকার, তা কারখানাগুলোর মালিকদের সঙ্গে কথা বলে লিখিতভাবে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ঈদুল আজহার পর সংগঠন দুটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাব জমা দেবে।
তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। এজন্য সরকারি-বেসরকারি খাতে থাকা বন্ধ সব কারখানা চালু করতে চান। নতুন করে কোনো কারখানা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য নীতি সহায়তা দিতে চান।
সভায় উপস্থিত থাকা বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সরকারি বন্ধ কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দুটি শর্তের কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন—বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চালু করতে হবে এবং যে কারখানায় যে পণ্য উৎপাদন হতো, একই পণ্য উৎপাদন করতে হবে।
সারা দেশে কী পরিমাণ কারখানা বন্ধ রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পোশাক খাতের প্রায় ৩০০ কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, সভায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম কারখানাগুলোকেও এই তহবিল থেকে সুবিধা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীও চান, কোনো কারখানা যাতে নতুন করে বন্ধ না হয়। সেজন্য তিনি বন্ধ হওয়ার উপক্রম কারখানাগুলোকেও সহায়তা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছেন।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে আমাদের বলেছেন, সব বন্ধ কারখানা চালু করা হবে এবং নতুন করে কোনো কারখানা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য সরকার সব ধরনের নীতি সহায়তা দেবে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ কারখানাগুলোও বেসরকারিকরণের মাধ্যমে চালু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।'
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে কোন ব্যবসায়ী বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করবেন না এবং নতুন বিনিয়োগও আসবে না বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি।
ম্যান-মেইড ফাইবারের কাঁচামাল আমদানির জটিলতা ও বাংলাদেশে উৎপাদিত অক্সিলিয়ারি কেমিক্যালের কাঁচামাল আমদানির জটিলতা দূর করতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুরুতে মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল ও পরে মোহাম্মদ হাতেমের নেতৃত্বে বিকেএমইএ প্রতিনিধিদল পৃথকভাবে প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করে।
তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সব বন্ধ কারখানার জন্য একই শর্তে সুবিধা দেওয়া হলে সব মালিক কারখানা চালু করতে পারবেন না। কারণ, একেক কারখানার সমস্যা একেকটা। তখন প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক বন্ধ কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা বলে কার কী সমস্যা, তা লিখিতভাবে জমা দিতে বলেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, 'সরকার কোনো ট্যাক্স মাফ করতে পারবে না, কাউকে টাকাও দিতে পারবে না। কিন্তু কারখানাগুলো চালু রেখে কীভাবে কর্মসংস্থান করা যায়, সেজন্য কোন কারখানার কোন ধরনের নীতি সহায়তা প্রয়োজন, তা লিখিতভাবে দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা ঈদের পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেব।'
তিনি আরও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্টোরেজ করতে সব ধরনের উপকরণ ও ব্যাটারি আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ককর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে।
বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, 'কোনো বিদেশি কোম্পানি নয়, প্রধানমন্ত্রী চান দেশের ব্যবসায়ীরাই রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ কারখানাগুলো চালাক। তবে যে কারখানায় যে পণ্য তৈরি হতো, সেই পণ্যই তৈরি করতে হবে এবং তা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। এর মধ্য দিয়ে রপ্তানি ডাইভারসিফিকেশন চান প্রধানমন্ত্রী।'
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও সরকারের বন্ধ কারখানা চালু করার আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাজশাহীর রেশম কারখানা চালু করতে কেউ আগ্রহী হলে যেন তাকে জানান। কারখানাটি আধুনিকায়ন করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিল্ক পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করা সম্ভব।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রপ্তানিমুখী মার্কেট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের উপর জোর দিয়েছেন।
হাতেম আরও বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু পলিসির কারণে অনেক চলমান কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। বন্ড সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা, অডিট নিয়েও অনেক কারখানা সমস্যায় পড়ছে। আমদানি-রপ্তানি সহজ করার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি।
'আমাদের লিখিত সুপারিশ পাওয়ার পর পলিসি পরিবর্তন করে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।'
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির, পূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের ও শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন।
