ট্রাম্পের ইরান-ভুলে সবচেয়ে বেশি লাভবান কি রাশিয়া?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতে থাকা চলমান দ্বন্দ্বের নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেই পড়ছে। তবে এর উল্টোপিঠে বসে লাভবান হয়েছে একটি দেশ, আর সেটি হলো রাশিয়া।
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার কারণে মস্কো এর মধ্যেই কোটি কোটি ডলার বাড়তি আয় করে ফেলেছে। বিশ্ববাজারে এই চড়া দাম কমানোর আশায় যুক্তরাষ্ট্র আবার রাশিয়ার ওপর থেকে সাময়িকভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিয়েছে।
তবে নগদ অর্থ পাওয়ার বাইরে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধে ঠিক কতটা সুবিধা দিচ্ছে?
সম্প্রতি এ বিষয়ে ফরেন পলিসির সম্পাদক রবি আগরওয়াল তাদের পডকাস্ট শো 'এফপি লাইভ'-এ কথা বলেছেন 'কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার' এর পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভ-এর সাথে।
রবি আগরওয়াল: তেলের চড়া দাম থেকে রাশিয়া ঠিক কতটা বাড়তি অর্থ পাচ্ছে, তার কি কোনো হিসাব আপনার কাছে আছে?
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ: আমার এক সহকর্মী ও এই খাতের অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ সের্গেই ভাকুলেঙ্কোর হিসাবমতে, তেলের দাম ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লেই 'রাশিয়া ইনকরপোরেশন' (অর্থাৎ, রুশ সরকার এবং তেল কোম্পানি মিলিয়ে) প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি ডলার বাড়তি আয় করে।
দাম যত বাড়ে, এই আয়ও তত বাড়তে থাকে। রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের ঘোষণামতে, কেবল এপ্রিল মাসেই তাদের তেলের বিক্রি থেকে ৯০০ কোটি ডলার আয় হয়েছে, যা ইউক্রেন আক্রমণের আগে তাদের আয়ের প্রায় দ্বিগুণ!
রবি আগরওয়াল: তেলের হিসাবটা পরিষ্কার, কিন্তু সামগ্রিকভাবেও কি রাশিয়া ইরান যুদ্ধ থেকে ফায়দা লুটছে?
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ: এই যুদ্ধে রাশিয়ার জন্য মূলত তিনটি ভালো খবর রয়েছে এবং একটিমাত্র খারাপ খবর রয়েছে, যা আবার ইউক্রেনের জন্য একটি সুবিধা।
প্রথমত, আমরা যে তেলের দামের কথা বললাম, সেটাই পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা বা হঠাৎ পাওয়া বড় শক্তি। এর সঙ্গে যদি যোগ করেন সার, অ্যালুমিনিয়াম এবং অন্যান্য দরকারি কাঁচামালের কথা—এসবের দাম বাড়ায় রাশিয়ার মুখে হাসি ফুটেছে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা 'প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর'-এর ঘাটতি। গত সপ্তাহে ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতেই যে হিসাব বেরিয়েছে, তা বেশ ভয়ের। দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা এরই মধ্যে যে পরিমাণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর খরচ করেছে, তা ২০২২ সালে হামলা শুরু করার পর থেকে ইউক্রেনের পাওয়া সমস্ত প্যাট্রিয়টের চেয়েও অনেক বেশি।
কিন্তু মূল বিপদটা হলো, এই মুহূর্তে রাশিয়ার বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর উপায় এই প্যাট্রিয়ট। শুধু ভেবে দেখুন, এই সামনের শীতে রাশিয়া বড় কোনো ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়তে শুরু করলে প্যাট্রিয়টের ঘাটতি থাকলে ইউক্রেনের কী অবস্থা হবে!
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে বিক্ষিপ্ত, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক যুদ্ধে আটকা পড়েছে যার কোনো কূল-কিনারা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ ইউক্রেন বা তাদের ইউরোপীয় বন্ধুদের কাছ থেকে সরে সেদিকে চলে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলোর ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিল, এখন এই যুদ্ধের কারণে আমেরিকা আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। ফলে পুতিন অনেকটা চাপমুক্ত।
আর যে একমাত্র খারাপ খবরটির কথা বলছিলাম, তা ইউক্রেনের বুদ্ধিমান কৌশলের কারণে তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানি ড্রোন হামলার কারণে বেশ ভীত। ঠিক সেই সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দল বুঝতে পারে যে, এসব ড্রোনের হাত থেকে বাঁচতে তাদের কিছু অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বা ইন্টারসেপ্টর দরকার।
আমেরিকার হাতে এমন ড্রোনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, কিন্তু ইউক্রেন গত তিন বছর ধরে রাশিয়ার 'শাহেদ' ড্রোনের সঙ্গে লড়তে লড়তে এই বিষয়ে বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছে। তাই জেলেনস্কির দল এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে লোক পাঠিয়েছে, যারা সেখানকার সেনাদের ওই সব ইরানি ড্রোন মোকাবিলার কায়দাকানুন শিখিয়ে দিচ্ছে।
পাশাপাশি, অ্যান্টি-ড্রোন যন্ত্র তৈরির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও বড় বিনিয়োগ পাওয়ারও চেষ্টা করছে তারা। এতে সফল হলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাত যে টাকা বা বুস্ট পাবে তা রাশিয়ার জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হবে।
রবি আগরওয়াল: আচ্ছা, তাহলে রাশিয়া কি সরাসরি ইরানকে কোনোভাবে সাহায্য করছে? শোনা যাচ্ছে যে, রাশিয়া নাকি ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ইরানে ড্রোনের নানা যন্ত্রপাতি পাঠাচ্ছে। আপনি কি মনে করেন যে তাদের বন্ধুত্ব আগের চেয়েও শক্ত হয়েছে এবং পুতিন ইরানকে আরও বেশি করে সাহায্য করতে চাইতে পারেন?
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ: আমাদের কাছে এখন যা তথ্য রয়েছে তা খুব পরিষ্কার নয়। পশ্চিমা মিডিয়া চমৎকার কাজ করছে, তবে প্রকৃত তথ্যের দিক থেকে এখনও অনেক ফাঁক রয়েছে। দেখুন, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আক্রান্ত হলে একে অন্যের রক্ষায় এগিয়ে আসতেই হবে, এমন কোনো সামরিক চুক্তির দায়বদ্ধতা নেই।
তবে রাশিয়া তার সীমিত সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব ইরানকে সাহায্য করতে রাজি। গত জুন মাসের আগের যুদ্ধে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, তাই রাশিয়া থেকে খুব দ্রুত আকাশ সুরক্ষার জন্য দরকারি অস্ত্রপাতি পাওয়া সম্ভব ছিল না। এছাড়া, ইউক্রেনের ভেতরে থেকে হওয়া দূরপাল্লার হামলার কারণে রাশিয়ার নিজেরও ওই সব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।
কিন্তু আমরা এতটুকু জানি যে, আমেরিকা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়া ইরানকে নিখুঁত ডেটা দিয়ে সহায়তা করছে। এছাড়া আপনি যে ড্রোনের যন্ত্রাংশের কথা বললেন, সেগুলোও পাঠাচ্ছে রাশিয়া। শুরুতে ইরান তাদের 'শাহেদ ড্রোন' রাশিয়াকে দিয়েছিল, এরপর রাশিয়া সেটি নিজেদের মতো উন্নত করে এখন তা ইরানকেই দিচ্ছে তাদের কাজে ব্যবহারের জন্য।
আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে ক্যাস্পিয়ান সাগর ইরানের বেঁচে থাকার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাশিয়া তাদের এই বিপদ থেকে টেনে তুলছে। কেন রাশিয়া এটা করছে? কারণ এখন পুতিনের লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সব কিছু সংগ্রহ করা।
যেকোনো দেশের সাথেই বন্ধুত্ব পাততে তার প্রধান লক্ষ্য থাকে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র পাওয়া, ডলার আয় করা এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে শায়েস্তা করা। ইরানের ক্ষেত্রে রাশিয়া তার দুটি প্রয়োজনই ভালোভাবে মেটাতে পেরেছে—শাহেদ ড্রোন পাওয়া এবং ইউক্রেনকে সহায়তা করা আমেরিকানদের শিক্ষা দেওয়া।
রবি আগরওয়াল: এই কয়েকদিন আগেই রাশিয়ার 'ভিক্টরি ডে' বা বিজয় দিবসের প্যারেড খুবই সাদামাটা ছিল! ইউক্রেনের হামলার ভয়েই রাশিয়ান ট্যাংক বা বড় সামরিক বহর বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং কয়েক দিন ধরে মস্কোতে মোবাইল ইন্টারনেট পর্যন্ত বন্ধ রেখেছিল তারা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, পুতিন কি এই মুহূর্তে বেশ বেকায়দায় আছেন?
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ: এই প্যারেড পরিষ্কার প্রমাণ করে দিচ্ছে যে রাশিয়ার নিজের মাটিতে সামরিক শক্তি এবং তার উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে তাদের তেল আর গ্যাসের শোধনাগার এবং রপ্তানি কেন্দ্রগুলো, যা যুদ্ধের আসল খরচের জোগান দেয়।
শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোনের কারণে খোদ রাজধানী মস্কোতেও হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু দিন আগে ইউক্রেনের 'অপারেশন স্পাইডারস ওয়েব' নামের রোমাঞ্চকর এক অভিযানে রাশিয়ার কৌশলগত বোমারু বিমানে নিখুঁত আঘাত হানে ইউক্রেন। চারদিকে এত ভয়ের কারণে ছোটখাটো এই প্যারেড পুতিনের ভীতি ও দুশ্চিন্তাই প্রকাশ করে।
আর হ্যাঁ, একদম শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে একটি যুদ্ধবিরতি আনা এবং ইউক্রেন যেন প্যারেড চলাকালে হামলা না চালায়—এমন নিশ্চয়তা নেওয়া রাশিয়ার সত্যিই প্রয়োজন ছিল। এ নিয়ে কিয়েভ বেশ মজাই লুটল।
তারা বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল যে তারা চাইলে মস্কোকেও নিশানা করতে পারে। তারা মস্কোকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রাজধানীতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করল। শেষে মোবাইল ইন্টারনেট পর্যন্ত বন্ধ করতে বাধ্য হলো।
এরপর পুতিনের জন্য ট্রাম্পকে নিজে এসে বলতে হলো যে জেলেনস্কি তার প্যারেডে হাত দেবে না। এরপর জেলেনস্কির ঘোষণা ছিল চরম মজার, 'আমি এতদ্বারা নির্দেশ দিচ্ছি যে মস্কো শহরে প্যারেড চালানোর অনুমতি দেওয়া হলো।' এটা রাশিয়ার জন্য এক অপমানের ঘটনা ছিল।
রবি আগরওয়াল: এটা বুঝতে পারছি। এবার ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে কথা বলি। মনে হচ্ছে গত কয়েক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে কিছু অঞ্চল হারিয়েছে। আর প্রতি মাসে তাদের যত সেনা দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি তারা যুদ্ধে হারাচ্ছে। আপনার কী মনে হয়?
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ: আমি এ তথ্যের সাথে একমত নই। ইউক্রেনীয় স্বেচ্ছাসেবী গবেষকদের বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট 'ডিপস্টেট'-এর মতে, রাশিয়া আসলে এগোচ্ছে। হয়তো তারা কোথাও একটু জায়গা হারিয়েছে, কিন্তু অন্য জায়গাগুলোতে তার চেয়ে বেশি দখল করেছে।
সেনাসংখ্যা, ট্যাঙ্ক এবং কামানের দিক দিয়ে রাশিয়ার বিশাল সুবিধা থাকায়, তারা সামনের দিনগুলোতেও ইউক্রেনের জায়গা দখল করতে সক্ষম হতে পারে।
তবে, এই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলার মূল্য তাদের কিন্তু অনেক চড়া দিতে হচ্ছে—তাদের অনেক সেনা হারাতে হচ্ছে আর প্রচুর সরঞ্জামও নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এসব করেও কিন্তু রাশিয়া তাদের বড় কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না।
তাদের স্বপ্ন ছিল পুরো ইউক্রেন দখল করা বা কিয়েভে এমন একটা সরকার বসানো যাকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, অথবা পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইউক্রেনের সামরিক জোট ছিন্ন করা। কিন্তু রাশিয়া এসবের কিছুই অর্জন করার ধারেকাছে নেই।
বরং ইউক্রেন প্রযুক্তি ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্যে নিজেদের দুর্বলতাগুলো কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠেছে। তারা ধীরে ধীরে জায়গা ছাড়লেও, বিনিময়ে রাশিয়ান সেনাদের প্রচুর ক্ষতি করছে।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, পুতিন কি এই বার্তা পাচ্ছেন? নাকি তার সামরিক কর্তারা তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে যে— 'স্যার, আমাদের আর ছয়টি মাস দিন, একটা শেষ ধাক্কা দিলেই সব ভেঙে পড়বে'?
যদি পুতিন সঠিক গোয়েন্দা তথ্য না পান এবং এমন আশ্বাসে বিভ্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে হয়তো তিনি এই সংঘাত চালিয়েই যাবেন।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ইউক্রেন যতই নিজেদের শক্তি আর জেদ প্রমাণ করুক না কেন, রাশিয়ার কাছে এই প্রাণঘাতী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত রসদ এখনো মজুদ রয়েছে।
