বাইক, দামি গাড়ির ওপর নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা এনবিআরের
দেশজুড়ে চলা লাখ লাখ মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইসঙ্গে উচ্চ সিসি বা অধিক ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনের ওপর বিদ্যমান অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
রাজস্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি দেশে 'বাংলা টেসলা' হিসেবে পরিচিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্রমবর্ধমান বহরকেও এআইটি'র আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গতকাল সোমবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বাজেট বিষয়ক সভায় দিয়েছে এনবিআর এ প্রস্তাব দিয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণায়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান।
ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, যানবাহন নিবন্ধনের সময় আদায়কৃত রোড ট্যাক্সের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে এআইটি আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের। পাশাপাশি যানবাহনের ইঞ্জিন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মোটরযানের বিদ্যমান অগ্রিম আয়করও ঊর্ধ্বমুখী করার চিন্তা করা হচ্ছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন যে, অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে এ ধরণের একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মূলত কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা মূলত উচ্চ সিসি বা অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে, যেগুলোর মালিকরা সাধারণত বিত্তবান শ্রেণির হয়ে থাকেন।
বিলাসজাত পণ্য বা লাক্সারি সেগমেন্ট থেকে রাজস্ব বাড়ানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির সঠিক হার সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা কিছু বলতে রাজি হননি।
বিআরটিএ-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি-র সংখ্যা ২.৩ লাখের বেশি। পূর্ণ আকারের বা বিলাসবহুল এসইউভিগুলোর ইঞ্জিন সক্ষমতা সাধারণত ২,৫০০ সিসি থেকে ৪,০০০ সিসি'র বেশি হয়ে থাকে।
২০২৫ সালে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-এর এক তদন্তে দেখা গেছে, ৩,০০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত ৫,২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ি বিআরটিএ-তে নিবন্ধিত রয়েছে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকরা নিবন্ধন ফির সঙ্গে রোড ট্যাক্স পরিশোধ করেন। ২ বছরের জন্য এই ট্যাক্সের পরিমাণ ২,৩০০ টাকা এবং ১০ বছরের জন্য ১১,৫০০ টাকা। বাইক ছাড়া অন্যান্য মোটরযানের ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ক্ষমতা অনুযায়ী বার্ষিক ট্যাক্সের হার বর্তমানে ২৫,০০০ টাকা থেকে ৩,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
এনবিআরের সূত্র জানিয়েছে, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলগুলো নতুন এই অগ্রিম আয়করের আওতামুক্ত থাকতে পারে।
১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বার্ষিক কর ২,০০০ টাকা হতে পারে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। এছাড়া ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির বাইক মালিকদের বছরে ৫,০০০ টাকা এবং ১৬৫ সিসির ওপরের বাইকগুলোর জন্য বার্ষিক ১০,০০০ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হতে পারে।
এনবিআরের ওই কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, মূলত করের আওতা এবং কর পরিপালন (কমপ্ল্যায়েন্স) বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করলেও করদাতারা বছরের শেষে যখন আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন, তখন তা সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন।"
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৪৮ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দামী মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপ যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই রাইড-শেয়ারিং কর্মী, ডেলিভারি অপারেটর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ওষুধ সরবরাহকারী। এছাড়া অপেক্ষাকৃত কম আয়ের পরিবারগুলো শিশুর স্কুলে যাতায়াত, বাজার যাওয়া কিংবা নানান পারিবারিক কাজে সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে এটি ব্যবহার করেন।
এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম অবশ্য এই পদক্ষেপকে মোটের ওপর ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি টিবিএসকে বলেন, "বাইকের উপর এআইটি ইমপোজ (আরোপ) করা হলে রাজস্বের 'পয়েন্ট অব ভিউ' (দৃষ্টিকোণ) থেকে যৌক্তিক হবে। কারণ এর ফলে স্বচ্ছতা বাড়বে।"
এমন অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কর সংগ্রহ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, "২০১৪ সালে যখন আমরা দায়িত্বে ছিলাম, তখন কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১০.২ শতাংশ। এতদিনে তা না বেড়ে, উল্টো কমে ৭ শতাংশের নিচে চলে গেছে।"
তবে এটি করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষ ব্যবহার করেন, এমন বাইককে করের আওতায় আনা যৌক্তিক হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, "বিপুল সংখ্যক মানুষ মোটরসাইকেল চালিয়ে তাদের পরিবার চালায়। তাই তাদের ওপর বাড়তি করের চাপ দেওয়া যৌক্তিক হবে না।"
আলী আহমেদ নামের একজন বাইকার— যিনি ভাড়ায় বাইক চালিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন, টিবিএসকে বলেন, এই প্রস্তাবটি সংকটে থাকা রাইডারদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। "আমি ১২৫ সিসির বাইক চালাই। এখন আয় কমে গেছে, খরচ বেড়েছে। কিন্তু এর মধ্যে যদি আবার বছর বছর ট্যাক্স দিতে হয়, তাহলে সংসার চালাবো কীভাবে?"
তিনি বলেন, "সেফটির জন্য ১২৫ সিসি'র বাইকও যথেষ্ট নয়। অন্তত ১৫০ সিসি স্ট্যান্ডার্ড হওয়া উচিত। কিন্তু এভাবে ট্যাক্স আরোপ হলে, মানুষ বাধ্য হবে কম সিসি'র বাইক কিনতে। সেক্ষেত্রে এক্সিডেন্ট এর ঝুঁকি বাড়বে।"
অবশ্য বাইকের করের বিষয়টি গত বছর থেকেই আলোচনায় আসে, যখন রয়্যাল এনফিলস, ইয়ামাহা আরওয়ানফাইভ এর মত দামি বাইক রাস্তায় নামে। রয়্যাল এনফিল্ডের মোটরসাইকেলগুলো ঢাকায় বেশ আকর্ষণ তৈরি করে, যার দাম সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া আরওয়ানফাইভের দাম ৬ লাখ টাকার বেশি।
টাকা না থাকলে এত দামি বাইক কেনা সম্ভব নয় জানিয়ে তখন অনেকেই এসব বাইকারদের আয়কর ফাইল খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দেন।
ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য করের জাল
এনবিআরের সূত্র মতে, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে পরিকল্পনা অনুযায়ী বছরে ৫,০০০ টাকা এআইটি দিতে হতে পারে। এছাড়া পৌরসভা এলাকায় ২,০০০ টাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় চলাচলকারী যানের জন্য ১,০০০ টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে।
বর্তমানে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা না থাকায়—রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কোন সঠিক আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। তবে খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সারাদেশে এ ধরণের যানের সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি।
গত বছর সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে 'বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫'-এর খসড়া তৈরি করে। খসড়া নীতিমালায় নিবন্ধন সনদ, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন নেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে উল্লেখ আছে। সেইসঙ্গে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে এনবিআর নির্ধারিত হারে শুল্ক-কর আদায় করবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাটরিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সিংহভাগই অনিবন্ধিত। এদের করজালে আনা কঠিন।
