বাংলাদেশে নতুন ধরনের মাদকের নীরব বিস্তার
২৭ বছর বয়সী রায়ান (ছদ্মনাম) ঢাকার বসুন্ধরায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি অন্তত ডজনখানেকবার এমডিএমএ নামের একধরনের মাদক নিয়েছেন। মূলত শীতকালের বিভিন্ন পার্টি বা গানের আসরে তিনি এই মাদক নেন। তবে তিনি নিজে কখনো এটি কেনেননি।
বারিধারায় এক বাড়ির ছাদে আয়োজিত পার্টিতে তিনি প্রথমবার এই মাদক নেন। রায়ান বলেন, 'এটা এমনভাবে হাত ঘুরছিল, যেন কিছুই না! কেউ একজন একটা সিগারেট সাধছে বলে মনে হচ্ছিল।'
এই মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থা এতটাই ছোট ও গোপন যে কেউ সহজে ধরা পড়ে না। এটি যে অবৈধ, তা রায়ানও জানেন। কিন্তু তার মতে, 'যাদের কাছে এগুলো থাকে, তারা ওই ধরনের মানুষ নয় যাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে।'
মাদকের এই চিত্র গত কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক কর্মকর্তা এ এন এম শাকিল নেওয়াজ। বাহিনী ছাড়ার আগে বাংলাদেশে অভিজাত মাদকের প্রথম দিককার বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে ম্যাজিক মাশরুমের প্রথম চালান, ১২ কেজি আইসের চালান (যা তখন দেশের সবচেয়ে বড় আইস উদ্ধার ছিল) জব্দ এবং ফেন্টানাইলের একটি মামলা ছিল।
বাংলাদেশের মাদকের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে কিছুটা সময় নেন নেওয়াজ। এরপর বলেন, 'আপনারা এখন যা দেখছেন, তা আসলে নতুন কিছু নয়। এমডিএমএ, এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম, কেটামিন, ফেন্টানাইল—আমি এগুলোর সব কটি নিয়েই সফল অভিযান চালিয়েছি। কয়েক বছর আগে এর অনেকগুলোই ছিল বাংলাদেশে প্রথম উদ্ধারের ঘটনা।'
তার কথার অর্থ হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন আনুষ্ঠানিকভাবে যা নথিবদ্ধ করছে, তিনি এবং তার দল কয়েক বছর আগেই মাঠে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই মাদকগুলো অত্যন্ত নীরবে দেশে ঢুকেছে, নিজেদের বাজার তৈরি করেছে এবং শিকড় গেড়েছে। সরকারি নথিতে জায়গা পাওয়ার অনেক আগেই এগুলো মাদকসেবীদের কাছে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) নিজস্ব রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১২টি নতুন মাদক আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম আইসের সন্ধান মেলে। একই বছর এলএসডি এবং ডিএমটি আসে। ২০২৩ সালে সাইলোসাইবিন ট্যাবলেট এবং ২০২৫ সালে এমডিএমএ ধরা পড়ে।
এগুলো প্রতিটিই নির্দিষ্ট মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করেছে—আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান, অথবা বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন কাজে লাগিয়ে। ডিএনসির তথ্য বলছে, অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী তরুণদের মধ্যে হিরোইনের মতো প্রথাগত মাদকের চেয়ে এসব সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদকের ব্যবহার এখন তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাজারের ভেতরের আরেক বাজার
গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের মাদকের জগৎ মূলত ইয়াবা ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই মেথামফেটামিন-ক্যাফেইন ট্যাবলেট উপকূলীয় শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালে যেখানে ১ দশমিক ৩ মিলিয়নের কম ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ মিলিয়নে।
২০১৮-১৯ সালে সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানে র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কয়েক শ সন্দেহভাজন মাদক কারবারি নিহত হয়। এই অভিযানগুলো মূলত ইয়াবা ও এর সরবরাহ চক্র ঘিরেই পরিচালিত হয়েছিল।
কিন্তু এই পরিচিত কাহিনীর নিচেই আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাজার তৈরি হচ্ছিল। এই বাজার আকারে ছোট, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ এবং এর গ্রাহকশ্রেণিও সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই বাজার চলত টেলিগ্রাম, বিটকয়েন এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। এর গ্রাহকেরা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বা চাকরিজীবী—মূলত অভিজাত পরিবারের সন্তান। গুলশান-বনানীর ফ্ল্যাটে পার্টি করা এই তরুণদের কাছে এক গ্রাম এমডিএমএ বা এক টুকরো এলএসডি রাখাটা স্ট্যাটাস বা আভিজাত্যের প্রতীক। ঠিক যেমন আগের প্রজন্মের কাছে বিদেশি দামি হুইস্কি রাখাটা ছিল।
ডিএনসি এই মাদকগুলো দেশে প্রবেশের তিনটি প্রধান মাধ্যম চিহ্নিত করেছে—আন্তর্জাতিক ডাক সার্ভিস (ইএমএস, সাধারণ কুরিয়ার), বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান চক্র। সিনথেটিক মাদকগুলো যে দ্রুততায় ও ব্যাপকতায় ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, এদের রুটগুলো বেশ পোক্ত এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট চেকপয়েন্টে এগুলো আটকানো বেশ কঠিন।
নেওয়াজ এগুলোকে 'এলিট ড্রাগস' বা অভিজাত মাদক বলে ডাকেন। তিনি বলেন, 'গুলশান-বনানীতে লোকজন এটি ব্যবহার করে নিজেদের 'কুল' প্রমাণ করতে। যেমন, আমার কাছে মলি (এমডিএমএ) আছে, আমি কুল।'
তিনি আরও জানান, এই বাজারটি একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে নিয়ন্ত্রিত। এখানে গণহারে বিক্রি হয় না, রাস্তার মোড়েও বিক্রি হয় না। সরবরাহ খুবই কম, দাম অনেক চড়া। মূলত এই দুষ্প্রাপ্যতাই এই মাদকের একটি বড় সামাজিক আকর্ষণ।
এমডিএমএ কী করে?
এমডিএমএ মস্তিষ্কে সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণ করে। এই নিউরোট্রান্সমিটার মানুষের মেজাজ ভালো রাখতে এবং সামাজিক বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনও নিঃসরণ করে। এর ফলে ব্যবহারকারী বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে নিজেকে সজাগ, অন্যদের প্রতি আন্তরিক এবং ভয়হীন অনুভব করেন।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা পিটিএসডি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) বা মানসিক আঘাতজনিত রোগের চিকিৎসায় এর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। এর ফলে পাশ্চাত্যে এর ক্লিনিক্যাল ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যদিও এটি প্রায় সব জায়গায় এখনো নিষিদ্ধ।
এমডিএমএ কীভাবে মানুষের মনোযোগ বাড়ায়, তা ব্যাখ্যা করে নেওয়াজ বলেন, 'এটি আপনার স্নায়ুর কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কেউ যদি ইন্টারনেটে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করে, তবে সে ৭-৮ ঘণ্টা, এমনকি এক দিন টানা সেই কাজ করতে পারে। ৩-৪ দিন তারা খুব সক্রিয় থাকে। কিন্তু এরপর স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে তাদের অন্তত দুই দিন টানা ঘুমাতে হয়।'
মাদকের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর এর ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথাও চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। এমডিএমএ মস্তিষ্কের সেরোটোনিন মজুত খালি করে দেয়। মাদক নেওয়ার কয়েক দিন পর ব্যবহারকারীরা চরম ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং বিষণ্ণতায় ভোগেন।
এর যে বিষয়টি খুব কম আলোচিত হয়, তা হলো দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ক্ষতি (নিউরোটক্সিসিটি)। কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত বা বারবার এমডিএমএ ব্যবহার সেরোটোনিন তৈরিকারী নিউরনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে স্মৃতিশক্তি ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এমনভাবে নষ্ট হতে পারে, যা মাদক ছাড়ার পরও দীর্ঘ সময় থেকে যায়। অল্প মাত্রায় নিলে এটি হয়তো ততটা ভয়ংকর নয়, যতটা প্রচার করা হয়; কিন্তু এটি কোনো নির্দোষ পার্টির উপাদানও নয়।
নেওয়াজ ২০২২ সালের একটি ঘটনার কথা জানান, যেখানে ডিএমটি-সহ কয়েকজন তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা লজ্জাবতী গাছ ও কৃষ্ণচূড়ার ছাল থেকে নির্যাস নিয়ে দেশেই এই মাদক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি এবং মামলাটিও আর সেভাবে এগোয়নি। কিন্তু এটি প্রমাণ করে যে এই মাদক উৎপাদনের অবকাঠামো এখন আর শুধু বিদেশের ওপর নির্ভরশীল নয়।
এলএসডি এবং সেই মৃত্যু
বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এলএসডি ধরা পড়ে ২০১৯ সালে। তবে ২০২১ সালের মে মাসের আগপর্যন্ত এটি নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। ওই সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেই নিজেকে আঘাত করেন। আট দিন পর তার ভাই লাশ শনাক্ত করেন।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে কার্জন হল এলাকায় হাফিজুরকে তার তিন বন্ধু এলএসডি দিয়েছিলেন। তিনি আগে কখনো এটি নেননি। এই ঘটনার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা 'আপনার আব্বা' এবং 'বেটার ব্রাউনি অ্যান্ড বিয়ন্ড' নামের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করত।
তদন্তে জানা যায়, 'টিম' নামের এক সরবরাহকারী নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডির ব্লটার (কাগজের টুকরো) কুরিয়ার করে পাঠাত। প্রতিটি ব্লটার ডিলারদের ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় কিনতে হতো, যা তারা ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকায় বিক্রি করত। ওই ফেসবুক গ্রুপে এক হাজারের বেশি সদস্য ছিল।
এর আগে ২০২২ সালে নেওয়াজ একটি এলএসডির মামলায় যুক্ত ছিলেন। বনানীতে কয়েকজন ডিলারকে গ্রেপ্তার করেছিলেন তিনি।
এলএসডির প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, 'এটি মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিতে প্রভাব ফেলে। তারা অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানায়। ব্যবহারকারীরা হয় ভালো, নাহয় খারাপ অনুভূতির (ট্রিপ) শিকার হয়। ভালো অনুভূতির জন্য তাদের শান্ত ও মনোরম জায়গা দরকার হয়। হাফিজের আত্মহত্যার পেছনে খারাপ ট্রিপের প্রভাব থাকতে পারে।'
তবে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা আরও জটিল। এলএসডি মূলত সেরোটোনিন-২এ রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়। ইয়েল ইউনিভার্সিটির নিউরো-ইমেজিং গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ভেঙে দেয়। এর ফলেই হ্যালুসিনেশন (ভ্রম) হয় এবং নিজের অস্তিত্ব বা সত্তার অনুভূতি হারিয়ে যায়। গবেষকেরা একমত যে এলএসডির প্রভাব ব্যবহারকারীর পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল। একটি 'ব্যাড ট্রিপ' বা খারাপ অভিজ্ঞতা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
নেওয়াজ বলেন, 'ব্যাড ট্রিপ মানে আপনি আপনার অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। তখন আপনার মস্তিষ্ক কেবল নেতিবাচক জিনিসগুলো ধরে। মনে হয়, পৃথিবীর সবাই আপনার শত্রু। এ জন্যই এলএসডি ব্যবহারকারীরা শান্ত পরিবেশের জন্য বান্দরবান বা কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক জায়গায় যায়।'
নেওয়াজ যে নেটওয়ার্কের কথা বর্ণনা করেছেন, ঠিক সেই একই চক্র এখনো বাংলাদেশে এলএসডি আনছে। সেই একই বৈশিষ্ট্য এখনো রয়েছে—উচ্চবিত্ত পরিবারের ছোট গ্রুপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিংয়ের (নিরাপদ বার্তা) মাধ্যমে বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাধারণ ডাক সার্ভিসের ব্যবহার, যা মাইক্রোগ্রামে মাপা বস্তু স্ক্রিনিং করতে সক্ষম নয়।
কেটামিন এবং উত্তরার ল্যাবরেটরি
২০২৬ সালের মার্চ মাসে ডিএনসি উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন—ইউ ঝে (৩৬), লি বিন (৫৯) এবং ইয়াং চুনশেং (৬২)। ওই ফ্ল্যাটের ভেতর একটি অস্থায়ী ল্যাবরেটরি ছিল। ওই ব্যক্তিরা তরল কেটামিনকে পাউডারে পরিণত করে ব্লুটুথ স্পিকার ও সাউন্ড ইকুইপমেন্টের ভেতরে লুকিয়ে শ্রীলঙ্কায় পাচার করছিল। সেখান থেকে ৬ কেজি কেটামিন, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেজিং মেশিন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত একটি পেনড্রাইভ উদ্ধার করা হয়।
একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার অফিসে একটি পার্সেল আটকানোর পর এই তদন্ত শুরু হয়। ব্লুটুথ স্পিকারের ভেতর লুকানো ওই পার্সেলে ৫০ গ্রাম কেটামিন ছিল। ফরেনসিক বিশ্লেষণে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সূত্র ধরে উত্তরার ওই ফ্ল্যাটে পৌঁছায় ডিএনসি।
নেওয়াজ এই ধরনের পরিস্থিতির আঁচ আগেই পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে জেনেরিক কেটামিন ওষুধ সহজে পাওয়া যায় বলেই চীনারা ল্যাব বসাচ্ছিল। তাদের শুধু তরল ফর্মকে পাউডারে রূপান্তর করার দরকার ছিল।'
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কেটামিন উদ্ধারের পরিমাণ মাত্র এক বছরে ১৬৭ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২৭.৪ টনে পৌঁছেছে। অপরাধী চক্রগুলো মেথামফেটামিনের সঙ্গে কেটামিন মিশিয়ে পাচার করছিল। বাংলাদেশও এই নতুন বাজারের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কেটামিন হলো এমন একটি চেতনানাশক, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকায় রয়েছে এবং সার্জারিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে নেশার জন্য নিলে এটি ব্যবহারকারীকে নিজের শরীর ও পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমডিএমএ এবং এলএসডির মতো এটিও মূলত অভিজাত চক্রের মাধ্যমেই বাংলাদেশে এসেছে। তবে উত্তরার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এটি বড় পরিসরে এবং আঞ্চলিক রপ্তানির উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে।
ফেন্টানাইলের অদৃশ্য হুমকি
উত্তর আমেরিকায় ফেন্টানাইলের কারণে যে ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বাংলাদেশে এখনো তা দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য মাদকের সঙ্গে মিশ্রিত অবৈধ ফেন্টানাইল ব্যবহারের কারণে এক বছরেই ওভারডোজে (অতিরিক্ত মাত্রা) ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে নেওয়াজ এই মাদক নিয়ে সতর্ক করেছেন।
২০২২ সালের একটি অভিযানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র থেকে জীবন রক্ষাকারী সাধারণ ওষুধের হিসেবে ফেন্টানাইল নিয়ে আসছিল এমন একজনকে আমি ধরেছিলাম।'
ফেন্টানাইল মরফিনের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। দেখতে অন্যান্য পাউডারের মতো হওয়ায় একে আলাদা করা কঠিন এবং ওষুধের বৈধ সরবরাহের আড়ালে এটি সহজেই সংগ্রহ করা যায়।
ইউএনওডিসি জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে হিরোইন, কোকেন এবং এমনকি এমডিএমএ-র সঙ্গে অবৈধ ফেন্টানাইল মেশানো হচ্ছে, যা অনেক ব্যবহারকারী টের পান না। বাংলাদেশে ফেন্টানাইল-মিশ্রিত মাদকে মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এ ধরনের মিশ্রণ শনাক্ত করার জন্য যে ফরেনসিক অবকাঠামো প্রয়োজন, তা এখনো মাঠপর্যায়ের অভিযানে পুরোপুরি নেই।
ডিএনসি এই শনাক্তকরণ ঘাটতিকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার জন্য তারা এখনো প্রাথমিক রাসায়নিক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল, যা নতুন যৌগ বা ভেজাল শনাক্ত করতে পারে না। অধিদপ্তর বলছে, বিমানবন্দরে আধুনিক স্ক্যানার বসাতে এবং বিপুল পরিমাণ মাদক পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবরেটরি তৈরি করতে তাদের আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
ম্যাজিক মাশরুম এবং মোহাম্মদপুরের গ্রিনহাউস
নেওয়াজ জানান, বাংলাদেশে ম্যাজিক মাশরুম প্রথম তিনিই জব্দ করেছিলেন। সাইলোসাইবিন মাশরুম নামের এই মাদকটি চকলেট হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল এবং ক্রেতারা অনেক সময় জানতই না তারা কী খাচ্ছে। এ বিষয়ে ২০২১ সালের জুলাইয়ে হাতিরঝিল থেকে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের মধ্যে একজন ২০১৯ সাল থেকে এলএসডি ও ডিএমটি ব্যবহার করছিল। সে কানাডায় থাকা তার ছোটবেলার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে ২০২১ সালের মে মাসে প্রথম চালানটি দেশে আনে। র্যাব যখন তাদের গ্রেপ্তার করে, তখন তারা নিজেরাও এটি ব্যবহার করত এবং বিক্রিও করত।
সাইলোসাইবিন এলএসডির মতোই সেরোটোনিন-২এ রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে এর প্রভাব এলএসডির চেয়ে কম সময় থাকে এবং শুরুতে কিছুটা মৃদু হয়। ক্লিনিক্যাল গবেষণায় হতাশা বা বিষণ্ণতার চিকিৎসায় এটির সম্ভাবনা আছে বলে দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে চিকিৎসায় এর কোনো ব্যবহার নেই। এখানে এর একটি ছোট সরবরাহ চেইন, এনক্রিপ্টেড অর্ডার এবং শুধু অভিজাত শ্রেণির ক্রেতা রয়েছে।
নেওয়াজ নিজেকে 'মাদক বিজ্ঞানী' দাবি করা এক ব্যক্তির কথাও জানান, যিনি মোহাম্মদপুরের একটি ভাড়া বাসাকে গ্রিনহাউস ও মাদক তৈরির কারখানায় পরিণত করেছিলেন। সেখানে হোয়াইট উইডো, ব্লুবেরি সি কেক, আফগান কুশ-এর মতো বিভিন্ন প্রজাতির কুশ জব্দ করা হয়েছিল।
২০২২ সালে গুলশানে চালানো আরেকটি অভিযানে নেওয়াজের দল কুশ, হেম্প, মলি, ফেন্টানাইল, অ্যাডেরাল এবং নগদ টাকায় ভর্তি ট্রাভেল ব্যাগ উদ্ধার করেছিল, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার ডলার এবং ২ দশমিক ৪ কোটি টাকা ছিল। ওই 'মাদক বিজ্ঞানী' শুধু অভিজাত শ্রেণির এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছেই মাদক সরবরাহ করতেন।
এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে অভিজাত মাদকের বাজারটি আসলে কাদের দখলে। এটি শুধু পার্টির তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সরবরাহ চেইনে এমন মানুষ জড়িত, যাদের অর্থ, যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার কারণে পার পেয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
পরিসংখ্যান কী বলে?
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে ২২ দশমিক ৮ মিলিয়ন থেকে ৪৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন বড়িতে পৌঁছেছে। কোকেন জব্দ করার পরিমাণ ২০২৩ সালের ১৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৩০ কেজি হয়েছে। তবে হিরোইন ও ফেনসিডিল জব্দের পরিমাণ যথাক্রমে ১৫ শতাংশ ও ৪৪ শতাংশ কমেছে।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায় যে মাদকের ব্যবসা কমেনি, বরং এর গতিপথ বদলেছে। কিছু পথ বন্ধ হয়েছে, আর কিছু নতুন পথ খুলেছে।
কোকেনের বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে কোকেনের বাজার খুবই ছোট। এই বিপুল পরিমাণ কোকেন উদ্ধারের মানে হলো, দক্ষিণ আমেরিকার কোকেন ঢাকা হয়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পাচার হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পাচার চক্রগুলো বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
নেওয়াজ যে মাদকের বাজারের কথা বলেছেন, তার আকার বা পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য নেই। ডিএনসির রেকর্ডে এগুলো মূলত বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তারের ঘটনা হিসেবেই রয়েছে—কখনো একজন ছাত্র, কখনো অভিজাত পরিবারের সন্তান, আবার কখনো উত্তরার ফ্ল্যাটে কোনো চীনা নাগরিক। কিন্তু এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো যোগ করে পুরো বাজারের আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না।
তথ্যের এই অভাবটাই এক ধরনের তথ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু গ্রেপ্তারের সময়ই মামলাগুলো নথিবদ্ধ করছে। কিন্তু এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং আন্তর্জাতিক ডাক সার্ভিসের মাধ্যমে যে সরবরাহ চেইন চলছে, তা খুঁজে বের করা বা ম্যাপ করার মতো ব্যবস্থা এখনো নেই।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
হাই-এন্ড বা অভিজাত মাদক সবার জন্য নয়। সাধারণ বাজার—যেমন মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, যশোর দিয়ে ফেনসিডিল বা রাজশাহী দিয়ে হিরোইন—সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনীতি এবং ভিন্ন পুলিশি চাপে কাজ করে। অন্যদিকে অভিজাত বাজারটি অনেক ছোট, দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং সহজে চোখে পড়ে না। এটি বাংলাদেশের শহরগুলোর পরিবর্তনেরও এক নীরব চিত্র তুলে ধরে।
ডিএনসি বলছে, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকই হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মূল কারণ মাদকের পরিমাণ নয়, বরং এর বিস্তার ও পরিবর্তনের গতি।
কৃত্রিম মাদক দেশেই সহজে তৈরি করা যায়, রাসায়নিক পরীক্ষায় ধরা কঠিন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এর অস্তিত্ব টের পাওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে তা তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়। প্রতিটি নতুন মাদকের চক্র—প্রথমে আইস, তারপর এলএসডি, সাইলোসাইবিন এবং এরপর এমডিএমএ—প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়ে মাদকের বাজার অনেক বেশি দ্রুত এগোচ্ছে।
ডিএনসি ইতিমধ্যে একটি ডেডিকেটেড ফরেনসিক ল্যাবরেটরি, অনলাইনে মাদকের বাজার পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং অর্থ পাচার তদন্ত ইউনিট তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নত বডি স্ক্যানার বসানো হচ্ছে। কাস্টমস ও সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে যৌথ টাস্কফোর্সও গঠন করা হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা আড়ালে স্বীকার করছেন, এসব প্রতিষ্ঠান ২০২৬-২০২৭ সালের আগে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারবে না।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবে এবং টেলিগ্রাম গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের নেটওয়ার্কের মতো তারা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারবে কি না—তা এখনো অজানা।
তবে এটি পরিষ্কার যে সরকারি নথিতে বড় হুমকি হিসেবে আসার অনেক আগেই নেওয়াজ ম্যাজিক মাশরুম, আইসের বড় চালান, ফেন্টানাইল এবং এলএসডি জব্দ করেছিলেন।
নেওয়াজ যে কথাগুলো বলেছেন, তা মূলত গোয়েন্দা ব্যর্থতারই এক নীরব স্বীকারোক্তি। কারণ, কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই এই মাদকগুলো দেশে এসে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল।
