শতবর্ষে পা রাখলেন কিংবদন্তি প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো, তার সম্মানে নতুন প্রজাতির নামকরণ
কিংবদন্তি প্রকৃতিবিদ ও প্রখ্যাত সম্প্রচারক স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর শততম জন্মদিন উপলক্ষে তার প্রতি সম্মান জানিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রজাতির বোলতার (ওয়াস্প) নামকরণ করেছেন তার নামে।
'অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস টাউ' (Attenboroughnculus tau) নামের এই বোলতাটি ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ চিলির ভালদিভিয়া প্রদেশ থেকে আবিষ্কৃত হওয়ার পর লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ছিল।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের পতঙ্গ বিভাগের প্রধান কিউরেটর গ্যাভিন ব্রড জানান, মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায় কোনো নমুনা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ বা শ্রেণীবিন্যাস করার আগে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্রড এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা বৃহস্পতিবার 'জার্নাল অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি'-তে প্রকাশিত হয়।
তিনি বলেন, "নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার বিষয়টি কখনো খুব দ্রুত ঘটে—আপনি কিছু খুঁজে পান এবং সাথে সাথেই সেটির বর্ণনা দেন। আবার কখনো এটি বেশ ধীরগতিতে হয়; অন্যদের বছরের পর বছর ধরে জমানো সংগ্রহগুলো নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে কাজ করতে হয়।"
গবেষণাপত্রের সহ-লেখক ও স্বেচ্ছাসেবক অগাস্টিন ডি কেটেলায়ের মিউজিয়ামের 'ইচনিউমন' (ichneumon) বোলতাগুলোর ওপর একটি জরিপ চালানোর সময় এই প্রজাতিটি প্রথম শনাক্ত করেন। এটি পরজীবী বোলতার একটি বিশাল গোষ্ঠী—যেখানে বর্তমানে প্রায় ২৫,০০০ শনাক্ত হওয়া প্রজাতি রয়েছে এবং ধারণা করা হয়, আরও প্রায় ৭৫,০০০ প্রজাতির নামকরণ এখনও বাকি।
৪৩ বছরের পুরনো এই নমুনাটি নিবিড়ভাবে পরীক্ষার পর দেখা যায়, এটি কেবল একটি অজানা প্রজাতিই নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন 'জেনাস' (গণ)—যা সমগোত্রীয় প্রজাতির একটি উচ্চতর শ্রেণীবিন্যাস। স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর জন্মদিনে প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের প্রতি তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই নামকরণ করা হয়েছে।
গবেষক গ্যাভিন ব্রড বলেন, "আমরা এটি এবং এর সব সমগোত্রীয় প্রজাতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর দিয়েছি। আমরা বুঝতে পারি, এর বৈশিষ্ট্যগুলো এমন এক অনন্য সংমিশ্রণ যা আগে কোনো শ্রেণির সঙ্গে মেলেনি। তাই এই চমৎকার ছোট্ট প্রজাতিটিকে জায়গা দিতে আমাদের একটি নতুন গণের বর্ণনা দিতে হয়েছে।"
বোলতাটি লম্বায় মাত্র ৩.৫ মিলিমিটার। এর পেটটি বেশ সরু ও বাঁকানো। এটি চিলি, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ গিনির স্থানীয় বোলতাদের একটি ছোট উপ-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
ব্রড এই প্রজাতির বিস্তৃতি সম্পর্কে বলেন, "এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি সত্যিই অদ্ভুত। এগুলো মূলত 'গন্ডোয়ানা' নামক একটি সুপারকন্টিনেন্টের আমলের অবশিষ্টাংশ।" গন্ডোয়ানা ছিল এমন একটি বিশাল ভূখণ্ড যা আজকের দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, আরব, মাদাগাস্কার, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে গঠিত ছিল এবং প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে এটি ভাঙতে শুরু করে।
ব্রড আরও যোগ করেন, "এই ছোট্ট বোলতাগুলো সাবেক গন্ডোয়ানার এলাকাগুলোতেই কোনোমতে টিকে আছে, তবে বিশ্বের অন্যান্য অংশে সম্ভবত তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।"
বহু মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা
১৭৫০-এর দশকে সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস প্রজাতির নামকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যাকে দ্বিপদ নামকরণ বলা হয়। এতে দুটি ল্যাটিন বা ল্যাটিন আদলের শব্দ ব্যবহার করা হয়: প্রথমটি দিয়ে 'জেনাস' বা গণ এবং দ্বিতীয়টি দিয়ে নির্দিষ্ট প্রজাতিকে শনাক্ত করা হয়। 'অ্যাটেনবারোঙ্কুলাস টাউ'-এর ক্ষেত্রে জেনাস বা গণের অংশে ডেভিড অ্যাটেনবরোর নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। আর প্রজাতির নাম 'টাউ' রাখা হয়েছে পতঙ্গটির পেটের ওপর থাকা বিশেষ চিহ্নের কারণে, যা দেখতে ইংরেজি 'টি' বা গ্রিক বর্ণ 'টাউ'-এর মতো।
শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যা (ট্যাক্সোনমি) কেবল জীববিজ্ঞানের ভিত্তিই নয়, বরং বিলুপ্তির হাত থেকে কোনো প্রাণীকে রক্ষার জন্যও এর একটি সুনির্দিষ্ট নাম থাকা জরুরি। বর্তমানে বিশ্বে শ্রেণীবিন্যাসবিদের সংকট রয়েছে এবং অসংখ্য নতুন প্রজাতি নামকরণের অপেক্ষায় পড়ে আছে।
তবে কোনো প্রজাতির নামকরণ খুব একটা জটিল বিষয় নয়। ড. ব্রড বলেন, "এখানে খুব বেশি কড়া নিয়ম নেই। তবে কিছু নির্দেশিকা আছে, যেমন—খুব বাজে কোনো ব্যক্তি বা নিজের নামে কোনো কিছুর নামকরণ না করাই ভালো, কারণ এটি দেখতে দৃষ্টিকটু লাগে।"
তিনি আরও বলেন, "কারো নামে কোনো জেনাসের নামকরণ করা বেশ বিশেষ একটি বিষয়। কারণ নতুন কোনো জেনাসেরর খোঁজ পাওয়া তুলনামূলক কঠিন—আমরা ইতোমধ্যে অধিকাংশ জেনাস শনাক্ত করে ফেলেছি, কিন্তু অধিকাংশ প্রজাতির নামকরণ এখনও বাকি। ডেভিড অ্যাটেনবারো একটি জেনাসের সম্মান পাওয়ার দাবি রাখেন, আমার মনে হয় সবাই এ বিষয়ে একমত হবেন।"
অ্যাটেনবারোর কাজ দেখেই বিজ্ঞানের প্রতি ব্রডের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, "অ্যাটেনবারোর 'লাইফ অন আর্থ' ও 'লিভিং প্ল্যানেট' দেখে এবং তার বই পড়েই আমি বড় হয়েছি। তার কারণেই আমি মূলত জানতে পেরেছিলাম শ্রেণীবিন্যাসবিদ আসলে কী। স্যার ডেভিডের শততম জন্মদিন ঘনিয়ে আসায় আমি ভেবেছিলাম তার নামে একটি জেনাসের নামকরণ করার এটিই সেরা সুযোগ। 'অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস' নামটা উচ্চারণ করা কিছুটা কঠিন হতে পারে, তবে আশা করি তিনি এতে খুব একটা কিছু মনে করবেন না।"
নতুন এই বোলতার নামকরণের খবর পেয়ে অ্যাটেনবারো ব্রডকে হাতে লেখা একটি ধন্যবাদপত্র পাঠিয়েছেন। এই কিংবদন্তি প্রকৃতিবিদের নামে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে মাছ, মাকড়সা, পাখি, টিকটিকি, বিটল, শামুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গাছপালাও রয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে অ্যাটেনবারোর পদবি অনুযায়ী, যেমন নিউ গিনিতে পাওয়া এক প্রজাতির বিপন্ন একিডনার নাম রাখা হয়েছে 'জাগ্লোসাস অ্যাটেনবরোই' (Zaglossus attenboroughi)। তবে কখনো কখনো এই সম্মাননা আরও রূপকধর্মী হয়; যেমন—সমুদ্রের এক ধরণের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন 'সাইরাকোস্ফেরা আজুরপ্লানেটা' (Syracosphaera azureaplaneta), যার নাম রাখা হয়েছে অ্যাটেনবরোর ২০০১ সালের বিখ্যাত তথ্যচিত্র 'দ্য ব্লু প্ল্যানেট'-এর নামানুসারে।
চিলির এই বোলতা প্রজাতি ছাড়াও আরও বেশ কিছু গণের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাবনে পাওয়া এক ধরণের গাছ 'সারডেভিডিয়া' এবং জুরাসিক যুগের বিলুপ্ত সামুদ্রিক সরীসৃপ 'অ্যাটেনবরোসরাস'।
গবেষক ব্রড বলেন, "অ্যাটেনবারো আমাদের এই পৃথিবী এবং এর প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক গভীর ধারণা দিয়েছেন। তার একটি সিরিজের নাম 'দ্য প্রাইভেট লাইফ অফ প্ল্যান্টস'—আমার মনে হয় এই একটি নামেই সবকিছু প্রকাশ পায়। তিনি উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের এমন অনেক দিক আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন যা আগে আমাদের অজানা ছিল। বর্তমানে তিনি বিপন্ন প্রজাতির সুরক্ষায় এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন এবং আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের এখনই কিছু করা উচিত।"
১৯২৬ সালের ৮ মে ইংল্যান্ডের আইলওয়ার্থে জন্ম নেওয়া অ্যাটেনবরোর বিবিসির মাধ্যমে পর্দায় অভিষেক ঘটে ১৯৫৪ সালে 'জু কোয়েস্ট' সিরিজের মাধ্যমে। দুইবার নাইট উপাধিতে ভূষিত এই প্রকৃতিবিদের ঝুলিতে রয়েছে ৩০টিরও বেশি সম্মানসূচক ডিগ্রি। ২০১১ সালে ৮৪ বছর বয়সে 'ফ্রোজেন প্ল্যানেট' সিরিজের চিত্রায়নের সময় তিনি উত্তর মেরু ভ্রমণকারী প্রবীণতম ব্যক্তিদের তালিকায় নাম লেখান। শত বছর বয়সে পৌঁছেও তিনি এখনো ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ব্রিটিশ বাড়ির পেছনের আঙিনার বন্যপ্রাণী নিয়ে 'সিক্রেট গার্ডেন' নামের একটি সিরিজে ধারাভাষ্য দিয়েছেন।
