বন্ধ হলো স্পিরিট এয়ারলাইন্স: যুদ্ধের জেরে মার্কিন এভিয়েশন শিল্পের প্রথম বড় ক্ষতি
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বেলআউট বা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় ঋণদাতাদের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে স্পিরিট এয়ারলাইন্স। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মার্কিন এই বিমান সংস্থাটির পতনকে ইরান যুদ্ধের কারণে এভিয়েশন বা বিমান চলাচল শিল্পের প্রথম বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। এর প্রভাবেই সংস্থাটির পতন হলো, যার কারণে হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারাবেন।
এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। তার ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টা এবং কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকানের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্পিরিট এয়ারলাইন্সকে বাঁচাতে ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
স্পিরিট যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচলের প্রায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এত বড় কোনো এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়নি। এই সংস্থাটি সস্তায় টিকিট দেওয়ায় বড় বড় বিমান সংস্থাগুলোও অনেক রুটে টিকিটের দাম কম রাখতে বাধ্য হতো।
সব ফ্লাইট বাতিল, লাভবান হবে অন্য কোম্পানিগুলো শুক্রবার গভীর রাতে স্পিরিট-এর পরিচালনা পর্ষদের একটি বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এর পরই এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এবং ব্যবসায়িক চাপের কারণে তারা ধীরে ধীরে তাদের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে।
সংস্থাটি যাত্রীদের বিমানবন্দরে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে এবং তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। বিমান পরিবহন বিশ্লেষক সংস্থা সিরিয়ামের তথ্যমতে, মে মাসের ১ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত স্পিরিটের ৪ হাজার ১১৯টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সূচি ছিল, যেখানে প্রায় আট লক্ষ সিট ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হয়। এরপর থেকেই বিশ্ববাজারে বিমানের জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়ছে। এভিয়েশন শিল্পে কোভিড-১৯ মহামারির পর এটিকে সবচেয়ে খারাপ সংকট হিসেবে ধরা হচ্ছে। জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার আগে থেকেই স্পিরিট এয়ারলাইন্স লাভের মুখ দেখতে সংগ্রাম করছিল।
সস্তায় বিমানযাত্রা করানো স্পিরিটের মূল ইউএসপি ছিল। যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ বা সিট নির্বাচনের মতো সুবিধাগুলো না দিয়ে শুধু কম ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছানোই ছিল তাদের ব্যবসা মডেল।
তবে করোনা মহামারির পর মানুষের মধ্যে আরামদায়ক বিমানযাত্রার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এ ধরনের আল্ট্রা-লো-কস্ট বা অত্যন্ত সস্তা ক্যারিয়ারগুলো বিপদে পড়ে যায়।
স্পিরিট এয়ারলাইন্সের বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রতিযোগী কোম্পানি যেমন—জেটব্লু এয়ারওয়েজ এবং ফ্রন্টিয়ার এয়ারলাইন্সের লাভ হবে।
শুক্রবার স্পিরিটের শেয়ারের দাম ২৫ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে ফ্রন্টিয়ারের শেয়ার ১০ শতাংশ এবং জেটব্লু-র শেয়ার ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে, জেটব্লু জানিয়েছে যে, তারা স্পিরিটের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর মধ্যে একটি—ফোর্ট লডারডেল থেকে নতুন ১১টি শহরে ফ্লাইট চালু করবে।
জ্বালানির ধাক্কায় সংকটে ছোট কোম্পানিগুলো
স্পিরিট এয়ারলাইন্সের এই পতন ওয়াশিংটনের শুরু করা ইরান যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ক্ষতিকর দিকগুলোকে সামনে এনেছে। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির হোয়ার্টন স্কুলের অর্থনীতিবিদ মোহামেদ এল-এরিয়ানের মতে, 'যুদ্ধ এভাবে ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য দুর্বল ব্যবসাগুলোও ডুবে যাবে। পাশাপাশি, সাধারণ পরিবার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হবে।'
এই ঘটনা দেখায় যে, জ্বালানির চড়া দাম ছোট ও দুর্বল এয়ারলাইন্সগুলোকে কীভাবে বিপদে ফেলেছে। স্পিরিটের হিসাব ছিল, ২০২৬ সালে বিমানের জ্বালানির দাম ২.২৪ ডলার এবং ২০২৭ সালে ২.১৪ ডলারে নেমে আসবে। কিন্তু এপ্রিলে সেই দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৪.৫১ ডলার হয়ে যায়।
জ্বালানি হলো এয়ারলাইন্স ব্যবসার মূল খরচের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ, ফলে বাড়তি ঋণ ছাড়া টিকে থাকা তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল।
মার্কিন যোগাযোগ বা পরিবহন মন্ত্রী শন ডাফি বলেন, তারা অনেক এয়ারলাইন্সকে স্পিরিট কেনার প্রস্তাব দিলেও কেউই সাড়া দেয়নি। তিনি রয়টার্সকে বলেন, 'যদি কেউ এটা কিনতেই না চায়, তবে আমরা কেন কিনব?'
এই চুক্তির সাথে জড়িত এক ঋণদাতা বলেছেন, 'ট্রাম্প প্রশাসন স্পিরিটকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একটি মৃত দেহে তো আর প্রাণ ফিরিয়ে আনা যায় না।'
স্পিরিটের হিসাব অনুযায়ী, তাদের দ্বিতীয়বার দেউলিয়াত্ব বা ব্যাঙ্ক্রাপ্টসি থেকে মে-জুনের দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু জেট ফুয়েলের হঠাৎ দাম বৃদ্ধি সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়।
সিরিয়াম-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে তারা প্রায় ১৭ লক্ষ অভ্যন্তরীণ যাত্রী বহন করেছিল, কিন্তু তাদের বাজার শেয়ার গত বছরের ৫.১ শতাংশ থেকে কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসে।
স্পিরিটের সব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অন্যান্য মার্কিন বিমান সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য 'রেসকিউ ফেয়ার' বা বিশেষ ভাড়ার সুবিধা দিচ্ছে। ফ্রন্টিয়ার, জেটব্লু, সাউথওয়েস্ট, ইউনাইটেড এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্স স্পিরিটের বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য কম ভাড়ায় টিকিটের ব্যবস্থা করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন যে তার সরকার সঠিক দামে স্পিরিট কিনে নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এর আগে সরকার আমেরিকান করপোরেট প্রতিষ্ঠান ইন্টেল-এর ১০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেওয়ায় এটি একটি বড় সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ হতে পারতো। জানা যায়, স্পিরিটকে বাঁচানোর জন্য সরকার ৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে এ নিয়ে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মতভেদ ছিল।
