যুদ্ধের পর চীনের সঙ্গে আরও নৈকট্য বাড়াতে প্রস্তুত উপসাগরীয় দেশগুলো
ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছে। গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার মূলে থাকা দুটি মূল ধারণাকেই নাড়িয়ে দিয়েছে এই যুদ্ধ।
এতদিন উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির চাকা ঘুরত এক ধরনের স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে।
করমুক্ত সুবিধা, ব্যবসার নমনীয় নিয়মকানুন আর আধুনিক স্টার্টআপ কালচার এই স্থিতিশীলতাকে আরও মজবুত করেছিল।
অন্যদিকে, নিরাপত্তার জন্য তারা পুরোপুরি নির্ভর করত 'তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা' নামের এক পুরোনো চুক্তির ওপর। আমেরিকার ছড়ানো সামরিক ঘাঁটি আর অত্যাধুনিক অস্ত্রের ওপর ভর করেই টিকে ছিল এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বলয়।
কিন্তু প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। যুদ্ধের সময় প্রতিটি উপসাগরীয় দেশই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
এই বাস্তবতা তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিরাপত্তার জন্য চোখ বুজে আর কেবল ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা করা যায় না। বাধ্য হয়েই এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন নতুন কোনো রক্ষাকর্তার খোঁজে প্রাচ্যের দিকে, বিশেষ করে চীনের দিকে তাকাতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের পর টিকে থাকার জন্য কেবল নতুন পথ খোঁজাই নয়, বরং তা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব জাদুকরীভাবে বেড়েছে। তাই সম্পর্ক আরও গভীর করার ক্ষেত্রে চীনকেই এখন সবচেয়ে ভরসার জায়গা বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে জিসিসি সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের সফরের পর এই সম্পর্ক এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
গত বছর চীন ও জিসিসি-এর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার, যা প্রমাণ করে চীন এখন এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার।
আগে এই বিনিয়োগ কেবল জ্বালানি ও বন্দর প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি উভয় পক্ষকেই আরও গভীর সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি খাতের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমটি হলো পরিবেশবান্ধব বা সবুজ জ্বালানি।
এই খাতে চীন এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী; বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮০ শতাংশই তাদের হাতে।
২০২৫ সালে চীনের বায়ুবিদ্যুৎ যন্ত্রের রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে, আর ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদনের ৭০ শতাংশই এখন তাদের দখলে। চীনের এই আধিপত্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। বিওয়াইডি বা গিলির মতো চীনা কোম্পানির হাত ধরে তারা নিজেদের বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতকে বদলে ফেলতে চায়।
সহযোগিতার দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হলো 'ব্রিকস প্লাস'। এটি এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যা ভবিষ্যতে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ডলারের দাপট কমিয়ে পুরোপুরি ইউয়ান-ভিত্তিক বাণিজ্যে যাওয়া কঠিন হলেও নতুন ব্যবস্থার পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে।
উদাহরণস্বরূপ, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত 'এমব্রিজ' প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক ছাড়াই ডিজিটাল মুদ্রায় আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের পরীক্ষা চালাচ্ছে।
তৃতীয় ক্ষেত্রটি হলো চীনের স্বপ্নের যোগাযোগ প্রকল্প 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসিই)'। ৬২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প মূলত মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমানোর এক কৌশল।
সিপিসিই এবং গোয়াদার বন্দরে বিনিয়োগ করে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সামুদ্রিক পথগুলোকে মধ্য এশিয়ার স্থলপথের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
এর ফলে তারা নতুন বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। বিশেষ করে যখন চীন তার মোট অপরিশোধিত তেলের ৪২ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
তবে এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখাও রয়েছে। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে দুই দেশের আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কথা ভাবলে এটি স্পষ্ট হয়।
যুদ্ধ হয়তো তাদের একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে, তবে এর মানে এই নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে চীনকে আপন করে নেবে।
উপসাগরীয় নেতারা বেশ বাস্তববাদী। এক নির্ভরতার শিকল ছিঁড়ে তারা অন্য শিকল পরতে রাজি নন। আর এক্ষেত্রে নিরাপত্তা খাতটিই সবচেয়ে বড় বাধা।
এই অঞ্চলে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনার উপস্থিতি রয়েছে। কেবল কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতেই রয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা।
এর বিপরীতে চীনের সামরিক উপস্থিতি জিবুতির একটি মাত্র ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ। এমনকি অস্ত্র কেনাবেচার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে নেই চীন।
সিপ্রি-র মতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মোট অস্ত্র আমদানির ৫৪ শতাংশই এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
চীনা ড্রোনগুলো শর্তমুক্ত হওয়ায় আকর্ষণীয় হলেও, তারা এখনো মার্কিনদের মতো সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারে না।
যুদ্ধ-পরবর্তী এই বাস্তবতার অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন থেকে মুখ ফিরিয়ে বেইজিংয়ের দিকে ছুটতে হবে।
বরং এটি হলো কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের এক চেষ্টা। উপসাগরীয় দেশগুলো চীনকে নতুন আমেরিকা হিসেবে দেখছে না, বরং একটি প্রয়োজনীয় ঢাল বা 'ব্যাকআপ' হিসেবে ভাবছে।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প খোঁজার মানে কাউকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার জন্য আরও মজবুত একটি ভিত্তি তৈরি করা।
পুরনো 'তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা' চুক্তি যেখানে আর কাজ করছে না, সেখানে চীনের দিকে এই ঝোঁক মূলত বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার প্রতি এক সুচিন্তিত ও বাস্তববাদী পদক্ষেপ মাত্র।
