ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্যে বীরত্ব, আড়ালে কার্টারের মতো পরাজিত হওয়ার ভয়
গুড ফ্রাইডের বিকেলে হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইং ছিল প্রায় ফাঁকা। তখন প্রেসিডেন্ট জানতে পারেন, ইরানে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন দুজন ক্রু। এ খবর পাওয়ার পর ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টা ধরে তার সহযোগীদের ওপর চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ইউরোপীয় দেশগুলো কোনো সাহায্য করছে না।
নিখোঁজ ক্রুদের দ্রুত উদ্ধারে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেন ট্রাম্প। কিন্তু দীর্ঘদিন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক উপস্থিতি নেই। তাই ইরানের সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে সেখানে অভিযান চালানো মার্কিন বাহিনীর জন্য দুরূহ।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, নিখোঁজ ক্রুদের উদ্ধার অভিযানের সময় যখন প্রতি মুহূর্তের খবর আসছিল, তখন ট্রাম্পকে 'যুদ্ধকক্ষ' থেকে বাইরে রেখেছিলেন তার সহযোগীরা। কারণ, ট্রাম্পের অধৈর্য আচরণ কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাকে আপডেট দেওয়া হচ্ছিল।
প্রথম ক্রুকে দ্রুতই উদ্ধার করা হয়। তবে দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের খবর আসে শনিবার গভীর রাতে। একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয়। সবকিছু শেষে রাত ২টার পর ট্রাম্প ঘুমাতে যান।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা জানান, ওই সময় ১৯৭৯ সালের ইরানি জিম্মি সংকটের কথা তার বারবার মনে পড়ছিল। এটি ছিল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় ব্যর্থতা।
গত মার্চে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'জিমি কার্টারের সময় কী হয়েছিল দেখুন। জিম্মি সংকটের কারণে নির্বাচনটাই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল তাদের। সে এক চরম বিশৃঙ্খলা ছিল।'
অথচ তখন ট্রাম্প নিজেই এমন এক শঙ্কার সামনে দাঁড়িয়ে।
নিজেকে 'অস্থির' দেখাবার চেষ্টা
এর মাত্র ছয় ঘণ্টা পর ট্রাম্প আবার নতুন পদক্ষেপ নেন। ইরানের অন্যতম বড় শক্তি হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। ইস্টার সানডের সকালে হোয়াইট হাউসের বাসভবন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন ট্রাম্প। সেখানে গালিগালাজ করে তিনি লেখেন, প্রণালি খুলে না দিলে ইরানিদের জীবন নরক বানিয়ে ছাড়া হবে। ওই পোস্টের সঙ্গে একটি ইসলামি প্রার্থনার কথাও জুড়ে দেন তিনি।
যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কখনো চরম আগ্রাসী অবস্থান নিচ্ছেন, আবার কখনো আপসকামী আচরণ করছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আড়ালে উদ্বেগও প্রকাশ করছেন তিনি।
এর মধ্যেও ট্রাম্প মনোযোগ হারিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের বলরুমের নকশা বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের তহবিল সংগ্রহের মতো বিষয়ে সময় দিয়েছেন তিনি। উপদেষ্টাদের বলছেন, তিনি অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান।
যুদ্ধকালীন অন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো ট্রাম্পেরও সৈন্যদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মার্কিন সৈন্যদের প্রাণহানি বা আহত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন তিনি।
উদাহরণ হিসেবে খাগ দ্বীপের কথা বলা যায়। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল এই দ্বীপ থেকে রপ্তানি হয়। এখানে মার্কিন সৈন্য পাঠাতে আপত্তি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাকে বলা হয়েছিল যে এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যাতায়াত সহজ হবে। কিন্তু ট্রাম্প ভয় পাচ্ছিলেন, এতে মার্কিন সৈন্যদের প্রাণহানি অনেক বাড়তে পারে। তিনি বলেন, সেখানে মার্কিন সৈন্যরা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
নিজের জাতীয় নিরাপত্তা দলের পরামর্শ ছাড়াই ট্রাম্প বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকিও রয়েছে। ট্রাম্প মনে করেন, নিজেকে কিছুটা 'অস্থির' হিসেবে তুলে ধরতে পারলে তা ইরানিদের আলোচনায় বসাতে সাহায্য করবে।
এমনকি একপর্যায়ে তিনি এ-ও ভাবেন যে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'মেডেল অব অনার' তার নিজেকেই নিজে দেওয়া উচিত।
চতুর্মুখী চাপের শিকার ট্রাম্প
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বিদেশি যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন, মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর শক্তি দিয়ে তিনি এমন এক সমস্যার সমাধান করবেন, যা আগের সাতজন প্রেসিডেন্ট পারেননি।
কিন্তু এখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ। ইরানে নতুন কট্টরপন্থী নেতৃত্ব এসেছে। এসব ঘটনা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, এই অভিযান চলবে মাত্র ছয় সপ্তাহ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর সেই সময়সীমা এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি আসতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করেন। পাকিস্তানে আরও আলোচনার দিকে নজর রাখছেন তারা।
ভেনিজুয়েলার সফল অভিযান ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে তার আবেগপ্রবণ আচরণের পরীক্ষা এর আগে হয়নি। ইরানে তিনি এক নাছোড়বান্দা শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন, যারা এখনো তার দাবি মেনে নিতে নারাজ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে কাজ করা কোরি শেইক বলেন, 'আমরা অবিশ্বাস্য সব সামরিক সাফল্য দেখছি, কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো বিজয় আসছে না। এর পুরো দায় প্রেসিডেন্টের। খুঁটিনাটি বিষয়ে তার মনোযোগের অভাব এবং পরিকল্পনাহীনতাই এর কারণ।' শেইক বর্তমানে ডানপন্থী থিংকট্যাংক 'আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট'-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন।
ট্রাম্পের ইস্টার সানডের পোস্টের পরপরই রিপাবলিকান সিনেটর ও খ্রিষ্টান নেতাদের প্রশ্নের মুখে পড়েন তার সহযোগীরা। সবাই জানতে চান, ইস্টার সানডের সকালে প্রেসিডেন্ট কেন 'আল্লাহর প্রশংসা' এবং গালিগালাজ ব্যবহার করলেন? ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলাপে গালিগালাজ করলেও জনসমক্ষে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা এড়িয়ে চলতেন।
পরে এক উপদেষ্টা এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, 'আল্লাহ' শব্দটি ব্যবহারের আইডিয়া তার নিজেরই ছিল। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প নিজেকে যতটা সম্ভব অস্থির ও অপমানজনক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এতে ইরানিরা ভয় পেয়ে আলোচনায় বসবে। ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি এমন এক ভাষা, যা ইরানিরা বুঝবে। তবে এর প্রতিক্রিয়া নিয়েও চিন্তিত ছিলেন তিনি। উপদেষ্টাদের কাছে তিনি এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার অবশ্য এই হুমকিকে 'বেপরোয়া' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ইস্টারের পরের মঙ্গলবার ট্রাম্প তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় আল্টিমেটাম দেন। তিনি বলেন, ১২ ঘণ্টার মধ্যে ইরান চুক্তিতে না এলে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এই পোস্টটিও ছিল সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার কোনো অংশ ছিল না।
প্রেসিডেন্ট কী করতে চলেছেন, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তবে পর্দার আড়ালে শীর্ষ সহযোগীরা একে আলোচনা শুরুর একটি উপায় হিসেবেই দেখেছেন। কারণ, প্রেসিডেন্ট নিজে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ শেষ করতে চাইছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্যক্তিগত আলাপে বলেন, এই ভাষার কারণেই হয়তো ইরানিরা আলোচনায় বসবে।
উপদেষ্টারা জানান, ট্রাম্প আসলে ইরানিদের ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন এবং সংঘাতের অবসান চেয়েছিলেন। সময়সীমা শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টারও কম সময় আগে তিনি দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
হামলার ফলে হিতে বিপরীত
ইরানে যুদ্ধ শুরু হয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। ট্রাম্পকে প্রতিদিন সকালে ইরানের মাটিতে হওয়া বিশাল সব বিস্ফোরণের ভিডিও দেখানো হতো। উপদেষ্টারা জানান, বোমার ধ্বংসক্ষমতা দেখে সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করতেন ট্রাম্প।
তবে দেশের মানুষের কাছে এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ট্রাম্প খুব একটা কাজ করেননি। এই বিষয়ে প্রত্যাশিত প্রশংসা না পাওয়ায় তিনি দ্রুত হতাশ হয়ে পড়েন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই হতাশার কারণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের 'অন্যায্য' খবরকে দায়ী করেন। ট্রাম্পকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের যে জনমত জরিপ দেখানো হয়, তাতে স্পষ্ট ছিল যে এই যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকান প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
দুজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প নিজে এবার পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নেই। তাই তিনি ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয় তাকে বৈশ্বিক ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর সুযোগ দেবে, যা তিনি প্রথম মেয়াদে পারেননি। সামরিক অভিযানের শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'যদি আমরা এটা ঠিকঠাক করতে পারি, তবে ধরে নিন আমরা বিশ্বকে বাঁচাচ্ছি।'
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি হতাশায় ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প তার দলকে বলেছিলেন, প্রণালি বন্ধ করার আগেই ইরান হয়তো নতি স্বীকার করবে। আর তেহরান যদি কোনো কিছুর চেষ্টাও করে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তা সামলে নেবে।
কিন্তু বোমা হামলার পরপরই এত দ্রুত জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্টের কয়েকজন উপদেষ্টা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
এত সহজে প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পকে বিস্মিত করে। নৌপথটি এতটা অরক্ষিত থাকায় বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ড্রোন হাতে যে কেউ এটা বন্ধ করে দিতে পারে।তিনি প্রকাশ্যে কখনো প্রণালি খুলতে মিত্রদের সাহায্য চেয়েছেন, আবার কখনো বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক সহায়তার প্রয়োজন নেই।
গত মার্চের শেষের দিকে ট্রাম্প তার আলোচক দলকে আলোচনা শুরুর উপায় খুঁজতে নির্দেশ দেন। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর ইরানিরা মার্কিন বিমান ভূপাতিত করে।
