মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার বহুমুখীকরণসহ বিশেষ পদক্ষেপ ঘোষণা সরকারের
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি জানিয়েছেন, এই সংকটের ফলে আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বিমা খরচ বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বাজার বহুমুখীকরণসহ ১০ দফার বেশি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জানতে চেয়েছিলেন, সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অস্থিরতায় বাংলাদেশের বাণিজ্যে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা এবং পড়লে তা মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমানে আমাদের তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।'
সংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপসমূহ:
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন:
১. রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ: ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২. পণ্য বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হিমায়িত খাদ্য, আইসিটি ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো হচ্ছে।
৩. শিল্পে বিশেষ সুবিধা: জাহাজ ও পাদুকা শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে 'ফ্রি অফ চার্জ' ভিত্তিতে অনাপত্তি প্রদান করা হচ্ছে।
৪. ডিজিটাল সেবা: রপ্তানিকারকদের সুবিধার্থে অনলাইনে 'রুলস অফ অরিজিন' সার্টিফিকেট প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে।
৫. দ্বিপাক্ষিক বৈঠক: ভারত, নেপাল, ভুটান, কম্বোডিয়া ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি এবং বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে বাণিজ্য বাধা দূর করা হচ্ছে।
৬. মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলমান রয়েছে।
৭. নেপাল ও ভুটান প্রসঙ্গ: নেপালের সাথে পিটিএ চুক্তির চতুর্থ রাউন্ডের আলোচনা এবং ভুটানের সাথে দশম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই জয়েন্ট ট্রেড কমিটির সভা আয়োজিত হবে।
৮. জাপানের সাথে ঐতিহাসিক চুক্তি: বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি জাপানের সাথে বাংলাদেশের ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটিই হতে যাচ্ছে কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যা বর্তমানে অনুসমর্থনের পর্যায়ে রয়েছে।
এছাড়া, মন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। শপিংমল, দোকানপাট, বিলবোর্ডের বাতি এবং বাণিজ্য মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আবশ্যিকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেলায় সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাজারে অসাধু মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট রোধে তদারকি জোরদার করা হয়েছে বলেও আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী। নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে সংসদকে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
